বর্তমান সরকারের আমলে ‘সংঘটিত’ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিচার না হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। রবিবার (১৪ নভেম্বর) জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।
একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বিএনপির এই এমপি বলেন, ‘গত ৫০ বছরে দেশে ৭৫ লাখ হিন্দু কমেছে। ১৯৭৪ সালে আমাদের যে জনসংখ্যা ছিল এখন তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা যে পরিমাণ বাড়ার কথা ছিল, সে পরিমাণ তো বাড়েইনি, বরং ৭৫ লাখ মানুষ কমে গেছে। মাইগ্রেশন আর হিন্দুদের জন্মহার কমার কারণে এই সংখ্যা কমেছে। ৫৩ শতাংশ দেশ ছেড়ে চলে গেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তিতে যখন আমরা সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি, যখন ক্ষমতায় আছে এমন একটি সরকার, যারা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক সরকার বলে দাবি করে। যারা দাবি করে যে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ কাজ করতে পারে না। সেই সরকারের সময় কেন ৭৫ লাখ হিন্দুর সংখ্যা কমে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে ২০০৯ সালে, তারপর ধারাবাহিকভাবে আছে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমরা দেখবো, রামু, সাথিয়া, হোমনা, মালোপাড়া, নাসিরনগর, ঠাকুরগাঁও, বানারীপাড়া, কলমাকান্দা, গোবিন্দগঞ্জসহ সারাদেশে প্রায় প্রতিটি জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। এর একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। আজকে সংসদ নেতা উপস্থিত আছেন। আমি উনার সামনে বলছি—একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। উল্টো তাদের কাউকে কাউকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। আমরা দেখেছি, নাসিরনগরে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত তিন জন ব্যক্তিকে ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে তাদের নমিনেশন প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ইনিশিয়ালি যে নমিনেশন দেওয়া হলো, সেটাই কিন্তু সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে দেয়।’
এ বছর দুর্গাপূজার সময়কার ঘটনা বর্ণনা করে রুমিন বলেন, ‘এ বছরে যখন দুর্গোৎসব চলেছে—তখন কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুর ও চাঁদপুরে হামলার খবর এসেছে। এর বাইরে ২২টি জেলায় এই হামলা অব্যাহত ছিল। হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদ বারবার বলছে— প্রতিবছর সংখ্যালঘুদের ওপর যে হামলা হয়, পরের বছর গিয়ে সেটি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হামলা কমার বদলে হামলার সংখ্যা বাড়ছে। গত ৯ বছরে মোট হামলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৯টি।’
রুমিন বলেন, ‘কুমিল্লায় মূর্তির নিচে যখন পবিত্র কোরআন শরিফ রাখা হলো, সেই অবমাননাকর ঘটনাটি ঘটলো, সেই সময় সকাল ৭টা ছিল। সেখানে লোকজন তেমন ছিল না। সেখানে ওসির সামনে ফেসবুকে লাইভ করলো। যে লাইভ করলো, তাকে ধরার বদলে ওসি লাইভ করতে দিলো। ফেসবুক লাইভ নিয়ে কী ধরনের বীভৎসতা হতে পারে, সেটা আমরা রামু ও নাসিরনগরে দেখেছি। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় আমরা দেখলাম, দীর্ঘ সময় ধরে ফেসবুক লাইভ হলো, কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। চাঁদপুরের ঘটনায় দেখলাম, দলীয় কর্মীর নাম এসেছে, সরকার দলীয় ছাত্রলীগ কর্মীর নাম এসেছে। রংপুরের ঘটনায়ও একই ঘটনা দেখলাম। অর্থাৎ সরকারের যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নাম কিন্তু এসেছে। একইসঙ্গে একটা জিনিস খুবই কমন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা। যখন প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তখন বলা হচ্ছে—প্রশাসন পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল। এবং আমরা দেখেছি, একেকটা মামলায় হাজার হাজার আসামি। এই চারটা জেলার মামলায় ২০ হাজার আসামি করা হয়েছে, মাননীয় স্পিকার কেন?’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা এবং সমঅধিকার নিশ্চিত করার কথা রয়েছে। আমাদের সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মনিরপেক্ষতা যে আমাদের সংবিধানে নেই—বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। রাষ্ট্রধর্মের সঙ্গে সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের যেমন অধিকার আছে, সমঅধিকার আছে, একইভাবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতেও কিন্তু স্পষ্টভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা আছে।’








