সংবিধান সংশোধন-সংস্কার বিতর্ক, শেষ পর্যন্ত কোন পথে বিএনপি?

মহসীন কবির
০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৫৯আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৫৯

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মাথায়ও সংবিধান সংশোধন না সংস্কার—এই বিতর্কের সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি সরকার ও বিরোধী দল। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল সংস্কারের দাবিতে অনড় রয়েছে। এ লক্ষ্যে সংসদ অধিবেশনের পাশাপাশি রাজপথেও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন দলগুলোর নেতারা। এরই মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে বিভাগীয় জেলা পর্যন্ত ধারাবাহিক লং মার্চ ও নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে দলগুলো।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীতে বিরোধী দলের অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংবিধান সংশোধনের দিকেই এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত কমিটির প্রথম বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে।

এতে জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কী হবে, সংবিধান সংশোধন কমিটি কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ১৩ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৭ সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলকে তাদের ৫ জন সংসদ সদস্যের নাম দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু তারা সাড়া না দেওয়ায় সরকার একলা চলো নীতিতেই পথ চলছে। অবশ্য তারা এখনও বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র। এর বাইরেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জুলাইয়ের অংশীজন ও দেশের বিশিষ্টজনদের মতামত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। আর বিরোধী দল চাইলে চিঠির মাধ্যমেও মতামত দিতে পারে। যদিও তারা সে প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বিরোধীদল ছাড়াই বিএনপি এই সংশোধন কতটুকু টেকসই করতে পারে বা এ নিয়ে ভবিষ্যতে আইনগত কোনও চ্যালেঞ্জ হতে পারে কিনা, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যেহেতু জুলাই সনদে বিএনপিসহ অন্যান্য অংশীজনরা সই করেছেন, সেখানে শুধু ক্ষমতাসীন দলের মতামতে যদি সংবিধান সংশোধন বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আদালতে কেউ চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যেহেতু জুলাই জাতীয় সনদে আমরা ৩৭টি রাজনৈতিক দল সই করেছি। সেখানে একটি সমন্বয় কমিটি এবং দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিটি। যাদের গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি জুলাই সনদ মানলেও শপথ নিয়েছে একটিতে। তাই তারা যদি এককভাবে সংবিধান সংশোধনই করে, তা ভবিষ্যতে আদালতে যে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে সরকার চাইলে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে।’’ এক্ষেত্রে বিরোধী দল আন্দোলন করে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবে কিনা জানতে চাইলে মান্না বলেন, সাধারণত এ ধরনের দাবি তেমন জনসম্পৃক্ত নয়। তাই তারা দাবি আদায় করতে হলে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।’’  

দ্বিমত কী নিয়ে?

প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ অন্য দলগুলো  ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এদিন জুলাই সনদ অনুযায়ী তারা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। যদিও বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নেন। তারা মনে করে এটি সংবিধানবিরোধী।  এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক অনুষ্ঠানে জুলাই জাতীয় সনদে সই করেন বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৭টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। তবে ‘অভিমান’ করে তখন না করলেও নির্বাচনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি যমুনায় গিয়ে সই করেন এনসিপির নেতারা। যদিও এখনও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ অব্যাহত আছে।

শুরুতেই সংবিধান সংশোধনের দাবিতে অনড় জামায়াত ও এনসিপি। রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশ অনুযায়ী সংস্কার কমিটি গঠনের দাবি জানান তারা।

কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির মতে, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কারের’ কোনও বিধান নেই। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ আছে। তাই সনদে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিএনপি এর সবগুলো হুবহু সংবিধানে যুক্ত করতে চায় না। বিশেষ করে সনদের ১৫ ধারায় একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না হওয়ার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদের ১৫ নম্বর ধারায়। সংবিধান সংশোধন বিল আইন সভার উভয় কক্ষে পাস হতে হবে—এমন প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।

অপরদিকে বিএনপি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আবার উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে দলটি একমত হলেও এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদে যা বলা হয়েছে, সেখানে দলটির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। কিন্তু উচ্চকক্ষ গঠন করার বিষয়ে বিরোধী নয় বিএনপি।

ভবিষ্যতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছে বিরোধী দল?

বিরোধী দলকে বাদ দিয়েই সংবিধান সংশোধন বাস্তবায়ন করলে সরকার ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বলে মনে করে বিরোধী দল। এক্ষেত্রে আদালতে গেলে তা বাতিলও হয়ে যেতে পারে। আবার রাজপথের আন্দোলনে জনমত সরকারের বিপক্ষেও চলে যেতে পারে।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও দলটির মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাই সনদে জনগণের অভিপ্রায়কেই সর্বোচ্চ আইন বলে অভিহিত করা হয়েছে—যেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। অথচ সরকার একতরফা কমিটি করে সংশোধন কমিটি করেছে।’’ তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে যে কেউ আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারকে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন সরকারের তরফে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে বিরোধী দল বিএনপিকে আহ্বান জানালেও তারা অংশ নেয়নি। পরে বিএনপিকে বাদ দিয়েই ওই কমিটির সুপারিশে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বিলুপ্ত হয়। কিন্তু সম্প্রতি আদালত সে সংশোধনী বাতিল করে।’’ সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠনের পক্ষে অনড় আছি। কিন্তু সরকার গণভোটের গণরায়কে উপেক্ষা করছে। সরকারের সংবিধান সংশোধনী কমিটিতেও আমরা যাইনি। এখন সরকার চিঠি দিয়ে মতামত জানানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে সে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। হয়তো রাজপথ থেকেই এর ফায়সালা খুঁজতে হবে।’’

কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করতে চায় বিএনপি?

বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করেই গত ৪ আগস্ট জাতীয় সংসদে বৈঠক করে ক্ষমতাসীন দলের সংবিধান সংশোধন কমিটি। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত মতবিরোধের কারণে এই কমিটিতে নাম দেয়নি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ ফাঁকা রাখা হয়েছে। যখন নাম দেবে, তখনই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’’

বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলে সংশোধন কতটুকু বাস্তব সম্মত হবে–এমন প্রশ্নে গণমাধ্যমকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‘বিরোধী দলের সুপারিশ নেওয়ার জন্য যা যা করণীয় সব করা হবে। আর তাদের সুপারিশ জুলাই সনদের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত আছে। কারণ জুলাই সনদ সই করেছে ৩৩টি রাজনৈতিক দল। তার মধ্যে বিরোধী দলের সব সুপারিশ সেখানে আছে।’’ তিনি এখনও বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে আশাবাদী বলে জানান।

এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রেখেই সামনে এগোতে চাই। সংবিধান অনুযায়ী তো সংস্কার কমিটি বলতে কিছু নেই। জাতির প্রয়োজনে সংশোধনের সুযোগ আছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘জুলাই সনদে যাই বলা হোক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকেও তো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’’ প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে চলার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
বিএনপিতে যোগ দিলেন জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুলের ১২ অনুসারী
দিল্লিতে শেখ হাসিনার কনফারেন্স: সরকারকে দুষছেন নাহিদ ইসলাম
ভারত শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ করেছে: গোলাম পরওয়ার
সর্বশেষ খবর
বরগুনায় রিফাত হত্যা: মিন্নির খালাসের আশায় পরিবার ও আইনজীবী 
বরগুনায় রিফাত হত্যা: মিন্নির খালাসের আশায় পরিবার ও আইনজীবী 
বোমা হামলাসহ নাশকতার শঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতা জারি 
বোমা হামলাসহ নাশকতার শঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতা জারি 
সিলেটে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া বাউলশিল্পী কে এই পেহেলি ভৈরবী?
সিলেটে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া বাউলশিল্পী কে এই পেহেলি ভৈরবী?
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বাধিক পঠিত
ডাকা হচ্ছে সংসদের বিশেষ অধিবেশন
ডাকা হচ্ছে সংসদের বিশেষ অধিবেশন
প্রথমবার ‘কাঁঠাল থেকে বিস্কুট’ তৈরি করে চমকে দিলেন ছাত্তার, যেখানে পাবেন
প্রথমবার ‘কাঁঠাল থেকে বিস্কুট’ তৈরি করে চমকে দিলেন ছাত্তার, যেখানে পাবেন
সবজিতে স্বস্তি, মাছ-মাংস-ডিমে বাড়ছে চাপ
সবজিতে স্বস্তি, মাছ-মাংস-ডিমে বাড়ছে চাপ
শুরু হচ্ছে পুষ্টিচাল বিতরণ, কেজি ১৫ টাকা
শুরু হচ্ছে পুষ্টিচাল বিতরণ, কেজি ১৫ টাকা
লেবানন ছাড়তে শর্ত দিলো ইসরায়েল
লেবানন ছাড়তে শর্ত দিলো ইসরায়েল