আগামী ১০/১১ জুলাইকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের প্রস্তুতির মধ্যেই পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী সম্মেলন না হওয়ার মতো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলছেন, ঈদের পরে প্রথম কার্যদিবস ১০ জুলাই। ওইদিনই আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ দেওয়ায় এটি ‘বেখাপ্পা’ সময় হয়ে গেছে। এ কারণে সময় পেছানোর জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে তারা বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে দলীয় সভাপতি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। শনিবার (১১ জুন) দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ ব্যাপারে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান দলের সভাপতিমণ্ডলীর তিনজন সদস্য।
সভাপতিমণ্ডলীর তিনজন সদস্য জানান, পূর্বনির্ধারিত তারিখ পেছানোর চেষ্টা চলছে। যদিও দলের কার্যনির্বাহী সংসদের গত সভায় বিস্তারিত আলোচনা করেই তারিখ ১০/১১ জুলাই ঠিক করা হয়।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর ৩জন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দলের সভাপতিকে সম্মেলন পেছানোর জন্যে ইতোমধ্যেই বিশেষ অনুরোধ করা হয়েছে। সম্মেলন পেছানোর কারণও তুলে ধরা হয়েছে শেখ হাসিনার কাছে। এই নেতারা আরও বলেন, ঈদের পর প্রথম সরকারি কার্যদিবসে আমাদের সম্মেলনের তারিখ হওয়ায় তা পেছানোর একটা প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কারণ ঈদের পর বাড়ি থেকে কর্মক্ষেত্র ঢাকায় আসতে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি হবে। এছাড়া জাতীয় সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এবং থানা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসতে ভোগান্তিতে পড়বেন। নেতারা বলেন, এমন হিসাব-নিকাশ করে আমাদের সম্মেলন চিন্তা করা হচ্ছে।
তবে এর বাইরেও বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কারণ চলমান অস্থিরতা। দেশে যে হারে গুপ্ত হত্যা চলছে, তাতে করে মানুষের ভেতরে একটি আতঙ্ক কাজ করছে। সম্মেলন উপলক্ষে দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈরি পরিস্থিতিতে তারা নাও আসতে পারেন। এটি সম্মেলনকে আড়ম্বরপূর্ণ করে তোলার পথে বাধা সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কারণ পবিত্র ঈদুল ফিতর। এর মাত্র দু’দিন বাদে সম্মেলন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন দলীয় নেতারা। তাই তারা আরও ১৫দিন সময় পেছানোর পক্ষে।এছাড়া বর্ষা মৌসুম, জুলাই মাস পুরো বৃষ্টির সময়, আর বৃষ্টি হলে সম্মেলনের পরিবেশ-উৎসব দুটোই নষ্ট হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা মাঠে সম্মেলনের আয়োজন হওয়া সেখানে বৃষ্টি হলে মাঠ হবে কর্দমাক্ত। লোকজনের অসুবিধা সৃষ্টি করবে কাদামাঠ। তাই বৃষ্টিও একটি সমস্যা।
জানা গেছে, সম্মেলন পেছানোর ব্যাপারে জোর দাবি সম্মেলন প্রস্তুতি উপলক্ষে গঠিত সাজসজ্জা উপকমিটির। সম্মেলনের মূল আকর্ষণ সাজসজ্জা। তাই তাদের দাবি ঈদের পরপর সম্মেলন অনুষ্ঠান শ্রীহীন হয়ে যাবে। তারা মনে করছেন, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নেতারা ঢাকায় থাকলেও কর্মীসমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই ঢাকায় থাকবেন না। সবাই পরিবার পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উৎসব ভাগাভাগি করতে ঢাকার বাইরে নিজনিজ গ্রামের বাড়ি থাকবেন। এতে করে সম্মেলনে লোক সমাগম কম হবে। তাছাড়া যে হারে গুপ্ত হত্যা চলছে, দেশে মানুষের মধ্যে একটি ভীতি কাজ করছে। তাদের অনেকেই সম্মেলন স্থলে আসতে চাইবে না। সেক্ষেত্রে সম্মেলন আয়োজনে লোক জমায়েত মাত্রতিরিক্ত হারে কম থাকবে। অন্তত ১৫ দিন পরে এই আয়োজন করা হলে ঈদ উৎসব শেষ করে সবাই ঢাকায় থাকবে। আর দেশে ভীতিকর যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাও কমে যাবে। সেক্ষেত্রে সম্মেলন জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলা সম্ভব হবে। লোক সমাগমও থাকবে। তখন ব্যাপক শো-ডাউন করা সম্ভব হবে। প্রস্তুতির জন্যে গঠিত অন্য উপ-কমিটির প্রধানরাও সম্মেলন পেছানোর ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছেন।
জানা গেছে, এ বিষয়গুলো নিয়ে ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি কমিটির সকল সভায় নেতারা আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। সব উপ-কমিটির সভায় নেতিবাচক এসব দিকগুলো নিয়ে নেতাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত এসব বিষয়গুলো তুলে ধরে গত ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সাজসজ্জা উপকমিটির নেতারা সম্মেলন পেছানোর বিশেষ অনুরোধ নিয়ে যান। সম্মেলন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে এমন খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তুলে ধরলে প্রধানমন্ত্রী জবাবে বলেন, ঈদ মাথায় রেখেই তো সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ঈদের পরে সম্মেলন অনুষ্ঠান হলে তো ভাল হবে, ঢাকা ফাঁকা থাকবে। যানজটে মানুষের ভোগান্তি তৈরি হবে না।
তবে, আওয়ামী লীগের অন্য একটি অংশের নেতারা মনে করেন, এই মুহূর্তে সম্মেলন পেছানো হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ভুল ম্যাসেজ যাবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনেকেই মনে করবে, বাংরাদেশের পরিস্থিতি নিশ্চয়ই অস্থিতিশীল পর্যায়ে। এ প্রসঙ্গে সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য জানান, এর আগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় যখন সম্মেলনের তারিখ ঠিক করা হয়, তখন পার্বণ, উৎসবগুলো আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য, ওই আলোচনায় গুপ্ত হত্যার বিষয়ে কোনও কথা হয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজি জাফরউল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সম্মেলন পেছানোর জন্য দলের ভেতরে অনেকের দাবি রয়েছে। ঈদ ও বর্ষার ইস্যুটি তুলে সম্মেলন পেছানোর কথা বলছেন দলের নেতারা। আমার জানা মতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যপারে এখনও আগের তারিখই বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, শনিবার (১১ জুন) আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভা। সেখানে আলোচনা করা হবে। তারপর সেখানে হয়ত নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আসলেও আসতে পারে।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, সম্মেলনের পূর্ব নির্ধারিত তারিখ এখনও বহাল আছে। তবে সম্মেলন পেছানোর জন্যে অনেকের প্রস্তাব আছে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, শনিবার দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সভা হবে। নতুন কোনও সিদ্ধান্ত আসলে সেখান থেকে আসতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৯ মার্চ আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়েই সম্মেলনের তারিখ হওয়ায় তা পরিবর্তন করা হয়।
আরও পড়তে পারেন:গুলিস্তানে সংঘর্ষের ঘটনায় আটক শতাধিক
/এমএনএইচ/








