বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৪ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তাকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য বিএনপি শাখার সব কর্মকাণ্ড। কিন্তু এই ১৪ বছরে একবারও ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন হয়নি। প্রতিবারই কাউন্সিল হয়েছে বাকি প্রার্থীদের বসিয়ে দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
বিএনপির মূল দাবি প্রতিযোগিতামূলক অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন। অথচ দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সেখানে থেকেও নেতৃত্ব নির্বাচন দিতে পারেননি। যেখানে দলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘৫ জানুয়ারি’র নির্বাচনের সমালোচনায় মুখর।
জানা গেছে, যুক্তরাজ্য বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। ওই কাউন্সিলে বর্তমান সভাপতি এম এ মালেক ছাড়াও সভাপতি পদে শরিফুজ্জামান চৌধুরী তপন ও তাজ উদ্দীন মনোনয়নপত্র কেনেন। আর সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ ছাড়াও মনোনয়নপত্র কেনেন মুকাদ্দেম চৌধুরী নিয়াজ, নাসিম আহমদ চৌধুরী ও তাহির রায়হান পাভেল।
১২ জানুয়ারি এই পাঁচ প্রার্থী নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অন্তত চারটি বড় অসংগতির প্রতিকার চেয়ে নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু হাইকমান্ড অভিযোগের ব্যাপারে কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে পাঁচ জনের কেউই আর মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
দুই হাজার পাউন্ড ফি দিয়ে মনোনয়ন কিনে কেন তারা জমা দিলেন না, এ ব্যাপারে ওই দিন গণমাধ্যমের কাছে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন প্রার্থীরা। তাই ১৫ জানুয়ারির ভোটের আগেই নিয়ম অনুযায়ী আর কোনও বিকল্প বৈধ প্রার্থী না থাকায় তৎকালীন দুজনই আবার টানা দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের মেয়াদের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বিনা ভোটে নির্বাচিত হন।
এর আগে ২০১০ সালের ১০ মার্চ যুক্তরাজ্যর বিএনপির অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় কোনও প্রার্থী না থাকায় মরহুম কমর উদ্দীন সভাপতি ও ব্যারিস্টার এম এ সালামকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সে সময়ও তারেক রহমান লন্ডনেই ছিলেন।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও বর্তমান উপদেষ্টা আব্দুল হামিদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যুক্তরাজ্য বিএনপিতে কাউন্সিলে ১৯৯৪ সালে একবারই শুধু সভাপতি পদে নির্বাচন হয়েছিল। ব্রিটেনিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে সভাপতি পদে কমর উদ্দীনকে পরাজিত করে সভাপতি হন বিএনপির বর্তমান কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুর রহমান।
নাম না প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাজ্য বিএনপির এক সাবেক সহসম্পাদক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপি বর্তমান সভাপতি-সম্পাদকের পকেটে। সভাপতি-সম্পাদকের অনুসারীরা ছাড়া বাকিরা দলে নিষ্ক্রিয়। দলের কর্মসূচিতে ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের ছবির জন্য অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু পুরনো, ত্যাগী দেশে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা নেই। একই ব্যক্তি ১০ বছর ধরে যদি সভাপতি বা সেক্রেটারি পদে দুই-তিন মেয়াদে থাকেন, তাহলে নতুন ও তৃনমূল থেকে নেতৃত্ব সৃষ্টির পথ বন্ধ হয়ে যায়।’
ত্যাগী সংগঠক ও বুদ্ধিজীবীরা দলে গুরুত্বহীন
বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমান চার বছর ধরে স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে বসবাস করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অন্যতম অনুগামী এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির পুরনো মুখ। তিনি বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যামে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে লন্ডনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এ সাংবাদিক ২০১৬ সালের ১৬ এপ্রিল ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার হন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু বর্ষীয়ান এ সাংবাদিকও লন্ডনে তারেক রহমানের কোনও অনুষ্টানে আমন্ত্রন পাননি গত চার বছরে।
নছরুল্লাহ খান জুনায়েদ আশি ও নব্বই দশকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ছিলেন তিনি। দলে অতীত অবদান থাকলেও ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নিজ আসনে প্রার্থী তারেক রহমানের একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানির সহোদর কবির আহমদ ভুইয়া বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী। যদিও কবির আহমদ ভুইয়ার স্থায়ী বাড়ি এ নির্বাচনী আসনে নয়। জুনায়েদের অনেক জুনিয়র ছাত্রদল নেতারা বিএনপির কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পদে থাকলেও লন্ডনের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জুনায়েদের স্থান দলের কোথাও নেই। তবে কৌশলে তাকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে বলে দাবি জুনায়েদ অনুসারীদের।
দেশের একটি জেলা কমিটিতে নিজের জনপ্রিয়তায় আশি ও নব্বইয়ের দশকে পরপর তিনবার নির্বাচিত জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন লুৎফুর রহমান। কয়েকবার যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। অতীতে যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি প্রার্থী হলেও হাইকমান্ডের নির্দেশে পরে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন তিনি। পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় এই নেতা দলীয় কর্মকাণ্ডে এখন একেবারেই নিষ্ক্রিয়।
যুক্তরাজ্যে বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী থিংক ট্যাংকের অন্যতম সক্রিয় সদস্য বিভিন্ন সেমিনার-সমাবেশে বক্তব্য রাখতেন মেজর (অব.) ফারুক। তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বিভিন্ন দলীয় সেমিনারে তিনি অনেকবার বক্তব্য রেখেছেন। ফারুকের মেয়ে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ার। তিনিও এখন দলে নেই।
ঢাবির জিয়াউর রহমান হলের এজিএস আব্দুল হাই অপু, সাবেক ছাত্রনেতা আরমান রফিক, বুয়েট ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ও যুক্তরাজ্য জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার তারেক বিন আজিজের মতো মেধাবী ছাত্রদলের দেশজুড়ে পরিচিত কেন্দ্রীয় নেতারা কোণঠাসা হয়ে দলে নিষ্ক্রিয়। মেজর (অব.) সিদ্দিকুর রহমান, শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মঞ্জুর মোর্শেদও এখন কোনও সভা-সমাবেশে আসেন না। দলের পক্ষে ব্রিটিশ সংসদে খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পর সেমিনার ও সভার আয়োজন করা ফয়জুন নুর অবমূল্যায়নের অভিমানে দলে নিষ্ক্রিয় বলে জানা গেছে।
বার্মিংহামের জাহেদ চৌধুরী দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার আগে তারেক রহমান তার সুদূর বার্মিংহামের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান বলেও জানা গেছে। জগন্নাথপুর থেকে উপজেলা নির্বাচন করা যুক্তরাজ্যত বিএনপির প্রভাবশালী নেতা এম এ কাদির, অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন, মশাহিদ আলীরা দলে নিষ্ক্রিয়।
দালালরাই প্রভাবশালী
বিবিসিসহ ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ব্রিটেনে জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ প্রতারণার ঘটনায় জড়িত বলে সংবাদ প্রচারিত বিতর্কিত ব্যক্তিদেরও দলের একাধিক সহযোগী সংগঠনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ দেওয়া হয় সম্প্রতি। কিন্তু মূল্যায়ন হয়নি যুক্তরাজ্য যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক দেওয়ান মুকাদ্দেম নিয়াজের মতো পরিচ্ছন্ন সাবেক নেতাদের। সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে টাকার বিনিময়ে সম্পাদকীয় পদ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এ চক্রে রয়েছেন তারেক রহমানের একান্ত সচিব আবদুর রহমান সানির কিছু প্রভাবশালী ঘনিষ্ঠজন।
বিপরীতে একই সময়কালে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্য তুলে ধরে ব্রিটিশ সংসদে তিনটি সভা করতে সমর্থ হয়। অথচ যুক্তরাজ্য বিএনপি অন্তত দুজন ব্রিটিশ সাংসদের সই গ্রহণ করে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কোনও ধরনের অর্থবহ কর্মসূচি গ্রহণে ব্যর্থ হয়। সহযোগী সংগঠনগুলোও যুক্তরাজ্যে ফটোসেশনের জন্য কিছু শোডাউন জমায়েত ছাড়া কার্যকর কোনও কর্মসূচি নিতে পারেনি।
জানা গেছে, সাউথ ইস্ট লন্ডনের কিংস্টন লজে তারেক রহমান বসবাস করেন। যেখানে তিনি নেতাকর্মীদের সাক্ষাৎ দেন। সেখানে ধনাঢ্য নেতাদের অবাধ যাতায়াত থাকলেও দেশ থেকে আসা দলের নেতা ও অনেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও তার সাক্ষাৎ পান না প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে।
যা বললেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক
সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমদ রবিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যুক্তরাজ্য বিএনপির গত তিনটি কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে হয়েছে। কোনও চাপিয়ে দেওয়া কমিটি হয়নি। গত সম্মেলনের সময় বাকি যারা নমিনেশন কিনেছিলেন, তারা প্রার্থী না হলে কার কী করার আছে? বাংলাদেশের বাইরে বর্তমান কমিটি সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে সফল।
ইংল্যান্ডের পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন কাউন্সিলে বসবাস আড়াই লক্ষাধিক কাংলাদেশির। অথচ জাতীয় দিবসগুলোয় তারেক রহমানের উপস্থিতিতেও এক হাজার নেতাকর্মী কেন জমায়েত হন না, এমন প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম মালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে যখন মানুষের ভোট, ভাত ও কথা বলার অধিকার নেই, তখন লন্ডনে তারেক রহমানের অনুষ্ঠানে জনসমাগমের প্রশ্নটাই নেতিবাচক। বর্তমান কমিটি বাংলাদেশের বাইরে থেকে সরকার পতনের আন্দোলন বেগবান করছে, সেসব সাংবাদিকরা দেখেন না, লেখেনও না।








