দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি এ নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেছেন।
রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে গত ৩ জুন তিনি বলেছেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তবে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আবার তা ব্যাহত করার একটা পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, গণতন্ত্র খুব বিপদে পড়েছে। কারণ ইদানীং রাজনীতিতে একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।’’
ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব ও সরকারের দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির মুখে এ ধরনের শঙ্কার কথা শুনে দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্ষমতার চার মাসের মাথায় সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ থেকে এ ধরনের আফসোস বা হতাশামূলক বক্তব্য ভিন্ন রকম বার্তা দেয়। আসলে গণতন্ত্র নিয়ে এ সময়ে তার এমন উপলব্ধির কারণ কী? তিনি অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান বলতে কি বুঝিয়েছেন? আর কোন আঙ্গিকে গণতন্ত্রের বিপদের কথা বললেন? এখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা, নাকি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক আচরণগত দিকগুলো ইঙ্গিত করেছেন, এ নিয়েও বিশ্লেষণ হচ্ছে।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি মহাসচিব গণতন্ত্র নিয়ে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা মোটাদাগে বোঝা মুশকিল। তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য নিশ্চয়ই এক ধরনের তাৎপর্য বহন করে। তার এ ধরনের শঙ্কার দুটি দিক থাকতে পারে। এক হচ্ছে, সম্প্রতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতা। অপরদিকে বর্তমান বিরোধী দলে যারা আছে, তাদের রাজনৈতিক আদর্শগত ভিন্নতা। কারণ অতীতে সরকার ও বিরোধী দলে ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তাদের মতাদর্শগত জায়গায় কিছুটা মিল ছিল। আর এ ক্ষেত্রে বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে তো ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পার্থক্যের পরিধি অনেক। তাই বোঝাপড়ার দিক থেকেও হয়তো তিনি গণতান্ত্রিক শক্তির অবস্থানগত দিককে বুঝিয়ে থাকতে পারেন।
মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক উপলব্ধি
দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে পরপর কয়েকটি কর্মসূচিতে প্রায় অভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গত ৫ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এখানকার রাজনীতি ভয়াবহ পরিণতিতে চলে গেছে। সব রাজনৈতিক নেতার চরিত্র হনন ও যা খুশি তাই করা হয়। সমাজের কাছে তাদের হীন ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনীতিকে ধ্বংস করার একটা ষড়যন্ত্র চলছে। এটা কখনোই সুস্থ রাজনীতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়। তারা গণতান্ত্রিক শক্তি কিনা সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।’’
তিনি বলেন, ‘‘২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আজকে আবার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সেই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার একটা উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়, গণতন্ত্র খুব বিপদে পড়েছে। চারদিকে সুপরিকল্পিত ও সচেতনভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।’’
এর একদিন আগে ৪ জুন রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) এক অনুষ্ঠানেও একই ধরনের কথা বলেছিলেন বিএনপির মহাসচিব।
তিনি বলেন, ‘‘জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার কিছু দিন পর থেকে কিছু কিছু দল এমনভাবে চক্রান্ত করছে, যেন এখানে গণতন্ত্র না থাকে। আমাদের সৌভাগ্য যে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছি। এই সরকারের দায়িত্ব হবে— দ্রুততার সঙ্গে এই চক্রান্তকে চিহ্নিত করে সঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা।’’ তিনি আরও বলেন, তার দল বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই এখানে অন্য কোনও বিভাজন সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।
আসলে ফখরুলের ইঙ্গিত কোনদিকে?
বিএনপির মহাসচিব বর্তমান অগণতান্ত্রিক ও অশুভ শক্তি বলতে কাকে বুঝিয়েছেন বা গণতন্ত্র কোন প্রেক্ষাপটে বিপদে পড়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও বক্তব্য দেননি। তবে এ প্রসঙ্গে তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যকে ভিন্ন ধরনের ইঙ্গিত মনে বলে করছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দিকে যতটা না অভিযোগের তীর, তার চেয়ে বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতকেই বোঝানো হচ্ছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। তাদের মতে, জামায়াতকে অতীতে মূলধারার দল হিসেবে মনে করতো না বিএনপিসহ অন্যান্য দল। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে জামায়াত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র সাংবাদিক মনে বলেছেন, ‘‘জামায়াতকে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি হজম করছে অনিচ্ছাকৃতভাবে।’’
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত মিলে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘‘জামায়াতে ইসলামী একটি ‘উগ্রবাদী দল’। তাদের উত্থানের পেছনে আওয়ামী লীগ দায়ী।’’ তার মতে, ‘‘দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসন ছিল। যখনই গণতন্ত্র চাপা থাকে, তাকে যখন আটকে দেওয়া হয়, তার যখন কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়—তখন অন্য উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং সেটাই দেশে হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আজকে যেটুকু উত্থান হয়েছে জামায়াতের, সেটা আওয়ামী লীগের কারণে। তাদের দমন-পীড়নমূলক যে শাসন, বিরোধী দলকে ফাংশন করতে না দেওয়া, তাদের ইনোসিয়েট করতে না দেওয়া, এর কারণে এমন হয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য এমন একটি বিরোধী দল আমরা পেয়েছি।’’
অপরদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতাকেও তিনি অশুভ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কিনা, সে বিষয়টিও উড়িয়ে দিতে চান না আরেকটি পক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমান গণতান্ত্রিক চিত্র নিয়ে বিএনপি মহাসচিব যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তিনি আসলে কী বুঝাতে চেয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে এটা তো পরিষ্কার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশে একটা চক্রান্ত হচ্ছে। একটি হচ্ছে বিগত দিনের ফ্যাসিবাদী দল পতিত আওয়ামী লীগ। মানুষের অধিকার হরণ করতে গিয়ে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে। এখন আবার তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। আর তাদের প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তারাও মূলত অগণতান্ত্রিক শক্তি। মির্জা ফখরুল তাদের নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করতে পারেন। তবে আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারও কম দায়ী নয়। কারণ অতীতে তারা এই শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। আবার ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের সব কিছুই তারা আঁকড়ে ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কোনও কথা বলছে না। নতুন করে প্রতিরক্ষা চুক্তির চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’’
বিএনপি নেতাদের মূল্যায়ন
দেশের গণতন্ত্র নিয়ে দলের মহাসচিবের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপির দুই নেতা। বিএনপির স্বনির্ভর-বিষয়ক সহসম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘‘দলের মহাসচিব কেন এমনটি উপলব্ধি করছেন সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অতীতে বর্তমান বিরোধী দলটির কতটুকু অবদান ছিল, দেশের মানুষই তা মূল্যায়ন করবে। আমি মনে করি, একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে তারা বিরোধী দলের আসনে বসেছে। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড কখনোই গণতান্ত্রিক ছিল না। তারা বরং প্রতিপক্ষকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আক্রমণ করছে। অথচ গণতন্ত্রে গঠনমূলক বিরোধী দলের দায়িত্বশীলতা আচরণ জরুরি।’’
জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু অশুভ শক্তি বারবার গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। তারা রাজনৈতিকভাবে আমাদের মোকাবিলা করতে না পেরে সব সময় চরিত্র হননের পথ বেছে নেয়। তবে মহাসচিব কাদের ইঙ্গিত করেছেন, সেটা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।’’









