‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ তারা অবশ্য ‘শিশু’ নন, তবে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তো বটেই। আগামী ১৩ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডে শুরু হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে বাঁহাতি স্পিনিং অলরাউন্ডার টিপু সুলতানের কথা।
কিছু দিন আগের কথা। জাতীয় ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে চার ম্যাচে ১০ উইকেট, বিশেষ করে ফাইনালে পাঁচ উইকেট নিয়ে সবাইকে চমকে দেন টিপু সুলতান। গত নভেম্বরে ওই টুর্নামেন্ট চলার সময় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রিয়জনদের প্রত্যাশা মিটিয়ে আজ তিনি বিশ্বকাপ খেলতে নিউজিল্যান্ডে।
পরিবারের সদস্যদের শর্ত ছিল, ক্রিকেটের পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যেতে হবে টিপুকে। তবে কেউ তাকে নিরুৎসাহিত করেনি। পরিবারের সবার ছোট টিপুকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন মা রহিমা বেগম। ছেলের বিশ্বকাপে যাওয়ার খবর শুনে খুশিতে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। মায়ের স্বপ্ন, সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটার হবে ছেলে। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের মতো টিপুও যে বাঁহাতি স্পিনিং অলরাউন্ডার!
২০১০ সালে ইয়াং টাইগার স্কুল ক্রিকেট দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু টিপুর। এরপর বয়সভিত্তিক, দ্বিতীয় বিভাগ আর প্রথম বিভাগ লিগে খেলে এখন তিনি বিশ্বকাপ দলে। টিপুর প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব। সাকিবের মতো আর্ম বল তার বোলিংয়ের অন্যতম ‘অস্ত্র’। ব্যাটিংয়ের হাতও ভালোই এই তরুণ অলরাউন্ডারের।
একান্ত সাক্ষাৎকারে টিপু সুলতান
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণ কীভাবে?
টিপু: ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলা দেখি। এলাকায় টেপ টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতাম। খেলতে খেলতেই ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা। পরিবারের সদস্যরাও খেলতে বারণ করেনি, তবে লেখাপড়া করার শর্ত দিয়েছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটা কেমন?
টিপু: ২০১০ সালে স্কুল ক্রিকেট খেলে সুযোগ পেয়ে যাই অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলে। ওই দলে টানা দুই বছর খেলি। পর্যায়ক্রমে অনূর্ধ্ব-১৬ আর অনূর্ধ্ব-১৮ দলেও খেলি। জেলার হয়ে ভালো খেলার পর সুযোগ পাই অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগীয় দলে। ওখানে তিন ম্যাচে ১৪ উইকেট পেয়েছিলাম। ২০১৫-২০১৬ মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে কাকরাইল বয়েজ ক্লাবের হয়ে প্রথম ম্যাচেই ৫ উইকেট পাই। ওই মৌসুমে দলকে শিরোপা এনে দিতে আমার ১৪ ম্যাচে রেকর্ড ৩১ উইকেট শিকার বড় ভূমিকা রেখেছিল। এটাই আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। পরের মৌসুমে একই ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে ১৬ ম্যাচ ৩৪ উইকেট পেয়েছিলাম। লিগে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের পুরস্কার নিয়েছিলাম বোর্ড সভাপতি স্যারের কাছ থেকে।
বাংলা ট্রিবিউন: অল্প কয়েকদিন ক্যাম্পে অনুশীলন করেই আজ আপনি বিশ্বকাপ দলে। হঠাৎ পাওয়া সুযোগটাকে কীভাবে দেখছেন?
টিপু: এটা আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার। এই সুযোগ কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে ভালো পারফর্ম করা আমার স্বপ্ন। আমি চাই মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে।
বাংলা ট্রিবিউন: যুব দলের হয়ে আপনার কোনও ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নেই। এটা আপনার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং?
টিপু: নতুন খেলোয়াড় হিসেবে মানিয়ে নেওয়া একটু কঠিন। কিন্তু আমাকে তেমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি, সবাই সাহায্য করছে। যুব দলের হয়ে না খেললেও আমি খেলার মধ্যেই ছিলাম। তাই এটাকে কোনও সমস্যা মনে করছি না।
বাংলা ট্রিবিউন: স্পিন বোলিংয়ের পাশাপাশি আপনি ব্যাটও করতে পারেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
টিপু: আমার মূল শক্তি স্পিন, তবে আমি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানও। যে কোনও পরিস্থিতিতে আমি দলকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। আশা করি, দলের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: সবাই জানে, নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন পেসারদের জন্য সহায়ক। স্পিনার হিসেবে তো আপনার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
টিপু: নিউজিল্যান্ডের পিচে পেসাররা বেশি সহায়তা পায়। তবে আমার বিশ্বাস, লাইন-লেন্থ ঠিক রেখে বোলিং করতে পারলে কোনও সমস্যা হবে না। দলে আমিই একমাত্র বিশেষজ্ঞ স্পিনার। সুযোগ পেলে অবশ্যই সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করবো।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রিয় ক্রিকেটার সম্পর্কে জানতে চাই।
টিপু: আমার প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। সব ফরম্যাটেই সাকিব ভাই সেরা পারফরমার। আমিও তার মতো বাঁহাতি স্পিনার এবং ব্যাটসম্যান। আমি সাকিব ভাইয়ের মতো বিশ্বজয় করতে চাই, বাংলাদেশ দলের সাফল্যে অবদান রাখতে চাই। এটাই আমার স্বপ্ন।
বাংলা ট্রিবিউন: মায়ের স্বপ্নও কী একই?
টিপু: হ্যাঁ, আমার মা বলে, ‘তোকে একদিন সাকিবের মতো বড় ক্রিকেটার হতে হবে।’ মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে খুব ভালো লাগবে।
প্রোফাইল
নাম: টিপু সুলতান
ডাক নাম: টিপু
বাবা: মরহুম আব্দুল কাদের
মা: রহিমা বেগম
জন্ম: ১৭ ডিসেম্বর ১৯৯৮
জন্মস্থান: যশোর
উচ্চতা: ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি
প্রথম ক্লাব: যশোর ক্রিকেট ক্লাব
বর্তমান ক্লাব: যশোর ক্রিকেট ক্লাব
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান
বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি স্পিনার
প্রিয় শট: কাভার ড্রাইভ
প্রিয় ডেলিভারি: আর্ম বল
প্রিয় মানুষ: মাশরাফি মুর্তজা
প্রিয় ক্রিকেটার: সাকিব আল হাসান
প্রিয় বন্ধু: নূর নবী সানি
ছবি-নাসিরুল ইসলাম








