সংসদীয় কমিটির বৈঠক বর্জনের যে ব্যাখ্যা দিলেন জামায়াত নেতারা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩০আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩০

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিলের প্রতিবাদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক বর্জন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই বিল পর্যালোচনার জন্য কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। এতে অংশীজন ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং বিলটি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত হয়েছে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতের দুই সদস্য ড. মো. নাজিবুর রহমান ও অ্যাডভোকেট আল ফারুক আবদুল লতিফ উপস্থিত ছিলেন। বিলটি পর্যালোচনার জন্য বৈঠকে উত্থাপন করা হলে তারা বৈঠক বর্জন করে বেরিয়ে যান।

বৈঠক বর্জনের কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ড. মো. নাজিবুর রহমান বলেন, ‘বহু বিতর্কিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিলটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশন ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজন ও সুধী সমাজও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’

মাত্র দুই কার্যদিবস সময়

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর পর কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অংশীজন, মানবাধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।’

তার অভিযোগ, এই সময়সীমার কারণে কমিটির সদস্যদের প্রয়োজনীয় নথি ও মতামত পর্যালোচনা করার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিভিন্ন সুধীজনের মতামত চেয়েছিল। কারা কী মতামত দিয়েছেন এবং সেই মতামতের কতটুকু আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেটি জানার অধিকার সংসদীয় কমিটির রয়েছে। কিন্তু মাত্র দুই দিনের সময়সীমার কারণে কমিটি সেই অধিকারও যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না।’

আইন আরও দুর্বল করা হয়েছে

জামায়াতের এই নেতা বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার আরও শক্তিশালী একটি আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বিলে কমিশনের ক্ষমতা আরও সীমিত করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার আরও শক্তিশালী একটি আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, নতুন করে যে আইনটি আনা হয়েছে, সেটিকে আরও দুর্বল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত করার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছে।’

নাজিবুর রহমানের ভাষ্য, প্রস্তাবিত আইনে জনগণের অধিকার সুরক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার সুরক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সে কারণে আমরা এটিকে একটি কালো আইন হিসেবে দেখছি।’

রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করা হচ্ছে

বিলটি দ্রুত পাসের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘এভাবে তড়িঘড়ি করে বিলটি পাস করানোর প্রক্রিয়ায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করা হচ্ছে। আমরা এ ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না এবং এর কোনো দায়ভারও নিতে চাই না।’

বৈঠকের আগে সংসদে বিলটি নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই আইন নিয়ে আজকে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে না। এটি আগে অধ্যাদেশ আকারে ছিল। সেই অধ্যাদেশ বাতিলের সময়ও আমরা আপত্তি জানিয়েছি এবং নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি। কিন্তু আমাদের কোনও বক্তব্যই আমলে নেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার কার সঙ্গে পরামর্শ করেছে, কী মতামত পেয়েছে, সেসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। কমিটির সদস্য হিসেবে এসব নথি দেখার অধিকার আমাদের রয়েছে। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।’

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সংসদে বিরোধী দলের মত দমন করার জন্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ওই পাশে যারা আছেন, তারা আপনাদের তিন গুণ। আপনারা যদি শব্দ করেন, তারাও শব্দ করবেন। এ ধরনের বক্তব্য সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের কথা বলার অধিকার ও মর্যাদাকে আঘাত করছে।’

তিনি বলেন, ‘সেদিন সংসদ থেকে আমরা যে ওয়াকআউট করেছিলাম, সেটিও ছিল এই সংসদীয় ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদে। মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিল নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটির রিপোর্টেও আমাদের বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু সরকার সেগুলো আমলে নিচ্ছে না।’

২০০৯ সালের আইনের প্রসঙ্গ

প্রস্তাবিত আইন নিয়ে ২০০৯ সালের আইনের সঙ্গে তুলনাও করেন জামায়াতের এই নেতা।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার যেভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত আইন করে প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল করে দিয়েছিল, প্রস্তাবিত আইনেও একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। গত ১৭ বছরে গুমসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনও সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠলে বা জনগণের ওপর নিপীড়ন চালালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যাতে কার্যকরভাবে কথা বলতে না পারে, সে লক্ষ্যেই তাদের ক্ষমতা আরও সীমিত করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।’

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়েও আপত্তি

বৈঠক বর্জনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, ‘সরকার ভুক্তভোগী জনগণ, অংশীজন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ রহিত করেছে। অধ্যাদেশটি বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে দুর্বল ও সীমিত পরিসরের একটি বিল সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বিলটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক জোট জিএএনএইচআরআই-এর স্বীকৃত মানদণ্ড, প্যারিস প্রিন্সিপলস এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

নাজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে জনগণের সঙ্গে যথাযথ মতবিনিময় এবং স্বাধীনভাবে বিলটি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কার্যত সীমিত করা হয়েছে। ফলে কমিটিকে একটি রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সেহেতু আমরা কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা এই বিলের কোনো আলোচনা বা পর্যালোচনায় অংশ না নেওয়া এবং বিলটি পাসের প্রক্রিয়ার কোনও পর্যায়ে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বৈঠকে আমরা বক্তব্য দিয়ে কোনও আলোচনায় অংশ নিইনি। পরে বৈঠক থেকে চলে এসেছি।’

 

/এসএমএ/এএ/
সম্পর্কিত
মানবাধিকার কমিশন বিলের প্রতিবাদে সংসদীয় কমিটির বৈঠক বর্জন জামায়াতের
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে কী আছে
গুমের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জামায়াত আমিরের 
সর্বশেষ খবর
হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো নুরুল ইসলাম সুজন ও শাহজাহান ওমরকে
হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো নুরুল ইসলাম সুজন ও শাহজাহান ওমরকে
মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশিদের ফেরাতে চালু হলো ‘রিপ্যাট্রিয়েশন ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’
মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশিদের ফেরাতে চালু হলো ‘রিপ্যাট্রিয়েশন ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’
চেলসিতে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক
চেলসিতে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার: এলজিআরডি মন্ত্রী
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার: এলজিআরডি মন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফেরার হাওয়া দুইটা জায়গায় দেখা যায়: সারজিস আলম
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফেরার হাওয়া দুইটা জায়গায় দেখা যায়: সারজিস আলম
‘এরা আমাকে মেরে ফেলবে’; মৃত্যুর আগে তরুণীর আকুতি, সন্তানসহ মৃত্যু
‘এরা আমাকে মেরে ফেলবে’; মৃত্যুর আগে তরুণীর আকুতি, সন্তানসহ মৃত্যু
কী ঘটেছিল সেদিন রাতে, থানায় এসে বিস্তারিত জানালেন ভাইরাল তরুণী
কী ঘটেছিল সেদিন রাতে, থানায় এসে বিস্তারিত জানালেন ভাইরাল তরুণী
অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল