সদ্য শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অনেক তারকা ক্রিকেটারদের টপকে শীর্ষ রান সংগ্রাহক হয়েছেন সর্বশেষ ২০১১ সালে জাতীয় দলে খেলা রকিবুল হাসান। লিগের রানার্সআপ প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবের এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান ১৬ ম্যাচে এক সেঞ্চুরি ও ৫ হাফসেঞ্চুরিতে ৬৫.৩৬ গড়ে ৭১৯ রান করেন। এছাড়া গত মৌসুমের শুরুতে লংগার ভার্সন বিসিএল-এও সফল ছিলেন তিনি। দুই ম্যাচ কম খেলেও আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার হন রকিবুল। ৪ ম্যাচে ৮ ইনিংসে ব্যাট করে দুই শতক ও দুই অর্ধশতকে সেন্ট্রাল জোনের হয়ে ৭৪.৪২ গড়ে ৫২১ রান করেন। জাতীয় লিগে ৬ ম্যাচে ৩ ফিফটিতে ৪৫.২৫ গড়ে করেছেন ৩৬২ রান।
সবমিলিয়ে শেষ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেলেন রকিবুল হাসান। বৃহস্পতিবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত পূর্ণাঙ্গ সিরিজের জন্য ঘোষিত প্রাথমিক স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছেন অভিজ্ঞ এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। ২০০৮ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলে খেলা রকিবুল নতুন শুরু ভাবছেন এটাকে।
প্রাথমিক দলে থাকলেই যে মূল একাদশে সুযোগ পাবেন তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবুও আত্মবিশ্বাসী রকিবুল। আপাতত তার লক্ষ্য কন্ডিশনিং ক্যাম্পে নিজেকে প্রমাণ করা। সেখানে পরিশ্রম করলে ফল আসবে বলেই বিশ্বাস করেন তিনি। জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডে রকিবুলের সুযোগ নতুন কিছুর সম্ভাবনা তৈরি করতেই পারে।
সামনে ঈদ। তাইতো অন্য সবার মতো ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন রকিবুল হাসান। পরিবার নিয়ে শপিংয়ের এক ফাঁকে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপ হয় বাংলাদেশ দলের সাবেক প্রধান কোচ জেমি সিডন্সের পছন্দের ক্রিকেটার রকিবুল হাসানের সঙ্গে। তার অনুভূতিসহ ক্রিকেট নিয়ে তার বর্তমান ভাবনাগুলো তুলে ধরা হলো পাঠকদের সামনে-
বাংলা ট্রিবিউন : ৩ বছর পর আবার বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রাথমিক দলে; কতটা ভালো লাগছে?
রকিবুল হাসান : এতো বছর পর সুযোগ। ভাবতে ভালো লাগছে। বেশি ভালো লাগছে পরিশ্রমের ফল পাওয়াতে। এই বছরটার শুরু থেকেই আমি নিজের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। আমার যোগ্যতা অনুযায়ী আমি আমার সেরা ক্রিকেটা খেলবো। সবার দোয়াতে আমি সেটা করতে পেরেছি। এজন্য আসলে খুব ভালো লাগছে। আমি পরিশ্রমের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জেও সফল হতে পেরেছি।
বাংলা ট্রিবিউন : লিগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার পর জাতীয় দলের ভাবনাটা মাথায় এসেছিল কিনা?
রকিবুল হাসান : আমি শুধু আমার ভালো খেলা নিয়েই মনোযোগী ছিলাম। সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারটা আমার হাতে কখনোই ছিল না। আমার কাজ কেবল পারফরম্যান্স করে যাওয়া। এটা নিয়ে আমি চিন্তা করিনি। তবে এতটুকু বিশ্বাস সব সময়ই মনের মধ্যে ছিল ভালো ক্রিকেট খেললে এক সময় না এক সময় আমি সুযোগ পাবোই।
বাংলা ট্রিবিউন : ২০১৫-১৬ মৌসুম পুরোটাই ভালো কেটেছে। পেছনে কোনও রহস্য আছে?
রকিবুল হাসান : আগেই বলেছি, আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। আমাকে এই মৌসুমে দারুণ কিছু করতে হবে। কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলাম। আমার সেরা ক্রিকেট খেলতে হবে। এর বাইরে কোনও রহস্য ছিল না। যদিও যা করেছি এটা আমার সেরা ক্রিকেট নয়। আমি বিশ্বাস করি এর চেয়ে আরও ভালো কিছু করার সুযোগ আছে। এটা মাথায় রেখেই আমার এবারের মৌসুমটা গেছে। এরজন্য ফাহিম স্যারের অনেক বড় অবদান রয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউন : কিভাবে ফাহিম স্যার আপনাকে সাহায্য করেছেন?
রকিবুল হাসান : উনি আমাকে সব সময় ক্রিকেট এবং ক্রিকেটের বাইরের মানসিক ব্যাপারে অনেক সাহায্য করেছেন। আমাদের সব সময় উৎসাহিত করেছেন ইতিবাচক চিন্তা করতে। এটাই আমার সফলতার অন্যতম একটা কারণ। এছাড়া আমার পরিবারের একটা অবদান ছিল। আমি অনেকদিন ধরেই জাতীয় দলের বাইরে। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে যেতাম। কিন্ত তারা সব সময় আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছে। ভালো খেলো, ভালো খেললে তোমাকে আবার ডাকবে। তাদের কথা বিফলে যায়নি।
বাংলা ট্রিবিউন : এবারের প্রিমিয়ার লিগের সফরটা তো নিশ্চয়ই মনে রাখার মতো হয়েছে?
রকিবুল হাসান : অবশ্যই। যেভাবে পরিকল্পনা করেছি সেভাবেই হয়েছে। তবে আরও কিছু রান হলে আরও ভালো লাগতো। এই মৌসুমে আমি বাবুল স্যারের কোচিংয়ে প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে খেলেছি। আমার রান করাতে তারও অনেক অবদান আছে। লিগে পারফরম্যান্স করার পেছনে ওনার অনেক অবদান আছে। আমাকে সুপার লিগে ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করার সাহস যুগিয়েছেন। সেখানে আমি সফল হয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন : ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করাতে বাবুল ভাইয়ের কোনও টেকনিক ছিল কিনা?
রকিবুল হাসান : এটা আসলে দলের চাহিদা ছিল। আমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। স্যার আমাকে বলেছেন, আমি তোমাকে ওপেনিংয়ে খেলাতে চাই। আমি বলেছি, টিমের প্রয়োজনে আমি যে কোনও জায়গায় খেলতে প্রস্তুত।
বাংলা ট্রিবিউন : মূল স্কোয়াডে সুযোগ পেলে ব্যাটিং অর্ডারের কোথায় খেলতে চাইবেন?
রকিবুল হাসান : জাতীয় দলে আমি মিডল অর্ডারেই ব্যাটিং করেছিলাম। ৩ থেকে শুরু করে ৭ নম্বর পর্যন্ত ব্যাটিং করেছি। আমার মাথায় থাকবে দলের চাহিদা। দল যেখানে আমার সার্ভিস চাইবে আমি সেখানেই দেবো।
বাংলা ট্রিবিউন : আপনার জন্য এটা নতুন শুরু কিনা?
রকিবুল হাসান : এতো বড় একটা ব্রেকের পর আবার যখন সুযোগ পেলাম, এটাকে আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের নতুন শুরু বলাই যায়। অবশ্য এভাবে ভাবা যেতেই পারে।
বাংলা ট্রিবিউন : সিডন্স আপনাকে খুব পছন্দ করতেন; তাকে আপনি কতটা মিস করেন?
রকিবুল হাসান : সিডন্স অনেক ভালো মানের একজন ব্যাটিং কোচ ছিলেন। আমাদের ব্যাটিংয়ে উন্নতির জন্য তার অনেক অবদান রয়েছে। বর্তমান দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটাররা সবাই সিডন্সের ব্যাটিং দীক্ষা নিয়েছেন। যার ফল এখন বাংলাদেশ পাচ্ছে। তাকে সব সময়ই মিস করি।
বাংলা ট্রিবিউন : চূড়ান্ত স্কোয়াডে নিজের নাম দেখার অপেক্ষায় নিশ্চয়ই আছেন। ২০ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে আপনাদের কন্ডিশনিং ক্যাম্প। এখানে আপনার পরিকল্পনা কী থাকবে?
রকিবুল হাসান : এখন আমার জন্য সহজ হয়ে গেছে পরিকল্পনা করা। যেহেতু প্রাথমিক স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছি। আমার লক্ষ্য এখন মূল স্কোয়াডে জায়গা করে নেওয়া। আমি জানি না, দলের চাওয়া-পাওয়া কী হবে। আমার পরিকল্পনা থাকবে আমার যে স্বক্ষমতা আছে। যা আমি জাতীয় দলের হয়ে সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পারিনি। এখন সুযোগ পেয়ে সেটা করতে চাই। আশা করি এবার যদি সুযোগ পাইতবে সেই আক্ষেপগুলো পূরণ করবো। আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যে অপূর্ণতা রয়ে গেছে সেগুলো আমার সেরা ক্রিকেট খেলে দূর করতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন : গত ৫ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়েছে অনেক। তরুণদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করছেন?
রকিবুল হাসান : আমি মনে করি আমার ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে দায়িত্ববোধের বিষয়টি। আমি দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করতে পারি। দলের প্রয়োজনে যা করার প্রয়োজন সেটুকু করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। আমার এই অভিজ্ঞতাটুকু আমি জাতীয় দলের হয়ে কাজে লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছি। বর্তমান দলে তরুণ অনেক ক্রিকেটার দারুণ খেলছে। তাদের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা ঘরোয়া ক্রিকেটে রয়েছে। আশা করি সুযোগ হলে এটা কোনও সমস্যাই হবে না।
বাংলা ট্রিবিউন : ২০০৮ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। এখন ফেরার অপেক্ষায় কেমন লাগছে?
রকিবুল হাসান : সত্যি কথা এটা অনেক আনন্দের। ভাবতেই খুব ভালো লাগছে। হয়তো পুরনো ড্রেসিংরুমটা শেয়ার করবার সুযোগ পাবো। তামিম-মুশফিক-সাকিব এরা সবাই আমার সঙ্গে ছিল। এদের সঙ্গে যখন আমার একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করা হবে-সত্যিই তখন বিষয়টি অনেক উপভোগ্য হবে।
/আরআই/এফআইআর/








