‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।’ তারা অবশ্য ‘শিশু’ নন, তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত তো বটেই। আগামী ১৩ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডে শুরু হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েই বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে ডানহাতি পেসার রনি হোসেনের কথা।
কৃষক বাবার সন্তান রনি হোসেন। অভাব অনটনকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তবু ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন মনে-প্রাণে লালন করে চলেছেন। ক্রিকেট নিয়ে মাঝে মাঝে বাবা মতিউর রহমান বিরক্তি প্রকাশ করলেও মা আছিয়া বেগম ছেলেকে সব সময় আগলে রাখেন। রনির পৃথিবীও মাকে ঘিরে। স্বপ্ন দেখেন, মায়ের মুখে একদিন হাসি ফোটাবেন। মায়ের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে বিশ্বমঞ্চ জয় করতে চান রনি।
বাবার চোখ এড়িয়ে রনির ক্রিকেটার হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন প্রিয় মা। তার মামার অবদানও কম নয়। ২০১২ সালের কথা। সে বছর মামা তরিকুল ইসলাম যশোরের এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দেন রনিকে। তবু বাধা দূর হয়নি। প্রতিদিন সাইকেলে প্রায় ২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে অনুশীলনে যেতে হতো তাকে। ২০১৩ সালে সাইকেল চুরি হওয়ার পর বন্ধ হতে বসেছিল রনির অনুশীলন। তবে এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টার তাকে হোস্টেলে রাখার ব্যবস্থা করলে দূর হয় সমস্যা।
এক সময় প্রতিবেশীরা রনির বাবাকে ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ক্রিকেট খেলে কী হবে?’ মায়ের কাছে এমন কথা শুনে ভীষণ মন খারাপ হতো রনির। মা-ই অবশ্য তাকে বোঝাতেন, ‘তুই খেলে যা। একদিন সবার কথার জবাব বল হাতেই দিবি!’ মায়ের কথাই আজ রনির জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
একান্ত সাক্ষাৎকারে রনি হোসেন
বাংলা ট্রিবিউন: বাবা আপনাকে ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে চাননি। নিশ্চয়ই কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আপনাকে?
রনি: আমার বাবা কৃষক। বাবা-মা দুজনই সাহায্য করতো। মা বেশি করতো। আর বাবার সঙ্গে অনেকে ঠাট্টা করতো। আমার মা তখন বলতো, তুই চেষ্টা কর, কপালে থাকলে ইনশাল্লাহ অনেক বড় ক্রিকেটার হবি। মা মানসিকভাবে আমাকে অনেক সাহায্য করতো। মা বলতো, কষ্ট করলে জীবনে সাফল্য আসবেই। যখন যেটা লাগতো, মা যেভাবে পেরেছে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। খুব কষ্ট হতো, তারপরও ব্যবস্থা করতো। আমিও বুঝতাম মায়ের কষ্ট।
বাংলা ট্রিবিউন: এমন কোনও স্মৃতি আছে যা ভোলার নয়?
রনি: যশোর একাডেমিতে থাকার সময় আমার সাইকেল চুরি হয়ে যায়। এরপর আমার অনুশীলন করাই বন্ধ হতে যাচ্ছিল। কারণ বাড়ি থেকে একাডেমিতে যাওয়া- আসার বাস ভাড়া ম্যানেজ করা খুব কঠিন ছিল আমার জন্য। শেষ পর্যন্ত একাডেমি তাদের হোস্টেলে রেখে আমার অনুশীলনের ব্যবস্থা করেছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ক্রিকেট-জীবনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জানতে চাই।
রনি: ২০১২ সালে এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে ভর্তির পর ২০১৩ সালে সুযোগ পাই যশোর অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেট দলে। সে বছর তেমন কিছু করতে পারিনি। পরের বছর সুযোগ পেয়ে যাই অনূর্ধ্ব-১৭ খুলনা বিভাগীয় ক্রিকেট দলে। সেখানে ভালো খেলে, জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলেও সুযোগ পাই। পর্যায়ক্রমে অনূর্ধ্ব-১৮ পেরিয়ে সুযোগ পাই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে ৫ উইকেট নেওয়ার পর সবাই খুব প্রশংসা করেছিল। ২০১৬ সালে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ভালো করেছিলাম। ওখানে চার ম্যাচে ১২ উইকেট পেয়ে সবার নজরে আসি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার পেসার হওয়ার কারণ কী?
রনি: এলাকার গলিতে যখন খেলতাম, বোলিং করতেই বেশি পছন্দ করতাম, স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। ২০১২ সালে একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর আমার বোলিং সেখানকার কোচদের পছন্দ হয়ে যায়। সেই থেকেই আমি পেসার। মাশরাফি ভাইকে ভালো লাগে, তার মতো পেসার হতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: মাশরাফিকে কেন ভালো লাগে?
রনি: মানুষ হিসেবে মাশরাফি ভাই অসাধারণ। মাঠের বাইরে তিনি যেমন ভালো মানুষ, তেমনি মাঠের ভেতরে দুর্দান্ত বোলার। তার মতো ভালো মানুষ হতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: সবাই জানে, নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন পেসারদের অনুকূলে। এ বিষয়ে আপনি কতটা রোমাঞ্চিত?
রনি: সিনিয়রদের কাছে শুনেছি, নিউজিল্যান্ডের উইকেট থেকে ভালো বাউন্স আর সুইং পাওয়া যায়। সেখানে পেসাররা ভালো সুবিধা পায়। আমাদের জন্য তাই দারুণ সুযোগ। আমরা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার প্রায় ১৫ দিন আগে যাচ্ছি। এই সময়ে আমরা উইকেট সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবো। আশা করি, মানিয়ে নিতে পারবো কন্ডিশনের সঙ্গে।
বাংলা ট্রিবিউন: কী স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বমঞ্চে যাচ্ছেন?
রনি: খেলার সুযোগ পেলে অবশ্যই ভালো করার চেষ্টা করবো। দেশকে কিছু দেওয়ার মাধ্যমে আমিও বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: নিজেকে নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
রনি: একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিশ্বাস ছিল, আমি পারবো। সেই বিশ্বাস ধীরে ধীরে দৃঢ় হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, মায়ের জন্য আমাকে পারতেই হবে। মাকে খুশি করাই আমার লক্ষ্য। মাকে অনেক কিছু উপহার দিতে চাই। আমার যখন অনেক টাকা হবে, তখন মাকে অনেক উপহার দিবো।
বাংলা ট্রিবিউন: মাশরাফি আপনার অনুপ্রেরণা। তার কাছ থেকে আপনি কী শিখেছেন?
রনি: নিউজিল্যান্ডে পেসাররা সুবিধা পায় ঠিকই, তবে কিছু কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখিও হয় তারা। এ বিষয়ে মাশরাফি ভাই পরামর্শ দিয়েছেন আমাদের। তিনি আমাদের বলেছেন, বাতাসের অনুকূলে বা প্রতিকূলে কীভাবে বল করতে হয়। তার পরামর্শ কাজে লাগাতে পারলে সাফল্য পাবো আশা করি।
প্রোফাইল
নাম: রনি হোসেন
ডাক নাম: রনি
জন্ম: ৭ অক্টোবর ২০০০
জন্মস্থান: যশোর
উচ্চতা: ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি
প্রথম ক্লাব: এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টার
বর্তমান ক্লাব: এসএস ক্রিকেট কোচিং সেন্টার
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি পেসার
প্রিয় মানুষ: মা
প্রিয় ক্রিকেটার: মাশরাফি মুর্তজা
ছবি-নাসিরুল ইসলাম








