পুরো সিরিজে বল রিভার্স করছিল বেশি- এমন কথাই বলেছেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। যেভাবে চাচ্ছিলেন সেভাবে বল হচ্ছে না। অনেকটা মরিয়া হয়েই বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে টেম্পারিংয়ের পথ বেছে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক! টেম্পারিং পুরনো পাপ হলেও নব নব অভিনবত্ব বিষয়টিকে বার বার নিয়ে আসে সামনে। তখন ক্রিকেটীয় ভদ্রতার নিগড় ভেঙে যাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন অভিযুকক্তরা।
সমালোচনা বেশি হওয়ার কারণ প্রতারণার আশ্রয়। নতুন নতুন পন্থায় প্রতারণা কখনই শিল্প নয়, শিল্প যদি হতোই তাহলে শিল্পের নান্দনিকতা বলে কিছু থাকে না। তাহলে আনফেয়ার ও অভিনব সব কিছুকেই শিল্প বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে।
ক্রিকেটে টেম্পারিং মানে কৃত্রিম কিছুর ব্যবহারে বলের বিকৃতি ঘটানো। যেমন নখ দিয়ে খোঁচা দেওয়া, পায়ের বুট দিয়ে মাড়ানো, গাম মিশ্রিত লালা দিয়ে বল পরিষ্কার, ক্রিমের ব্যবহার। এসব কিছুকেই দেখা গেছে টেম্পারিংয়ের অস্ত্র হিসেবে। সম্প্রতি স্মিথরা ব্যবহার করেছেন টেপ! আঠালো কিছু ব্যবহার করে বল থেকে তার ফায়দা নেওয়ার কৌশল নিয়েছিলেন ব্যানক্রফট। কিন্তু টিভি-ক্যামেরার সম্প্রচারের যুগে বিষয়টি আর চাপা থাকেনি। ঘটনাগুলো ক্রিকেটে হাজারবার ঘটলেও কখন প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটেছে তা এখনও গবেষণার বিষয়। তবে বিষয়গুলো চোখে পড়া শুরু করেছে ক্যামেরার আধুনিকতায়। যেই কাণ্ডের অবতারণা করলেই চলে আসে ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক আথারটনের নাম। তেমন কিছু টেম্পারিং বিষয়ক আলোচিত ঘটনা পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো-
১. ১৯৯৪ সালে পকেটে বালি রেখে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লর্ডসে মাঠে নেমেছিলেন আথারটন। পকেট থেকে বালি নিয়ে বলে ঘষেছিলেন। টিভি ক্যামেরাতেও ধরা পড়ে তার ঘটনা। ম্যাচ রেফারির কাছে মিথ্যা বলেন আথারটন। বলেন হাত শুকাতেই পকেটে বালি রেখেছিলেন তিনি! এমন মিথ্যার জাল বুনেও রক্ষা হয়নি। তাকে জরিমানা করা হয় ২ হাজার পাউন্ড।
২. অবশ্য ১৯৯১ সালে সুইংয়ের কারিগর ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিসকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি করেছিল ইংলিশ ক্রিকেট। তখন কাউন্টি ক্রিকেটে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছিলেন দুই কিংবদন্তি। এমনকি আকিব জাভেদও ছিলেন সেই আলোচনায়। কিন্তু তাদের এমন সাফল্যে অভিযোগ আনা হয় বল টেম্পারিংয়ের। যদিও কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর এর তিক্ততা ছিল ১৯৯২ সালের সিরিজেও। তাদের ধারণা সেই সিরিজে টেম্পারিং করেছিলেন পাকিস্তানি বোলাররা। যদিও তা সীমাবদ্ধ থেকেছে সন্দেহের বেড়াজালেই।
৩. টেম্পারিং নিয়ে যত না ঘটনা ঘটেছে তার চেয়ে বেশি ঘটেছে বিতর্কিত বিষয়গুলো। এই যেমন ২০০১ সালে শচীন টেন্ডুলকারও ছিলেন এর শিকার। দক্ষিণ আফ্রিকায় পোর্ট এলিজাবেথে রেফারি মাইক ডেনিস শচীনের বিরুদ্ধে টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনেন। তাকে এক ম্যাচ নিষিদ্ধও করেন। টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখা যায় সিমকে খুঁচিয়ে দিচ্ছিলেন শচীন। যদিও ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল সিমের ভেতর আটকে থাকা ঘাস তুলছিলেন তিনি। এই টেস্ট নিয়ে উত্তেজনা এমনই পর্যায়ে ছিল যে রেফারি ডেনিসকে বর্ণবাদী হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়। পরের টেস্টে তাকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়। পরে অবশ্য টেন্ডুলকারকে অভিযোগ থেকে নিস্তার দেয় আইসসি।
৪. একইভাবে বিতর্কিতভাবে শাস্তির খড়গে পড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার ফাফ দু প্লেসিস। ২০১৬ সালে প্লেসিসকে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ দায়ী করা হয়। যদিও প্রোটিয়া অধিনায়ক নির্দোষ দাবি করেছিলেন নিজেকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ললি পপের লালা দিয়ে বল টেম্পারিং করেছিলেন। প্লেসিস বার বার নির্দোষ প্রমাণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুক্ত তুলে ধরেন, ‘বিষয়টি দুইভাবে দেখা যেতে পারে। একটা হচ্ছে বল টেম্পারিং, আরেকটা বলের উজ্জলতা ধরে রাখার কৌশল। যেখানে টেম্পারিং মানে বলকে খুঁটে দেওয়া, আকৃতি নষ্ট করা; যেটা অবৈধ। আর উজ্জলতা মানে টেম্পারিং থেকে ভিন্ন কিছু। যেটা সবাই করে। আমার কাছে মনে হয় না উজ্জলতা রক্ষা করা ভুল কিছু। আমার কাছে মনে হয় না আমি ধোঁকা দেওয়ার মতো কিছু করেছিলাম। আমি বলকে উজ্জল করার চেষ্টা করছিলাম। এটাতে আমি কোনও সমস্যা দেখি না।’
অবশ্য এই প্লেসিসই ২০১৩ সালে টেম্পারিংয়ের আরেক অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। নিজের প্যান্টের জিপারে বল ঘষেছিলেন। তাতে ৫ রানের জরিমানা তো ছিলই। সঙ্গে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানা করা হয় তাকে।
৫. অবশ্য নির্লজ্জ টেম্পারিংয়ের ঘটনাও কম ঘটেনি। বল কামড়ে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন বুম বুম খ্যাত শহীদ আফ্রিদি।
সবশেষ এমন নির্লজ্জ ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পুরো অস্ট্রেলিয়া দল। শাস্তিমূলক পদক্ষেপে যাই সিদ্ধান্ত হোক এমন প্রতারণা শিল্পের কাতারে পড়বে না নিশ্চয়ই?








