তার নাম নাজমুল হোসেন শান্ত, কথাবার্তায়ও তিনি ‘শান্ত’। তবে মাঠে তার ব্যাট বড্ড অশান্ত! প্রতিপক্ষ বোলারদের রীতিমতো শাসন করে সদ্য শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন এই তরুণ টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড লিটন দাসের, ৭৫২। গত মৌসুমে গড়া রেকর্ডটা এবার একটুর জন্য ভাঙতে পারেননি নাজমুল। আবাহনীর জার্সিতে চারটি সেঞ্চুরি সহ ৫৭.৬১ গড়ে তিনি করেছেন ৭৪৯ রান।
বাংলাদেশ যুব দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি রানের (১৮২০) রেকর্ড গড়া নাজমুল মাত্র একটাই আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন এ পর্যন্ত। গত বছরের জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চ টেস্টে ১৮ ও ১২ রান করার পর আর বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ হয়নি।
তবু তার প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত মাশরাফি মুর্তজা। টাইগারদের ওয়ানডে অধিনায়কের বিশ্বাস, নাজমুলের ভবিষ্যত দারুণ উজ্জ্বল, মিরাজের মতো তিনিও একদিন হয়ে উঠবেন জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। শুক্রবার বিকেলে মোবাইল ফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বর্তমান সাফল্য আর ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কথাই বললেন নাজমুল।
বাংলা ট্রিবিউন: এবারের লিগে এত রান করার পর আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
নাজমুল: কয়েক বছর ধরেই আমি রান করছি। এ বছর সাড়ে সাতশোর মতো রান করেছি। চারটি সেঞ্চুরি এবং দুটি হাফসেঞ্চুরি পেয়ে খুব ভালো লাগছে । আমার সব সময় পরিকল্পনা থাকে যেন পঞ্চাশের চেয়ে একশো বেশি হয়। এ কারণেই আমার ভালো লাগা একটু বেশি। তবে আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি এবারের লিগের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এই সাফল্যের রহস্য কী?
নাজমুল: রহস্য কিছু নেই, সবার সহযোগিতায় এত রান করতে পেরেছি। লিগের শুরুর দিকে যখন কম রানে আউট হয়ে ফিরতাম, মাশরাফি ভাই নানা কথা শোনাতেন। কখনও বকা দিতেন, কখনও বুঝিয়ে বলতেন। এটা আমাকে রানে ফিরতে সাহায্য করেছে। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপারও ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: কী সেটা?
নাজমুল: শুরুর দিকে কয়েকটা ম্যাচে সুজন স্যার (আবাহনীর কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন) ছিলেন না। দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোর নেটে ব্যাটিং করার দরকার নেই, তুই ম্যাচেই ব্যাটিং করবি!’ পরে উনার সঙ্গে কথা হয়েছে এ বিষয়ে। উনি আসলে রাগ করে এমন কথা বলেছেন, যেন আমি তেতে উঠে অনেক রান করি। এসব মিলিয়েই লিগে আমি রান করতে পেরেছি। চারটা সেঞ্চুরির তিনটাই বড় ইনিংস ছিল, আর এটা আমাকে দারুণ তৃপ্তি দিচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: কয়েকটি ম্যাচের শুরুতেই ফিরে গেছেন, দুটি ম্যাচে রানের খাতাও খুলতে পারেননি। সেজন্য এখন আফসোস হচ্ছে?
নাজমুল: আফসোস তো হবেই, আরও বেশি রান করতে পারতাম। তাহলে আমার রানটা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেত। তারপরও আমি সন্তুষ্ট যে ৩০-৪০ এর ঘরে খুব একটা আউট হইনি। আমি মনে করি, ৩০-৩৫ রানের চেয়ে শূন্য রানে আউট হওয়া ভালো।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি টপ অর্ডারে ব্যাটিং করেন, কিন্তু জাতীয় দলে এখন টপ অর্ডারে জায়গা পাওয়াই মুশকিল। এ নিয়ে কি আপনি হতাশ?
নাজমুল: না, হতাশ নই। আমার বিশ্বাস, পারফর্ম করলে দলে সুযোগ আসবেই। আমি শুধু চিন্তা করি আমার পজিশনে যারা খেলছে, তাদের চেয়ে আমাকে বেশি ভালো খেলতে হবে। আর ভালো করতে পারলে সুযোগ আসবেই আমার সামনে। অবশ্যই মাথায় চিন্তা থাকে, আমাকে জাতীয় দলে ঢুকতে হবে। কিন্তু কাজটা তো সহজ নয়। অন্যদের চেয়ে ভালো করলেই আমি হয়তো সুযোগ পাবো। এই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছি। ধারাবাহিকভাবে রান করতে পারলে জাতীয় দলে সুযোগ আসবেই।
বাংলা ট্রিবিউন: বৃহস্পতিবার আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মাশরাফি বলেছেন, ‘শান্ত লম্বা রেসের ঘোড়া। জাতীয় দলে আরও কিছুদিন পর সুযোগ পেলে তার আসল খেলা বের হয়ে আসবে।’ এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
নাজমুল: মাশরাফি ভাইয়ের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারের এমন মন্তব্য আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করবে, এটা আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি। উনার কথা মতো আরও কিছুদিন পর জাতীয় দলে সুযোগ পেলেই আমি ভালো করবো। অবশ্যই অভিজ্ঞতা থেকে এমন কথা বলেছেন তিনি। দুটো টুর্নামেন্টে তিনি খুব কাছ থেকে আমাকে দেখেছেন, আমি তার কথাকে শ্রদ্ধা করি। তবে এটা বলবো, নির্বাচকরা সুযোগ দিলে আমি যে কোনও সময় জাতীয় দলে খেলতে প্রস্তুত।
বাংলা ট্রিবিউন: ঘরোয়া ক্রিকেট আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে তো অনেক পার্থক্য।
নাজমুল: বিপিএল, জাতীয় লিগ, প্রিমিয়ার লিগ বা বিসিএল—সবখানেই আমার লক্ষ্য থাকে পারফর্ম করা। অবশ্যই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর ঘরোয়া ক্রিকেটের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। তবে আমার কাজ হলো পারফরম্যান্স দিয়ে নির্বাচকদের সন্তুষ্ট করা, আর আমি সেটাই করে যেতে চাই। আর কিছু নিয়ে ভাবতে চাই না।
বাংলা ট্রিবিউন: বয়সভিত্তিক দলে আপনার দীর্ঘদিনের সতীর্থ মিরাজ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব ফরম্যাটে খেলছে, অথচ আপনি একটা টেস্ট খেলেই জাতীয় দলের বাইরে। সেজন্য আফসোস হয় না?
নাজমুল: অবশ্যই খারাপ লাগে। মিরাজের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে খেলেছি, এখন সে জাতীয় দলে নিয়মিত খেলছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ক্রিকেটে আবেগের কোনও জায়গা নেই। আমার কাজ হলো যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আছে, তাদের চেয়ে ভালো পারফর্ম করা।








