১৯৯৯ বিশ্বকাপ জিতে বিশ্ব ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য বিস্তারের যে সূচনা, তা অব্যাহত ছিল প্রায় এক যুগ। তখন অস্ট্রেলিয়া মাঠে নামা মানেই অবধারিত জয়। হারতো খুব কম ম্যাচে, আর হেরে গেলেই বিস্ময়! অস্ট্রেলিয়ার উত্থানের বেশ আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পতন শুরু। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার সময় এ দুটো দলের মধ্যে ছিল বিস্তর ব্যবধান।
অথচ সেই পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকেই ভঙ্গুর ওয়েস্ট ইন্ডিজের আগে হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ! ২০০৫ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়া ‘বধ’ হলেও তখনও ক্যারিবিয়ানদের হারাতে পারেনি টাইগাররা। তখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে ১১বার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয়ে ৯বারই হারের তেতো স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ, বাকি দুটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয় বৃষ্টিতে।
ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয় বেশ দেরিতেই। সেই সাফল্যেও ‘কিন্তু’ আছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের ঠিক আগে বোর্ডের সঙ্গে বেতন-বোনাস নিয়ে ঝামেলা বেঁধে যায় স্বাগতিক ক্রিকেটারদের। সমস্যার আর সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত গেইল-সারওয়ান-চন্দরপলদের মতো সিনিয়রদের বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সারির দল ঘোষণা করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড। যে দলকে টেস্ট-ওয়ানডে দুই সিরিজেই হোয়াইটওয়াশ করতে সমস্যা হয়নি সাকিব-তামিমদের।
পূর্ণ শক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয় ২০১১ সালের অক্টোবরে, চট্টগ্রামে। সাকিবের দুর্দান্ত বোলিংয়ে (৪/১৬) ক্যারিবীয়দের মাত্র ৬১ রানে অলআউট করে টাইগাররা জিতেছিল ৮ উইকেটে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়মিত বিরতিতেই হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামের সেই ম্যাচের পর আজকে পর্যন্ত ১৬টি ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয়েছে দুদল। এই ১৬ ম্যাচের ৯টিতেই বাংলাদেশ বিজয়ী। আজকের জয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালও নিশ্চিত হলো মাশরাফির দলের।
আয়ারল্যান্ডের মাটিতে পা রাখার পর ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যান ক্রিকেটাররা। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলেছিল আবহাওয়া। ঢাকার তীব্র গরম থেকে ডাবলিনের প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সত্যিই কঠিন। আয়ারল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে হারের অন্যতম কারণ ছিল কন্ডিশন। আইরিশদের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে ২১৯ রানে গুটিয়ে যাওয়া যে নেহাতই ‘অ্যাকসিডেন্ট’, তা বুঝতে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই!
প্রস্তুতি ম্যাচের অভিজ্ঞতা যেমনই হোক, আসল লড়াই শুরু হতেই ‘আসল’ চেহারায় বাংলাদেশ। ৭ মে প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছে হেসেখেলে, ৮ উইকেটে। সেদিন টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ক্যারিবীয়রা এগিয়ে যাচ্ছিল বড় সংগ্রহের দিকে। ৪১তম ওভারে স্কোর ২ উইকেটে ২০৫, রানটা তিন শ’র ওপরে যায় কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় টাইগার ভক্তরা। ঠিক তখনই ‘মাশরাফি ম্যাজিক’। টানা দুই ওভারে রোস্টন চেজ আর সেঞ্চুরিয়ান শাই হোপকে ফিরিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়কই পথে ফিরিয়েছেন দলকে। এরপর সাকিব-মিরাজের ঘূর্ণিতে প্রতিপক্ষকে ২৬১ রানে বেঁধে ফেলেছে মাশরাফির দল। তামিম-সৌম্য-সাকিবের তিন ফিফটিতে জয় এসেছে সহজেই, ৩০ বল হাতে রেখে।
সেদিনের চেয়ে আজকের টার্গেট ১৪ রান কম। লক্ষ্যটা আড়াই শ’র কম হওয়ার পেছনে বড় অবদান মাশরাফি-মোস্তাফিজের। মাশরাফির শিকার তিন উইকেট, আর মোস্তাফিজের চারটি। তবে একটি করে উইকেট পেলেও সাকিব ও মিরাজের নিয়ন্ত্রিত বোলিং টার্গেট বড় হতে দেয়নি। ২৪৮ রানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ৫ উইকেটে, নিশ্চিত করেছে ফাইনাল।
আগামী শুক্রবার ফাইনালে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজই মাশরাফি-তামিমদের প্রতিপক্ষ। দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে জিততে পারেনি টাইগাররা। গত বছর নিদাহাস ট্রফি আর এশিয়া কাপে হারের ক্ষত তো এখনও টাটকা। এবার সামনে দারুণ সুযোগ। লিগ পর্বে দুই জয়ের অনুপ্রেরণায় ফাইনালেও সাফল্য অর্জন সম্ভব। ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে এখন আর কঠিন প্রতিপক্ষ নয়!








