ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ঢাকা-৮ আসনে ভোটের উত্তাপ ততই বাড়ছে। সচিবালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দফতর এই আসনের আওতাভুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে আসনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশেষ করে অতীতের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ এলাকা ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এবারও সবার নজর এই আসনে।
প্রচারণায় সরগরম, বাড়ছে উদ্বেগ
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর অলিগলি। তবে প্রচারণার সমান্তরালে বাড়ছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে একাধিক সংঘাতের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ঢাকা-৮। ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে যেমন আগ্রহ রয়েছে, তেমনি ভোটের দিনের পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে উদ্বেগ।
মাঠের লড়াইয়ে যারা
এই আসনে মূল লড়াই হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস (ধানের শীষ) এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী (শাপলা কলি)-র মধ্যে। অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন— জুবায়ের আলম খান রবিন (লাঙ্গল - জাতীয় পার্টি), মেঘনা আলম (ট্রাক - গণঅধিকার পরিষদ), মুফতি কেফায়েত উল্লাহ কাশফী (হাতপাখা - ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা (কাস্তে - সিপিবি), রাফিকুজ্জামান ফরিদ (কাচি - বাসদ-মার্কসবাদী)।
নির্বাচনি এলাকা ও ভোটের পরিসংখ্যান
২০২৬ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা-৮ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৫ এবং নারী ১ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫ জন।
মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ ও শাহজাহানপুর থানা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির ০৮, ০৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই বিশাল এলাকা।
ভোটারদের চাওয়া ও শঙ্কা
সরেজমিনে ফকিরাপুল, এজিবি কলোনি, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও শাজাহানপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভোটাররা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি চাইছেন। বিশেষ করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং যানজট নিরসন তাদের প্রধান দাবি। শাজাহানপুর বাজারের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু আমাদের বাজারের কোনও উন্নতি হয়নি। যিনিই নির্বাচিত হউক না কেন, আমাদের ঘিঞ্জি পরিবেশ আর ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানে যেন আন্তরিক হন।”
তবে ভোটের দিন নিয়ে শঙ্কা কাটছে না অনেকেরই। ফকিরাপুলে আইটি ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন আকাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রার্থীদের পরস্পর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর সংঘাতের খবরে সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে ভয় পেতে পারেন। প্রশাসনকে এখন থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর হতে হবে।”
প্রার্থীদের নিয়ে মূল্যায়ন
ঢাকা-৮ আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ঘুরেফিরে কয়েকজনকে নিয়ে ভোটের সমীকরণ করতে চান ভোটাররা।
অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকার আশা করছেন মির্জা আব্বাসের সমর্থকরা। কাকরাইল এলাকার ভোটার কামরুল ইসলামের মতে, “পুরনো রাজনীতিবিদ হিসেবে মির্জা আব্বাসের এক ধরনের ক্যারিশমা আছে।”
অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় এবং জামায়াত-জোটের ভোট ব্যাংকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বড় চমক হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে। স্কুল শিক্ষিকা হাবিবা বেগমের মতে, “এবার লড়াই হবে মূলত ধানের শীষ ও শাপলা কলির মধ্যে।”
এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী অভিনেত্রী মেঘনা আলম ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীও উল্লেখযোগ্য ভোট টানতে পারেন বলে সাধারণ ভোটারদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জাতীয় পার্টির জুবায়ের আলম খান রবিন (লাঙ্গল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা (কাস্তে) ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদীর রাফিকুজ্জামান ফরিদ (কাচি) প্রতীকে নিজ দলীয় নির্দিষ্ট ভোট পেতে পারেন বলে মনে করেন ভোটারদের কেউ কেউ।









