‘অদম্য’ মাশরাফির ১৫ বছর

রবিউল ইসলাম
০৮ নভেম্বর ২০১৬, ১০:১২আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৬, ১১:২৬

‘অদম্য’ মাশরাফির ১৫ বছর ৮ নভেম্বর ২০০১। বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্বর্ণালী এক সকাল। যে সকালে মাশরাফির মাথায় উঠেছিল টেস্ট ক্যাপ। লাল-সবুজের ক্রিকেট ইতিহাসে এই সময়টা সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ওই দিনটায় সাদা পোশাকটা প্রথমবারের মতো গায়ে জড়িয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামেন মাশরাফি। আজ তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ১৫ বছর পূরণ হয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১৫ বছর কাটিয়ে দিলেন মাশরাফি।

মাশরাফির আবির্ভাবটা হঠাৎ করে নয়। ২০০১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়া কাপ দিয়ে তিনি প্রথমবার জানান দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। কুয়েতের বিপক্ষে ২৭ বলে ৭৩ রানের একটি ইনিংস খেলে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন তখন।

ওই বছরের জুন-জুলাইয়ের দিকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্প চলছিল বিকেএসপিতে। সেই ক্যাম্পে অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন অ্যান্ডি রবার্টস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই বোলিং কোচ মাশরাফিকে করেছেন আরও ধারালো। তার ইতিবাচক মন্তব্যেই ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর টেস্টে অভিষেক হয় মাশরাফির।

১৫ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বল হাতে তিনি যেমন সফল, তেমনি সফল নেতৃত্বেও। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের উন্নতি। অন্য সবার জন্য তার জীবনের গল্পটাও দারুণ অনুপ্রেরণার। দুই হাঁটুতে সাত-সাতটি অস্ত্রোপচারও তাকে পারেনি দমাতে। অদম্য মানসিকতা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন বারবার, লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন সম্মানজনক এক উচ্চতায়।

অপ্রতিরোধ্য মাশরাফি সাদা পোশাকে অভিষেক হওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’কে। চট্টগ্রামে কিংবা পোর্ট অব স্পেন-ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম দুটি জয়েই ম্যাচসেরার পুরস্কার তার। শুরুতে শুধু বোলার হিসেবে পরিচয়টা সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তাকে অলরাউন্ডার বললেও ভুল হবে না। ৩৬ টেস্টে ৭৮ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি তিন হাফসেঞ্চুরিসহ ৭৯৭ রানও আছে তার নামের পাশে। আর ১৬৬ ওয়ানডেতে উইকেট পেয়েছেন ২১৬টি, আর রান ১,৪৯৫।

আক্রমণাত্মক ও গতিময় বোলিং দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকতেই তিনি নজর কেড়েছিলেন সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের, যিনি তখন ছিলেন দলটির অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্বে। রবার্টসের পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ ‘এ’ দলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় মাশরাফির। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক।

বৃষ্টির বাগড়ায় ম্যাচটি ড্র হলেও মাশরাফি অবশ্য অভিষেকেই তার জাত চিনিয়েছিলেন ১০৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো মাশিরাফির প্রথম শ্রেণির ম্যাচও ছিল এটি। ক্রিকেটের বিরল এই ঘটনার সাক্ষী হন তিনি ৩১তম খেলোয়াড় হিসেবে, যা ১৮৯৯ সালের পর তৃতীয়।

একই বছরের ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরানের সঙ্গে। অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮.২ ওভারে ২৬ রান দিয়ে নেন ২টি উইকেট। ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে দুই ফরম্যাটেই গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন মাশরাফির প্রথম শিকার।

নিজের তৃতীয় টেস্ট খেলার সময় তিনি আঘাত পান হাঁটুতে। তাতে প্রায় দুই বছর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয় তাকে। ফিরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর আবার আঘাত পান হাঁটুতে। এ যাত্রায় তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয় প্রায় বছরখানেক।

টেস্ট ক্রিকেটের মাশরাফি ২০০৬ সালে এক বর্ষপঞ্জিকায় মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারি বোলার। তিনি ওই বছর নিয়েছিলেন ৪৯ উইকেট। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যে আলো ছড়িয়েছিলেন মাশরাফি, তাতে নিষ্ঠুর চোট তার শত্রু হয়ে না দাঁড়ালে উইকেট সংখ্যায় অনন্য এক উচ্চতায় যে তিনি উঠতেন, সেটা বলাই যায়।

ক্যারিয়ারের চলার পথে আঘাত এসেছে অনেক। কষ্টের অথৈ সাগরে পড়লেও কখনও ডুবে যাননি, সাঁতার কেটে ঠিকই উঠেছেন তীরে। সব কষ্টকে জয় করে ফিরেছেন বীরের বেশে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কার কথা যদি বলা যায়, তাহলে সেটা ২০১১ সালের বিশ্বকাপ খেলতে না পারা। নিজেকে সেবার ধরে রাখতে পারেননি মাশরাফি। মনের দেয়াল ভেঙে কষ্টের চোরাস্রোত সামনে এসে বয়েছিল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামসংলগ্ন একাডেমি মাঠে। চোখের জলে অন্য এক মাশরাফি ধরা দিয়েছিল সেদিন। যে দৃশ্যটা এখনও ভুলতে পারেননি অনেক সাংবাদিক।

যদিও সেই কষ্ট কিছুটা হলেও কমেছিল চার বছর পর। তাঁর নেতৃত্বেই যে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শুধু কি যাওয়া, তার অধিনায়কত্বে দেখা মেলে অন্য এক বাংলাদেশের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন সাফল্য পায়নি কখনও। শুধু বিশ্বকাপে সাফল্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দেওয়াতেও তার ভূমিকা অনেক।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের মাশরাফি ওয়ানডে অধিনায়কত্ব তার পাওয়া বছর দুয়েক আগে ৩০ সেপ্টেম্বর। আর মিশন শুরু ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, ওই সিরিজেই মাশরাফির দলের স্বপ্নযাত্রার সূচনা। এর পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা এবং সেখানে ভারতের কাছে বিতর্কিত হার। দেশে ফিরে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তাকে টানা ওয়ানডে সিরিজে হারানোর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দূর্দান্ত ক্রিকেট খেলে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়।

মাশরাফির নেতুত্বে ছুটছেই বাংলাদেশের জয়রথ। যে রথের চালকের আসনে মাশরাফি। যার নেতৃত্বে উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সূর্য। সামনে মাশরাফির নেতৃত্বে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেবে বাংলাদেশ।

আগামী ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফর করবে টাইগাররা। বড় দল হয়ে উঠার প্রথম চ্যালেঞ্জটা শুরু এখানেই। মাশরাফি আছেন বলেই ক্রিকেট ভক্তদের স্বপ্ন-এই চ্যালেঞ্জটাও ঠিক উতরে যাবে বাংলাদেশ।

/কেআর/

সম্পর্কিত
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সিরিজে সমতা অস্ট্রেলিয়ার
১৫ বলে ফিফটি, পারভেজের রেকর্ডে ভাগ বসালেন হাবিবুর
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম