গেলো ওয়ানডে বিশ্বকাপে সৌম্য সরকারের কাছেই জাতীয় দলের জায়গা হারিয়েছিলেন এনামুল হক। পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ার কারণে নয়, আচমকা ইনজুরিতে দেশের বিমানে ফিরতে হয়েছিল তাকে। সব মিলিয়ে দুইজন একসঙ্গে তিনটি ম্যাচ খেললেও সবগুলোতেই তামিমের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে ছিলেন এনামুল, তিন নম্বরে খেলেছিলেন সৌম্য। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ইনজুরিতে মাঠের বাইরে ছিটকে যাওয়া এনামুলে ব্যাটিং করতে পারেনি। ওই সুযোগেই ওপেনিং ব্যাটসম্যান হয়ে যান সৌম্য। এবার একের পর এক ব্যর্থতায় ও এনামুলের সফলতায় একই পরিণতির শিকার হতে পারেন তিনি।
বিশ্বকাপে পাওয়া সুযোগটা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগান সৌম্য। নির্ভীক ব্যাটিং করে সবার আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হন তিনি। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১২৭ রান করার পর দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে ৮৮ ও ৯০ রানের দারুণ দুটি ইনিংস সৌম্যকে নতুন করে চেনায়।
কিন্তু গত এক বছর ধরে সৌম্যর পারফরম্যান্স বেশ হতাশাজনক, বিশেষ করে সীমিত ওভারে। এ বছর ১১ ওয়ানডে খেলে ৪০ ছাড়ানো রান করেন মাত্র দুই ম্যাচে- ৬১ ও অপরাজিত ৮৭ রান। ২০ ওভারের ক্রিকেট নিয়মিত রান করলেও সাত ম্যাচের একটিতেও নেই হাফসেঞ্চুরি। তাছাড়া এ বছর ৭ টেস্ট খেলা সৌম্য প্রথম চার টেস্টেই পেয়েছেন কেবল চারটি হাফসেঞ্চুরি। পরের তিন ম্যাচের ৬ ইনিংসে তার সর্বোচ্চ রান মাত্র ৩৩!
সর্বশেষ বিপিএলে চিটাগং ভাইকিংসের জার্সিতে বলার মতো কোনও পারফরম্যান্স নেই সৌম্যর। ১২ ম্যাচ কেবল খেলেননি একটি, ১৫ গড়ে ১৬৯ রান করে শেষ হয়েছে তার বিপিএল!
তবে কি সৌম্যর সময়টা শেষ হয়ে আসছে? হাথরুসিংহের ‘প্রিয়ভাজন’ ছিলেন, অনেকে এধরনের কানাঘুষা করলেও সামনে হয়তো আরও কিছু ম্যাচ সুযোগ পাবেন তিনি। তবে তার পারফরম্যান্স যেভাবে নিচের দিকে নামছে, তাতে কতদিন আর সেই সুযোগটা থাকছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে এনামুল যেভাবে নিয়মিত রান করছেন, সেটাই সৌম্যর জায়গাটা নড়বড়ে করে দেওয়ার সম্ভাবনা জাগাচ্ছে।
২০১৫ সালের নভেম্বরে শেষবার জাতীয় দলের জার্সি পরেছিলেন এনামুল। আর ডাক পাননি তিনি। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ খেলে যাচ্ছেন তিনি। গত কিছুদিন ধরে সৌম্যর পারফরম্যান্স ভালো নয়। তার ব্যর্থতার চেয়ে এনামুলের পারফরম্যান্স যে কথা বলছে বেশি। সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়া এনামুলকে তাই আবার তামিমের সঙ্গী হিসেবে দেখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিজের ফেরার লড়াইটা বেশ শক্ত হাতে করছেন এনামুল। ইনজুরি থেকে ফিরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত রান করে চলছেন তিনি। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও ১৬ ম্যাচে ৫৯৬ রান করে সেরা ছয়ে ছিলেন ওয়ানডেতে তিনটি সেঞ্চুরির মালিক। এছাড়া বিপিএলের পঞ্চম আসরে খুব একটা সুযোগ পাননি বিদেশিদের কারণে। বেশ কয়েকটি ম্যাচেই নিচের দিকে ব্যাটিং করতে হয়েছিল এনামুলকে। তারপরও চিটাগং ভাইকিংসের দেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রান তার। ৯ ম্যাচে ২৯.৪২ গড়ে দুই হাফসেঞ্চুরিতে ২০৬। চিটাগং ভাইকিংসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান করেছেন সিকান্দার রাজা (২৭৮)।
বিপিএল শুরুর আগেই দারুণ ফর্মে ছিলেন এনামুল। জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রথম রাউন্ডে ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির স্বাদ পান তিনি। ইনিংসের ৫১২ মিনিট এনামুল নিজের ধৈর্য্যের পরীক্ষা বেশ ভালোভাবেই দিয়েছেন রংপুরের বিপক্ষে। সব মিলিয়ে ৩৫৬ বলে ১৮ চার ও ২ ছক্কায় তিনি তার ২১৬ রানের ইনিংসটি সাজান।
বিপিএল শেষে আবারও সেই এনামুল। শুক্রবার ঢাকা বিভাগের বিপক্ষে ক্রিকেট লিগের এক মৌসুমে পঞ্চম ক্রিকেটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরির কৃতিত্ব দেখান এই ওপেনার। সাড়ে সাত ঘণ্টা ক্রিজে থেকে ২৩ চার ও ৪ ছক্কায় বিকেএসপিতে দ্যুতি ছড়ান তিনি। এই লিগ মৌসুমের সর্বোচ্চ রানের মালিক এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ৬ ম্যাচে দুই সেঞ্চুরি ও এক হাফসেঞ্চুরিতে এনামুলের রান ৬১৯। আগের মৌসুমেও দুই সেঞ্চুরিতে করেছিলেন ৪৬৬ রান।
জাতীয় লিগেও এনামুল-সৌম্য খুলনার হয়েই খেলছেন। তারা কেবল সতীর্থই নয়, একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্রিকেটে দীক্ষা নিয়েছেন। সবমিলিয়ে মাঠের ভেতর তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের মনোভাব থাকলেও মাঠের বাইরে তারা একে অপরের প্রিয় বন্ধু।
বুধবার ঢাকাকে অল্পরানে গুটিয়ে দিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল দুই বন্ধু। এনামুল ডাবল সেঞ্চুরি করলেও সৌম্য ছিলেন ব্যর্থ। লাঞ্চের ঠিক আগে দলীয় ৮৯ রানের সময় ৫৩ বলে ৩০ রানে আউট হন সৌম্য। কে জানে? সৌম্যর এই ব্যর্থতাগুলোই হয়তো জাতীয় দলে এনামুলের ফেরার দরজা খুলে দিচ্ছে। ঠিক যেমনটা ২০১৫ সালে এনামুল তৈরি করে দিয়েছিলেন সৌম্যকে।








