‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।’ তারা অবশ্য ‘শিশু’ নন, তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত তো বটেই। আগামী ১৩ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডে শুরু হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েই বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রাকিবের কথা।
রাকিবের স্বপ্নের নায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। এক যুগ আগে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আশরাফুলের সেই মহাকাব্যিক ইনিংস গেঁথে যায় রাকিবের মনে। তখন অবশ্য ক্রিকেট বোঝার মতো বয়স হয়নি। পরে ইউটিউবে খেলা দেখে আশরাফুলের ব্যাটিংয়ের ভক্ত হয়ে যান তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের কনিষ্ঠতম সেঞ্চুরিয়ানের মতো ব্যাটসম্যান হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন রাকিব।
যদিও তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথে ছিল বিস্তর বাধা। ছোটবেলায় ঘুম থেকে উঠেই ছুটতেন অনুশীলনে। ঘণ্টা দুয়েক অনুশীলন করে যেতে হতো স্কুলে। ছুটির পর বড় ভাইয়ের ঘড়ির দোকানে বসতে হতো। কিন্তু একসঙ্গে এত কিছু আর নিতে পারছিলেন না তিনি। বিশেষ করে দোকানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেজন্য একদিন বড় ভাইয়ের কাছে মারও খেতে হয়েছিল! রাকিব ততদিনে বুঝে গেছেন, ক্রিকেট খেলার সৌভাগ্য তার কপালে নেই। একাডেমির বেতন ২০০ টাকা, অথচ মাসে মাসে এই টাকা দেওয়াই মুশকিল। একাডেমিতে জানিয়েও দেন, বেতন দিয়ে তার পক্ষে অনুশীলন করা সম্ভব নয়।
এমন দুঃসময়ে এগিয়ে এলেন রাকিবের ‘সুমন স্যার’। তিনি বললেন, ‘তোর বেতন লাগবে না। তুই শুধু অনুশীলনে আগে এসে নেটগুলো লাগিয়ে দিস, তাহলেই হবে।’ এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সব বাধা পেরিয়ে রাকিব এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, বিশ্বকাপে ভালো খেলার স্বপ্নে বিভোর।
রাকিবের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল পাড়ার এক টুর্নামেন্ট। সাত বছর আগের সেই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত হাফসেঞ্চুরির পর তাকে খুঁজতে শুরু করেন একজন কোচ। তিনিই রাকিবের বড় ভাইয়ের কাছে তাকে একাডেমিতে অনুশীলনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। সেই থেকে এগিয়ে চলা শুরু রাকিবের।
যাত্রাবাড়ী ক্রিকেট একাডেমিতে তার ক্রিকেট-জীবন শুরু। অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা ক্রিকেটে খেলেছিলেন ঢাকা মেট্রোর হয়ে। ওই টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে সুযোগ পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। ওই দলের হয়ে প্রায় ৩৫০ রান এসেছিল তার ব্যাট থেকে। এরপর অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। বয়সভিত্তিক দলে ভালো ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতায় রাকিব এখন বিশ্বকাপ খেলতে নিউজিল্যান্ডে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ রাকিব
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে কীভাবে এলেন?
রাকিব: বড় ভাইয়ের সঙ্গে ধুপখোলা মাঠে খেলতে যেতাম। একদিন ম্যাচ জেতানোর পর ভাইয়ের এক বন্ধু তাকে বলেছিল, ‘তোর ভাই তো ভালোই খেলে। কোথাও অনুশীলন করে নাকি?’ উত্তরে ‘না’ শোনার পর তার প্রস্তাব ছিল, ‘আমি যেখানে অনুশীলন করি, সেখানে তোর ভাইকে আনতে পারিস।’ ভাইয়া রাজি হয়ে যায়। ট্রায়ালে যাওয়ার পর কোচ আমাকে পছন্দ করেন।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বাবা নেই, ক্রিকেটার হওয়ার পথে অনেক বাধা এসেছে। নিজেকে নিয়ে আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী?
রাকিব: যাত্রাবাড়ীর সুমন স্যার আমাকে সবসময় বলতেন, ‘তোর মধ্যে ট্যালেন্ট আছে, তুই পারবি।’ তবে অনেকে উচ্চতা নিয়ে কিছু বললে টেনশনে পড়ে যেতাম। তারা বলতো, উচ্চতার কারণে ছয় কিংবা চার মারা যায় না। কিন্তু আমি ছয়ই বেশি মারি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ব্যাটিংয়ের ধরন কী?
রাকিব: ছোটবেলা থেকেই আমি শট খেলতে পছন্দ করি। যদিও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যাটিং কোচ জুয়েল স্যার আমাকে প্রায়ই বলতেন, ‘শুধু শট খেললেই হবে না, কীভাবে বল ছাড়তে হয় বা সিঙ্গেল নিতে হয় জানতে হবে।’ আমি খাটো লেন্থের বলও খেলতে পারি, তবে কম খেলি।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটা দেখছেন?
রাকিব: আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজ হেরে আমরা বেশ ধাক্কা খেয়েছিলাম। এখন অবশ্য আমাদের দলটা খুব ব্যালান্সড। আশা করি, আমরা সেরা চারে জায়গা করে নিতে পারবো।
প্রোফাইল
নাম: মোহাম্মদ রাকিব
ডাক নাম: রকি
বাবা: মোহাম্মদ তাবেদ আলী
মা: কুহিনুর বেগম
জন্ম: ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান: সোনারগাঁও
উচ্চতা: ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি
প্রথম ক্লাব: যাত্রাবাড়ী ক্রিকেট একাডেমি
বর্তমান ক্লাব: যাত্রাবাড়ী ক্রিকেট একাডেমি
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান
বোলিং স্টাইল: লেগস্পিনার
প্রিয় মানুষ: আমার মা
প্রিয় ক্রিকেটার: মোহাম্মদ আশরাফুল
প্রিয় বন্ধু: মারুফ, নাবিল ও শান্ত
ছবি-নাসিরুল ইসলাম








