তিনি পেসার। কিন্তু তার প্রিয় খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি ও মুশফিকুর রহিম। দুই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের পরিশ্রম ও ক্রিকেট এথিকসে মুগ্ধ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের পেস বোলিং অলরাউন্ডার তানজিম হাসান সাকিব। তাদের মতো পরিশ্রম করে জাতীয় দলে দীর্ঘদিন খেলার স্বপ্ন দেখেন। তবে আপাতত সিলেটের ছেলেটির ভাবনায় শুধু যুব বিশ্বকাপ।
৪ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। মা-বাবার একমাত্র ছেলে বলে বেশি আদুরে। বোনদেরও নয়নের মণি। জাতীয় দলের হয়ে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা জাকির হাসান দূরসম্পর্কের আত্মীয়। ওই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানকে বিকেএসপিতে ভর্তি হতে দেখে সাকিবও স্বপ্ন দেখেন ওখানে ভর্তি হওয়ার।
ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় মহল্লায় টেপ টেনিস দিয়ে ক্রিকেটে হাতে খড়ি। ক্রিকেট বলে খেলা শুরু যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। মা সেলিনা পারভিনের আবেগ কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামে এক মাসের ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। ক্যাম্প কমান্ড্যান্ট কোচ মোহাম্মদ কায়সার আহমেদ সাকিবের ব্যবসায়ী বাবা গৌউস আলীকে বোঝান। বাবা তাতে প্রভাবিত হওয়াতেই ক্রিকেটার হতে পেরেছেন। প্রথমবার ট্রায়াল মিস করে দুই বছর পর ২০১৭ সালে ভর্তি হন বিকেএসপিতে।
লক্ষ্য মুশফিকের মতো পরিশ্রমী ক্রিকেটার হওয়া। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৮ জানুয়ারি থেকে শুরু অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সেরা ৫ বোলারের একজন হতে চান তিনি। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দলে ভূমিকা রাখতে চান। ৭-৮ নম্বরে নেমে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি দলের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বল হাতে ব্রেক থ্রু এনে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই ৩ জানুয়ারি বিশ্বকাপযাত্রা শুরু করছেন সাকিব।
আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে আজ থেকে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ বৃহস্পতিবার থাকছে পেস বোলিং অলরাউন্ডার তানজিম হাসান সাকিবের একান্ত সাক্ষাৎকার -
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে এলেন কীভাবে?
তানজিম হাসান : ক্লাস ওয়ানে থাকা অবস্থায় ক্রিকেটের সঙ্গে আমার পরিচয়। মহল্লায় বড়দের সঙ্গে টেপ টেনিস দিয়ে শুরু। স্থানীয় মাঠে এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে মজা করে ক্রিকেট খেলতাম। এরপর ক্লাস ফাইভে থাকতে আমাদের এক আত্মীয় জাকির হাসান বিকেএসপিতে ভর্তি হন। তখন থেকে আমারও বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন। আমি ভাবতাম বিকেএসপিতে গেলেই শুধু ক্রিকেট খেলা যায়। ক্লাস সিক্সে ওঠার পর থেকেই বিকেএসপিতে ভর্তির ট্রায়ালের খোঁজখবর রাখতাম। কিন্তু একবার মিস হয়ে যায়। অবশেষে ক্লাস নাইনে উঠে বিকেএসপিতে ভর্তি হই।
বাংলা ট্রিবিউন: বিকেএসপিতে ভর্তি হতে পরিবারের সহযোগিতা কেমন পেয়েছেন?
সাকিব: বাবা-মাকে অনেক বোঝাতে হয়েছে। পরিবারের সবাই শুধু পড়াশোনা করতে বলতো। কেউই চাইতো না আমি ক্রিকেট নিয়ে থাকি। ২০১৫ সালের দিকে আমি যখন এক মাসের জন্য চট্টগ্রামে ক্যাম্প করতে যাই, মা আমাকে যেতেই দিচ্ছিলেন না। আব্বু বিদেশে ছিলেন, তখন আম্মুকে ইমোশনালি ব্লাকমেইল করে ক্যাম্পে যাই। ক্যাম্পের শেষ দিকে আব্বু দেশে ফিরে আমাকে আনতে চট্টগ্রামে আসেন। কোচ কায়সার স্যারের (কায়সার আহমেদ) সঙ্গে আব্বুর কথা হয়। স্যারের কথায় আব্বু ইমপ্রেসড হ্ওয়াতেই আর সমস্যা হয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: আগামীকালই বিশ্বকাপ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন, এখন বাবা-মা কী বলেন?
সাকিব: এখন তো সবসময়ই তারা আমাকে উৎসাহিত করেন। প্রায় দিনেই দেখি আব্বা-আম্মা ইউটিউবে আমার ম্যাচের ভিডিও দেখেন। আরও অনুপ্রাণিত হই। আমি তিন বোনের একমাত্র ভাই বলে বোনদেরও অনেক আদর পাই। কখনও খারাপ সময় গেলে বড় দুই বোন উৎসাহ দেয়।
বাংলা ট্রিবিউন: সাকিব আল হাসানের নাম দেখেই কি আপনার ডাক নাম সাকিব রাখা হয়েছে?
সাকিব: আমাকে ক্রিকেটার বানাবে এমন চিন্তা মা-বাবার ছিলো না। এটা কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপের জন্য পুরো দলের প্রস্তুতি কেমন?
সাকিব: প্রস্তুতি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। গত দুই বছর আমরা দারুণ প্রস্তুতি নিয়েছি। অনেকগুলো সিরিজ খেলেছি, সিরিজগুলোতে ফলাফল ভালো হয়েছে। অনেক ম্যাচ খেলার কারণে অনেক আত্মবিশ্বাসী আমরা। অনেক ম্যাচ খেলার কারণে নার্ভাসনেসও কেটে গেছে। সব মিলিয়ে প্রস্তুতি অনেক ভালো।
দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে আমরা দুটি সাইড ম্যাচ ও দুটি ওয়ার্মআপ ম্যাচ খেলবো। আশা করি এই চারটি ম্যাচ আমাদের কন্ডিশন সম্পর্কে ভালো ধারণা দেবে এবং সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী সব কিছু করতে পারবো।আমরা সবাই আত্মবিশ্ব্সী যে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: দক্ষিণ আফ্রিকায় বোলিং করার জন্য আপনি নিজে কতটা প্রস্তুত?
সাকিব: গতির চেয়ে লাইন এবং লেন্থের ওপরই জোর দিয়েছি আমি। শেষ দুটি সিরিজে এ কারণেই আমি উইকেট পেয়েছি। যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো উইকেট পাবো, বাতাসও থাকবে, আমি যদি উইকেটের সুবিধা নিতে পারি, মনে হয় ওখানে সফল হতে পারবো্।
বাংলা ট্রিবিউন: ভাবতে কেমন লাগছে যে পেস বোলিংয়ের স্বর্গ দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটে বোলিং করবেন?
সাকিব: এর আগে ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডে বোলিং করেছি। ওখানকার মতোই দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেট। বাংলাদেশের উইকেটে অনেক সময় গুড লেন্থের বলও চার হয়ে যায়। যতটা বুঝতে পারছি, ওখানে দশ ওভারের পর বল সুইং করে। অতিরিক্ত বাউন্সও পাওয়া যায়। গ্রিপ আদায় করা যায়। আশা করি বাতাস ও উইকেটের সুবিধা কাজে লাগাতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও তো আপনার কিছু দেওয়ার আছে?
সাকিব: আমি ব্যাটিংয়েও প্রস্তুতি নিয়েছি। যদি কোনো অঘটন না ঘটে আমাকে হয়তো ব্যাটই করতে হবে না! ৪০ ওভারের পর বোলাররা সাধারণত ইয়র্কার, স্লোয়ার দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি ইয়র্কার ও স্লোয়ারের বিপক্ষে নেটে অনুশীলন করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রস্তুতি পর্বে সিনিয়র কারোর পরামর্শ কি পেয়েছেন?
সাকিব: হ্যাঁ, রাহী ভাইয়ের(আবু জায়েদ) সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে রিভার্স সুইং নিয়ে।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপে আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কি?
সাকিব: ভালো করতে চাই। সেরা ৫ বোলারের একজন হতে চাই। আরেকটা ব্যাপার, শুরুতেই যেন ব্রেক-থ্রু এনে দিতে পারি।
প্রোফাইল
নাম: তানজিম হাসান
ডাক নাম: সাকিব
জন্ম: ২০ অক্টোবর ২০০২
জন্মস্থান: সিলেট (সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তিলকচানপুর গ্রাম)
উচ্চতা: ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি
লেখাপড়া: এইচএসসি প্রথম বর্ষ
প্রথম ক্লাব: বিকেএসপি
বর্তমান ক্লাব: বিকেএসপি
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি
প্রিয় ডেলিভারি: আউটসুইং
প্রিয় মানুষ: বাবা
প্রিয় ক্রিকেটার: ধোনি ও মুশফিক
প্রিয় বন্ধু: নাসিম আহমেদ সোহাগ
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে ৪ উইকেট পাওয়া।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন








