সময় নিয়ে চলে বিএনপির ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি, পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা

জুবায়ের আহমেদ
১৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১:০০আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১:৩০

সরকার পতনের আন্দোলনে দফায় দফায় অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। অবরোধ পালনে রাজপথে শক্ত অবস্থানে থাকতে না পারলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বের করছে দলের নেতাকর্মীরা। স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে এসব ঝটিকা মিছিল বের করতেও তাদের বেশ সতর্ক থাকতে হয়। পুলিশের গ্রেফতার এড়িয়ে দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী মিছিল বের করতে নিতে হয় বিশেষ পরিকল্পনা। এত কিছুর পরও প্রায়ই মুখোমুখি হতে হয় পুলিশের। এই মিছিল নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী ও পুলিশের মাঝে চলে লুকোচুরি খেলা।

সম্প্রতি রাজধানীতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিনিধি কথা বলে জানতে পারেন অবরোধ নিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব দলীয় কর্মীরা জানান, গত ২৮ অক্টোবরের পর কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা আটক হওয়ার পর গ্রেফতার আতঙ্কে বাকি কেন্দ্রীয় নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। ফলে আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনও নির্দেশনা পান না দলের কর্মীরা। তবে দলের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক অবরোধ কর্মসূচি আসায় তা পালনে মহানগর বিএনপির নেতাদের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকেন তারা।

গ্রেফতার এড়াতে বিভিন্ন কৌশলে মিছিল করছেন বিএনপির কর্মীরা

তারা বলেন, দলের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা রয়েছে, ঢাকার চার মহানগর থেকে শুরু করে প্রত্যেক থানা ও ওয়ার্ড কমিটির এবং অঙ্গসংগঠনের প্রথম সারির নেতাদের তাদের সমর্থক-কর্মীদের নিয়ে অবরোধে রাজপথে থাকতে হবে। যেসব নেতা এসব নির্দেশনা না মানছেন বা অনুপস্থিত থাকছেন তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান নিয়মিত মিছিলে উপস্থিত থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা।

কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই নির্দেশনা

অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণার পর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই মহানগর নেতাদের কাছ থেকে তৃণমূল নেতাদের কাছে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা চলে যায়। নিয়মিত মিছিলে অংশগ্রহণকারী একাধিক কর্মী জানান, অবরোধ কর্মসূচি পালনের আগের রাতে আমাদের অনলাইনে অনবরত যোগাযোগ হতে থাকে। মহানগর নেতাদের পক্ষ থেকে অবরোধের সমর্থনে মিছিল বের করার স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কে কীভাবে অবস্থান নেবেন তারও কিছু নির্দেশনা থাকে।

অবরোধের দিন নির্ধারিত স্থানে মিছিল বের করার ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে যে যার মতো করে অবস্থান নেন। কেউ পথচারীর বেশে, কেউ চায়ের দোকানে, কেউ আবার বাইক রাইডার হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকেন। একে অপরের মাঝে চেনাজানা থাকলেও নিজেরা কথা বলেন না। এর মাঝে নির্ধারিত সময়ে নিজেদের মধ্যে ইশারার মাধ্যমে ব্যানার খুলতে খুলতে দাঁড়িয়ে যান মিছিলে। এর মাঝে শুরু করেন স্লোগান। ১৫-২০ জনের এসব ঝটিকা মিছিল চলে মিনিট দশেক। তারপর আবার যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যান।

ঝটিকা মিছিল করলেও প্রস্তুতি নেওয়া হয় অনেক আগে থেকে

পুলিশের সঙ্গে চলে লুকোচুরি খেলা

পুলিশ থেকে বাঁচতে আগে থেকেই কয়েকজন এসে মিছিলের স্থান পর্যবেক্ষণ করেন। বিএনপির কর্মীরা বলেন, সাধারণত স্থান ও সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা হয়। এর জন্য সকাল দুপুর বা সন্ধ্যার সময়টা বেছে নেওয়া হয়। কোন কোন সময় পুলিশের অবস্থান থাকে না বা পুলিশের কোন জায়গায় আসার সম্ভাবনা কম, এসব বিষয় দেখে হুট করেই মিছিল বের করা হয়। এছাড়া কর্মীদের কেউ কেউ স্থানীয় থানার সামনে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে পুলিশের গতিবিধি লক্ষ রাখেন। সেই অনুযায়ী ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। 

তবু অনেক সময় শেষ রক্ষা হয় না জানিয়ে এসব কর্মী বলেন, এত আয়োজন-পরিকল্পনা করে মিছিল বের করার পরও শেষের দিকে পুলিশ এসে যখন উপস্থিত হয়ে যায়, তখন কেউ পিছিয়ে পড়লে পুলিশ ধাওয়া করে ধরার চেষ্টা করে। তখন নিজেদের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করেন কর্মীরা। কেউ কাউকে রক্ষা করতে কমই যান।

এলাকায় আতঙ্ক বেশি 

কেবল বিক্ষোভ মিছিলে নয়, এলাকায়ও গ্রেফতার আতঙ্কে থাকেন বলে জানান বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বলেন, বিক্ষোভ মিছিল থেকে এলাকায় থাকাটা আরও বিপজ্জনক। যদি টার্গেট করে এবং এলাকায় পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই গ্রেফতার করবে।

অবরোধ-হরতালের সমর্থনে মিছিলে অংশ না নেওয়ার কারণে কেউ কেউ পদ হারিয়েছেন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি কর্মী বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে রাস্তায় পর্যন্ত দাঁড়াতে পারছি না। নানান কলাকৌশল করে এই মিছিলগুলো বের করি। মিছিলে ধাওয়া দিলে পালানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু মিছিল থেকে বেশি ভয় এলাকায়। যদি টার্গেট থাকে কাউকে গ্রেফতার করবে, তাকে নিজ এলাকায় পেলেই অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে। প্রত্যেক দিনই এরকম খবর পাচ্ছি আমরা। পরিবার থেকে কত দিন দূরে থাকা যায়। পরিবার তো চালাতে হয়। তাই রিস্ক জেনেও এলাকায় আসা-যাওয়া করা লাগে।

নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, গত ১৫ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছে। প্রতিনিয়তই তারা গ্রেফতার আতঙ্ক নিয়ে চলেন। গত এক মাসেই বিএনপির প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পরিবারের একজনকে না পেলে আরেকজনকে নিয়ে যায় পুলিশ। ছেলেকে না পেলে বাবাকে, এক ভাইকে না পেলে আরেক ভাইকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

গ্রেফতার এড়াতে নিজেদের এলাকায় চলাচলেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের

এর আগে অনলাইন ব্রিফিংয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশের ৪/৫ দিন আগে থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন ২১ হাজার ১৫০ জনের বেশি। মামলা হয়েছে ৬০০-এরও বেশি। আহত হয়েছেন প্রায় ৬ হাজার ১৫৩ জনের মতো নেতাকর্মী। ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও দাবি করেন, গত ২৮ ও ২৯ জুলাই থেকে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মী গ্রেফতার করেছে ২৪ হাজার ১৩১ জন। মামলা হয়েছে ১ হাজারটিরও বেশি। আসামি করা হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৬৩ জনকে। আহত ৯ হাজার জনেরও বেশি নেতাকর্মী।

আরও পড়ুন- 

কোনও পরিপত্র জারি করে আন্দোলন দমানো যাবে না: রিজভী

২৮ অক্টোবরের পর ‘নিখোঁজ’ বিএনপি নেতারা সামনে আসছেন

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে সিএনজি চালকদের সড়ক অবরোধ, তীব্র যানজট
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
সরকারকে কীভাবে ব্যর্থ করতে চায় জামায়াত 
সর্বশেষ খবর
একটু আনন্দের মুহূর্ত চান? জানুন ব্যস্ত সৃজনশীল ব্যক্তিদের ২১ পরামর্শ
একটু আনন্দের মুহূর্ত চান? জানুন ব্যস্ত সৃজনশীল ব্যক্তিদের ২১ পরামর্শ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধান এম নাজমুল হাসানের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধান এম নাজমুল হাসানের সাক্ষাৎ
গাজী নজরুলের এমপি পদ কি থাকছে? 
গাজী নজরুলের এমপি পদ কি থাকছে? 
গ্যাস সংকট, ত্রুটি সমাধানে দুই দিন লাগতে পারে: মন্ত্রণালয়
গ্যাস সংকট, ত্রুটি সমাধানে দুই দিন লাগতে পারে: মন্ত্রণালয়
সর্বাধিক পঠিত
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
জামায়াত এমপির বিয়ে আর কাবিনের গোমর ফাঁস করে দিলেন কাজী
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
গুজবে তেলের পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ট্যাংকি ভর্তি করার হিড়িক, প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান
চাকরি হারালেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, গ্রেফতারে চলছে অভিযান
আত্মগোপনে আছি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জীবনের নিরাপত্তা চাই: জামায়াত এমপির ড্রাইভার
আত্মগোপনে আছি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জীবনের নিরাপত্তা চাই: জামায়াত এমপির ড্রাইভার