পরিকল্পনাহীনতা ও জ্বালানি ক্রয়ের সিদ্ধান্তহীনতা থেকেই দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। বিএনপি জনগণের সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও বাস্তবে ‘অলিগার্কদের সরকার’ গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বুধবার (১২ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব ‘কালাকানুন’ বাতিলের প্রতিশ্রুতি ছিল। অথচ এখন জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণের নামে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নাহিদ ইসলামের দাবি, বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতের অনুমতি চেয়ে সরকারকে চিঠি দেওয়ার পর ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসিকে মাত্র চার দিনের মধ্যে বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬-এর খসড়া দিতে বলে। এতে বিপক্ষে মত দেওয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করেছে। এতে দরদাতা কমে দাম বাড়বে এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের অর্থসংকটের যুক্তি নাকচ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। ১ থেকে ৮ আগস্ট ৯১৫ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। তার মতে, ‘ডলার আছে, নেই ক্রয়ের টাইমলি শিডিউল।’
বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০ আগস্ট রাত ১টায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলেও উল্লেখ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধ শুরুর আগেই এপ্রিল মাসে লোডশেডিং পরিস্থিতি নাজুক ছিল। এপ্রিল, জুলাই ও আগস্টে সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ৪১ হাজার, ৩২ হাজার ও ৫৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল এফএসআরইউ দুর্ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয় এবং ৫ আগস্ট আংশিক সরবরাহ ফিরে আসে। এ ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করেন তিনি।
সংকট মোকাবিলায় তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ স্থগিত, আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়া, বিপিসির ক্রয় শিডিউল অনুমোদন, মহেশখালীর এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, গ্যাস বরাদ্দে ডেটাভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণ নিরীক্ষার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।
দীর্ঘমেয়াদে তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সমুদ্র অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক মানের পিএসসি, বাপেক্সে বিনিয়োগ ও বিদেশি প্রযুক্তিগত অংশীদার নেওয়া এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেন তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নের লক্ষ্য দৃশ্যমান করার আহ্বানও জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। সরকারের প্রথম দায়িত্ব জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়। বিএনপি সরকারের ‘ভুল, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতি’র বিরুদ্ধে এনসিপি দাঁড়াবে।









