সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদরোধে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তুলতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসায় সম্ভাব্য চা-চক্রে আগ্রহ নেই দেশের মূলধারার বামদলগুলোর।
‘সমালোচিত’ হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা’ সৃষ্টির আশঙ্কায় খালেদা জিয়ার চা-চক্রকে এড়িয়ে যাওয়ার আলামত পাওয়া গেছে দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে। নেতারা দাবি করেছেন, তারা শনিবার পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে চা-চক্রের কোনও আমন্ত্রণ পাননি।
বাম নেতারা মনে করছেন, বিএনপি দেশের প্রধান সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতকে পাশে রেখে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের ডাক অনেকটাই উন্নাসিকতা বলে দাবি করছেন নেতারা। কেউ কেউ জামায়াত ত্যাগের শর্তে একই ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
যদিও বিএনপির তরফে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠারসমূহ সম্ভাবনা দেখা গেলেই জামায়াতকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনা থেকে ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় এক যুগের বেশি সময়ের ভোট ও জোটসঙ্গীকে রাখা হচ্ছে না। পাশাপাশি জামায়াতও বিএনপির এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে এককভাবে জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মসূচি পালন করেছে। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, চা-চক্রটিই মূলত করা হচ্ছে আলোচনার জন্য। এই উদ্যোগে যারাই বাধা হবে, তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রথমে তো আলোচনা শুরু হোক।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চায়ের দাওয়াত আমরা পাইনি। আর চা খাওয়া তো অবান্তর। যখন একটা ঘরে আগুন লাগে, তখন আগুন নেভানোর জন্য রাস্তায় নামা দরকার। আমরা বরাবরই বলেছি, যারা জঙ্গিবাদবিরোধী অবস্থান নিতে চান, তারা রাজপথে নামুন। প্রথমে জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করুন। দ্বিতীয়ত, জঙ্গিবাদকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। তৃতীয়ত, রাজপথে নামুন। সেটাই এখন জঙ্গিবাদ উত্তরণের প্রতিরোধে জন্য প্রধান করণীয়।
বাংলা ট্রিবিউনের কাছে রুহিন হোসেন দাবি করেন, কমিউনিস্ট পার্টির কারও সঙ্গে বিএনপির মিটিংয়ের কোনও খবর আমার জানা নেই। প্রস্তাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও প্রস্তাবের বিষয়ে আমরা জানি না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনি কোনও চা-চক্রে অংশগ্রহণের প্রস্তাব পাননি। জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গে তার সংগঠনের অবস্থান ইতোমধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। আর প্রস্তাব পেলে দলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান সাকি।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা বলেছেন, আজকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে জাতীয় স্বাধীনতা বিপণ্ন। ১২ জানুয়ারি ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে আমাদের অধিনস্ত করা হয়েছে। সুন্দরবন বিপন্ন হচ্ছে। আজকে জাতীয় জীবন ও জাতীয় সম্পদের নিরাপত্তা নেই। ফলে, খালেদা জিয়া এই প্রধান সমস্যাগুলো নিয়ে তো কথা বলছেন না।
ফয়জুল হাকিম মনে করেন, এই প্রশ্নটি খালেদা জিয়া কেন তুলছেন না? জঙ্গিবাদের যে প্রশ্ন, সেটির পেছনে আমরা বরাবর বলে এসেছি, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে জাল বিছিয়েছে, সেটির অংশ। আইএস, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইত্যাদি বিষয়গুলো একইসঙ্গে সংযুক্ত। খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের ডাক এ কারণেই ফাঁপা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে গত ২০ জুলাই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সিপিবির তিন নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মঞ্জুরুল আহসান খান ও হায়দার আকবর খান রনোর সঙ্গে বৈঠক করেন।
আগের দিন তিনি বৈঠক করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। ১৯ জুলাই মঙ্গলবার বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন ডা. জাফরুল্লাহ।
বাসদের একটি সূত্র জানায়, জাফরুল্লাহর সঙ্গে খালেকুজ্জামানের বৈঠকের আলোচনা নিয়ে পরিস্কার কিছু জানা যায়নি। তবে কর্মসূচি পালনে ‘যুগপৎ’ হিসেবে ইস্যু এক হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে জামায়াত থাকলে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক বা চা-চক্রের কোনও সুযোগ নেই বলে সূত্রের দাবি।
বিএনপিন্থী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে কাজ চলছে। খালেদা জিয়ার ডাকে এই ঐক্যের প্রাথমিক রূপকল্প তৈরি হবে আলোচনার মধ্য দিয়েই। বামদলগুলোকেও আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিপিবি আসবে না, বাসদ (জামান) আসবে। ড. কামাল হোসেন দেশের বাইরে আছেন। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে, আ স ম রবের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা আসবেন। এক্ষেত্রে জামায়াত প্রসঙ্গে যে বক্তব্যগুলো এসেছে, এগুলো তো আমলে নেওয়া হবে। বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে অনেক কিছু সম্ভব। জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামানকে পাওয়া যায়নি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চা-চক্রে সবাই একসঙ্গে নাও আসতে পারেন। অনেকে এককভাবে আসতে পারেন। কাজ শুরু হয়েছে। আগে তো আলোচনা হবে। এরপর শর্ত আর রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বামদলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এসটিএস/এপিএইচ/আপ-এবি








