আইসিজের আদেশ: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন সুযোগ দেখছে বিএনপি

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২২:১১, জানুয়ারি ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৩, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

রোহিঙ্গা (ছবি: ফোকাস বাংলা)মিয়ানমারকে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) যে চারটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন, এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা-সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা সরকারের ভুল ছিল। তবে, এখন নতুনভাবে এই সংকট মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য রোহিঙ্গা-প্রত্যাবর্তনকে কার্যকর করতে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে রাজি আছে বিএনপি। তবে,  বিএনপি আশ্বাসকে স্বাগত জানালেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গা-ইস্যুটি বোঝার ক্ষেত্রে বিএনপির দৈন্য আছে। কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সরকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ-সংক্রান্ত মামলায় চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, গণহত্যা থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন আইসিজে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির ‘ফরেন রিলেশন্স’ কমিটির প্রধান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হয়েছে, সে ব্যাপারে  জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলও প্রতিবেদন দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেলো।’

জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য অবশ্যই ভালো। এতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কোনও ভূমিকা আছে বলে মনে করি না।’

আর আমীর খসরু বলেন, ‘আইসিজে’র আদেশের পর সরকারকে বিষয়টি নিয়ে জনমত সৃষ্টি করে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিএনপি তো আগে থেকেই বিষয়টি বহুপাক্ষিকভাবে মোকাবিলা করার কথা বলে আসছে। কিন্তু সরকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে, সেটার কোনও ভিত্তি নেই। এটাই তো প্রথম ভুল সরকারের। ওই চুক্তির ভিত্তিতে কিছুই হয়নি, পুরোপুরি রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি মিয়ানমারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আবার সুযোগ এসেছে, মাল্টিলেটারাল ইস্যু করে, কনসেপ্ট নিয়ে, মাল্টিলেটারাল ওয়েতে সরকারকে মুভ করতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ইকুয়েডর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন  বলেন, ‘আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। মিয়ানমার আমাদের কাছে অঙ্গীকার করেছে যে, তারা তাদের রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। কিন্তু নিচ্ছে না। তাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। সেজন্য আমরা বহুপাক্ষিকভাবে ব্যবস্থাপনা করেছি। শুধু বহুপাক্ষিক নয়, সারাবিশ্ব এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষে আছে। একইসঙ্গে আমরা আদালতে গিয়েও বিষয়টি বলেছি। কৌশলগত কারণে আমরা নিজেরা না গিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে সম্পৃক্ত করেছি।’

আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের বিচার কক্ষ প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১৯ সালের আগস্টের শেষ দিকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ-ই মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়নি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্যরা বলছেন, ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরই উচিত ছিল অভিযোগ দায়ের করা। কিন্তু এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে গাম্বিয়া। তারা এই মামলাকে আন্তর্জাতিক আদালতে তুলে নিয়ে এসেছে। দেশটিকে সহযোগিতা করেছে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।

আইসিজের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে মানবাধিকারের বিজয় বলে উল্লেখ করেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের তদন্ত দল মিয়ানমারের শীর্ষ ৬ জেনারেলকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করে তাদের বিচারের সুপারিশ করেছিল। তবে, আমরা বিস্মিত হয়েছি যে আমাদের সীমান্তের কাছাকাছি লাখ লাখ রোহিঙ্গার ওপর এই ভয়াবহ মানাবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গাম্বিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হলো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, অথচ আমরা তা থামানোর জন্য কিছুই করিনি। উপরন্তু প্রাথমিকভাবে সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দিতেও চায়নি। যখন খালেদা জিয়া প্রতিবাদ শুরু করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাপ সৃষ্টি করেছে, তখনই সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। ন্যায়বিচার ও মানবতার স্বার্থে গাম্বিয়া যা করেছে, তার জন্য আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

সদ্যবিদায়ী বছরের ২১ ডিসেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে গাম্বিয়া, নেদারল্যান্ডস ও কানাডাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ইতোমধ্যে এই তিনটি দেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’ গত ২ জানুয়ারি গাম্বিয়াকে ধন্যবাদপত্র দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান।

বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে ‘জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে আলোচনা করার আহ্বান ছিল সরকারের প্রতি। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের সমালোচনা করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে সরকার উল্লেখযোগ্য কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। তারা (রোহিঙ্গারা) এখানে পরিবেশ নষ্ট করছে। গাছ কেটে ফেলছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।’

এ বিষয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তরিক বিএনপি।’ বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা তো সহযোগিতার কথা সব সময়ই বলে এসেছি। আমরা তো দেশেও হেল্প করতে পারি, বিদেশিদের কাছেও গিয়েও বলতে পারি। সরকার যদি মনে করে, বিএনপির কেউ ওআইসির সদস্য দেশগুলো বা অন্যদের বোঝানোর জন্য যাক, তাহলে আমরা স্বাগত জানাবো।’

এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের হয়তো বোঝার কিছুটা সমস্যা আছে। তারা বিষয়টিকে এখনও ঠিক বোঝেননি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বলেন, ‘এটা তো বিএনপি বা আওয়ামী লীগের সমস্যা নয়, এটা তো দেশের সমস্যা। নিজেরাই আমরা সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই সমস্যা সমাধানে দরকার হলে আমরা প্রতিনিধি দল পাঠাতে পারি। আমরাও অন্যান্য দেশে যেতে পারি।’

রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে স্বীকার করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ ব্যাপারে বিএনপি কোনও ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি না করলেই ভালো। বরং সহযোগিতা কীভাবে করা যাবে, তারা করতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপ্রিয়, আমরা শান্তির মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান চাই, নিশ্চয়তা চাই। তারা যদি আমাদের বলেন, যুদ্ধ করুন, তাহলে আমরা ঠিক তা করবো না। কারণ, যুদ্ধ খুব ভালো জিনিস নিয়ে আসে না। শান্তির পথে যা যা করা যায়, আমরা তা করে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ এখন পর্যন্ত সরকার যথেষ্ট সফল হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ