‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’ তারা অবশ্য ‘শিশু’ নন, তবে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তো বটেই। আগামী ১৩ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ডে শুরু হবে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ আয়োজন। আজ থাকছে বাঁহাতি পেসার কাজী অনিক ইসলামের কথা।
বিপিএলে খেলা একজন তরুণ ক্রিকেটারের স্বপ্ন। আর যদি বিপিএলে অভিষেকেই বল হাতে কেউ জ্বলে ওঠেন, তাহলে তো কথাই নেই! অনিকও জ্বলে উঠেছিলেন, বাঁহাতি পেসে চার উইকেট নিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন চিটাগং ভাইকিংসকে। বিপিএলে অভিষেক ম্যাচেই রাজশাহী কিংসকে জয় এনে দেওয়া অনিক অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে এখন কিউইদের মাটিতে।
শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তি বাঁহাতি পেসার চামিন্দা ভাস তার ‘আইকন’। বাংলাদেশের প্রায় সব তরুণ পেসারের মতো অনিকের প্রিয় বোলারও মাশরাফি মুর্তজা। নিউজিল্যান্ড রওনা হওয়ার আগে তরুণ ক্রিকেটারদের বিশেষ ক্লাস নিয়েছিলেন মাশরাফি। ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’-এর পরামর্শ শুনে দারুণ অনুপ্রাণিত অনিক।
একান্ত সাক্ষাৎকারে কাজী অনিক ইসলাম
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন?
অনিক: ২০০৭ সালের কথা। একদিন আশরাফুল ভাইয়ের (সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুল) এক ভাতিজার সঙ্গে পল্লীমা ক্রিকেট একাডেমিতে গিয়েছিলাম। ওই একাডেমির প্রধান কোচ ওয়াহিদুল গনি স্যার তখন অনুশীলন করাচ্ছিলেন, আর আমি মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অনুশীলন দেখছিলাম। একটা বল আমার কাছে এলে আমি বলটি স্যারের দিকে থ্রো করি। তখন তিনি আমাকে ডেকে কয়েকটা বল করতে বলেন। আমার একটা বলে একজন ভালো ব্যাটসম্যান বোল্ড হয়ে যায়। স্যার তখন বলেন, ‘তুমি কাল থেকে অনুশীলনে আসবে।’ কথাটা শুনে তো আমি দারুণ উত্তেজিত! মনে হচ্ছিল, জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে গেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: বাবা-মার কাছ থেকে নাকি অনেক বাধা পেয়েছেন আপনি?
অনিক: বাসা থেকে অনুশীলনের জায়গা বেশ দূরে ছিল। তাই বাবা-মা চাইতেন না আমি ক্রিকেট খেলি। ক্রিকেটের জন্য অনেক বকা খেয়েছি, মার খেয়েছি। বাবা-মা সব সময় বলতেন, ‘পড়াশোনা করো, ক্রিকেট খেলে কী হবে? তুমি তো আর জাতীয় দলে খেলতে পারবে না!’ আমি বহুবার বাসায় ফাঁকি দিয়ে অনুশীলনে গিয়েছি। বাসায় ফেরার পর মার কাছে অনেক মার খেয়েছি, তবু ক্রিকেট ছাড়িনি। একসময় বাবা-মা বুঝতে পারেন, আমাকে ক্রিকেট থেকে দূরে রাখা যাবে না।
বাংলা ট্রিবিউন: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আপনার পারফরম্যান্স কেমন ছিল?
অনিক: ঢাকা মেট্রোর অনূর্ধ্ব-১৪ দলে আমার পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। তবে পরের বছর ওই দলে ভালো খেলে সুযোগ পাই অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। এরপরই বাবা-মা আমার ক্রিকেট খেলা মেনে নেন।
বাংলা ট্রিবিউন: বিপিএলে অভিষেকেই চার উইকেট শিকার করেছেন। বিশ্বকাপে এমন পারফরম্যান্স নিশ্চয়ই কাজে আসবে?
অনিক: বিপিএলে খেলে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। অভিষেকে চারটি বা তিন ম্যাচে ছয় উইকেট নেওয়ার চেয়েও বড় কথা, ড্রেসিংরুমে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। বিশ্বকাপে সেসব ভালোভাবে কাজে লাগাতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: একসময় ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললেও পরে বোলার হওয়ার কারণ কী?
অনিক: আমি ব্যাটসম্যান হিসেবেই প্রথম সুযোগ পেয়েছিলাম দলে। অনূর্ধ্ব-১৪ দলে ছিলাম অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। একদিন ঢাকা মেট্রোর ক্যাম্পে রতন স্যার (আব্দুল হাদি রতন) আমার বোলিং দেখে খুব পছন্দ করেন। উনি আমাকে বলেন, ‘তোমার বোলিং ভালো, তুমি ভালো বোলার হতে পারবে।’ মাশরাফি ভাই আর শ্রীলঙ্কার চামিন্দা ভাসের বোলিং দেখেও অনুপ্রাণিত হয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: মাশরাফি মুর্তজা প্রিয় বোলার কেন?
অনিক: মাশরাফি ভাইয়ের আক্রমণাত্মক মানসিকতা খুব ভালো লাগে। শুধু বোলার নয়, উনার মতো মানুষ হওয়াও কঠিন। উনি যেভাবে ছোট-বড় সবাইকে কাছে টেনে নেন, তা এক কথায় অসাধারণ। আমি সব সময় মাশরাফি ভাইয়ের মতো হতে চাই, মাঠে এবং মাঠের বাইরে।
বাংলা ট্রিবিউন: নিউজিল্যান্ড যাওয়ার আগে মাশরাফি আপনাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আপনি কতটা অনুপ্রাণিত?
অনিক: মাশরাফি ভাইয়ের কথা আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি। তিনি বারবার চাপমুক্ত হয়ে খেলতে বলেছেন আমাদের, আগের ম্যাচের পারফরম্যান্স ভুলে প্রত্যেক ম্যাচ নতুনভাবে দেখতে বলেছেন। তার প্রতিটি কথাই আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপের জন্য আপনাদের প্রস্তুতি কেমন?
অনিক: ঢাকায় আমাদের অনুশীলন ভালো হয়েছে। নিউজিল্যান্ডে এসে দুটি ম্যাচ হেরে গেলেও প্রস্তুতি ভালোই হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: নিউজিল্যান্ডের পেস সহায়ক কন্ডিশনে আপনার পরিকল্পনা কী?
অনিক: যেমন উইকেটই হোক, চেষ্টা করবো লাইন-লেন্থ ঠিক রেখে বোলিং করার। বিশ্বকাপে ভালো বোলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, বিশ্বমঞ্চে নিজেকে চেনাতে চাই।
প্রোফাইল
নাম: কাজী অনিক ইসলাম
ডাক নাম: অনিক
বাবা: কাজী বশিরুল ইসলাম
মা: কাজী রত্না ইসলাম
জন্ম: ১৮ জুন ১৯৯৯
জন্মস্থান: ঢাকা
উচ্চতা: ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি ব্যাটসম্যান
বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি পেসার
প্রিয় মানুষ: মাশরাফি ভাই
প্রিয় ক্রিকেটার: মাশরাফি, চামিন্দা ভাস ও ডেভিড ওয়ার্নার।
প্রিয় ফুটবলার: নেইমার
প্রিয় বন্ধু: আফিফ হোসেন ধ্রুব
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ভারতের সিএবি দলের বিপক্ষে এক ম্যাচে সেঞ্চুরির পাশাপাশি চার উইকেট নিয়েছিলাম
ছবি-নাসিরুল ইসলাম








