ক্রিস গেইল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সবচেয়ে বিজ্ঞাপন। কুড়ি ওভারের এই ক্রিকেটটা অন্য সবার চেয়ে বেশি আগ্রাসী মনোভাব নিয়েই ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যানই খেলে থাকেন। অনেকেই তাই তাকে বলেন ‘ব্যাটিং দানব’, তার নিজের কাছে তিনি ‘ইউনিভার্স বস’।
ক্রিস গেইল মনে করেন তার পরে আর কোনও ‘ইউনিভার্স বস’ আসবে না এ ধরায়। বৃহস্পতিবার মিরপুরের একাডেমিতে আরও নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন জ্যামাইকান ওপেনার। এরই চুম্বক অংশ বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:-
প্রশ্ন: টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক খেলোয়াড় ভালো করছে, নতুন কাউকে কি আপনার চোখে অন্যরকম লেগেছে?
ক্রিস গেইল: অনেক নতুন খেলোয়াড় উঠে এসেছে। শুধু একজনকে খুঁজে বের করা কঠিন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আপনি সবসময় দেখবেন যে নতুন প্রজন্মে কেউ না কেউ বেরিয়ে আসে। তবে তাদের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জৌলুসটা এবং নিজেদের নামটা ধরে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে এবং এভাবেই তারা মহাতারকা হয়ে উঠবে।
প্রশ্ন: আপনার মতো কাউকে কি আর পাওয়া যাবে?
ক্রিস গেইল: আর কোনও ক্রিস গেইল কিংবা ইউনিভার্স বস আসবে না। ইউনিভার্স বস সবসময়ই একজন থাকবে এবং আমার মতো কেউ হবে না। নিজের স্বকীয়তার জন্য আপনাকে অবশ্যই বিশ্বব্যাপী ঘুরতে হবে, নিজের নামটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সব ধরনের কন্ডিশনে পারফর্ম করতে হবে এবং আমি নিজের ক্ষেত্রে সেটাই কিছুটা হলেও ভালোভাবে করতে পেরেছি। আমার আর কিছুই প্রমাণ করার নেই এবং আপনারা জানেন যে ক্রিকেট ক্যারিয়ারে আমি কোন জায়গায় আছি। সুতরাং তারা (নতুনরা) কীভাবে এগোচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখুন। তাদের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের জন্য তেমন সুযোগ পায় না।
প্রশ্ন: এই বয়সেও ক্রিকেট কতটা উপভোগ করেন?
ক্রিস গেইল: উপভোগ করছি। তবে আমি কিছুটা স্লো হয়ে গেছি। ইতিমধ্যেই ২০ বছর হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছি। আরও কিছুদিন ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। তবে এখন হয়তো সব টুর্নামেন্টে সব ম্যাচ খেলবো তেমন নয়। তবে কীভাবে খেলবো আপনারা দেখতে থাকুন।
প্রশ্ন: আর কত দিন ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে?
ক্রিস গেইল: অনেক মানুষই চায় এখনও ক্রিস গেইলকে মাঠে দেখতে। আমার নিজেরও খেলাটার প্রতি যথেষ্ট ভালবাসা ও আসক্তি আছে। যতদিন সম্ভব আমি টি-টোয়েন্টি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট চালিয়ে যেতে চাই। আমি এখনও এখানে এবং সারাবিশ্বেই কিছু ম্যাচ খেলি। কারণ এখন পর্যন্ত আমি অনুভব করি এখনও আমার অনেক কিছু দেওয়ার আছে। শরীরটাকেও বেশ ভালো বোধ হচ্ছে এবং আমি নিশ্চিত, যতই দিন যাচ্ছে আরও তরুণ হচ্ছি। ৪৫ খুব ভালো একটি সংখ্যা। আমি ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত খেলতে চাই।
প্রশ্ন: এবার চট্টগ্রামের হয়ে খেলতে এলেন, কেমন লাগছে?
ক্রিস গেইল: এখন পর্যন্ত আমি মাত্র একটি ম্যাচ খেলেছি। দেরিতে টুর্নামেন্টে যোগ দিয়েছি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কিছু দায়বদ্ধতার কারণে। এখানে এবার নতুন কিছু সতীর্থ পেয়েছি যাদের অধিকাংশের বিপক্ষে কিংবা সঙ্গে আগে খেলেছি। কিন্তু এখন আমরা সতীর্থ। দল খুব ভালো করছে। এমন অবস্থানে থাকতে পারাটা সত্যিই খুব ভালো ব্যাপার। এখন যত দ্রুত মানিয়ে নিয়ে ভালোভাবে প্রস্তুত হতে হবে। ছেলেরা চমৎকার খেলছে এবং আমরা এখন টেবিলের শীর্ষে আছি। দ্বিতীয় ম্যাচে সুযোগ পেলে প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করবো।
প্রশ্ন: চারদিনের টেস্ট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আপনি কি মনে করেন চারদিনের টেস্ট হওয়া উচিত?
ক্রিস গেইল: আমি এতে আগ্রহী নই। আমি ১০০ টেস্ট খেলেছি। যার মধ্যে কিছু তিন দিনে, কিছু চার দিনে শেষ হয়েছে। তারপরও আমি বলবো পাঁচদিনের টেস্টই হচ্ছে মৌলিক এবং চারদিনের টেস্ট হলে আমি সেটার প্রতি তেমন আগ্রহী হবো না। একটা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এমনটা চলছে। বুঝতে পারছি না , কেন টেস্ট নিয়ে এমন জটিলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আপনার মূল্যায়ণ কী?
ক্রিস গেইল: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তারা এখন আমাদের চেয়ে ভালো করছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট উত্থান-পতনের মধ্যে এগোচ্ছে এবং আমাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে। ভালো ক্রিকেটারদের একই ছাতার নিচে এনে কয়েক বছরব্যাপী কিছু পরিকল্পনা করতে হবে। এভাবেই আসলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। গত বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড যেভাবে সাফল্য পেয়েছে, ঠিক সেভাবে। তাদের একটি চার বছরমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতল। সত্যি কথা বলতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করতে হবে যাতে ভালো একটি দল গড়া যায়।
প্রশ্ন: বিপিএলের সব মৌসুমেই আপনি খেলেছেন। এখানে ‘পোস্টারবয়ে’র তকমা পাওয়াটা কতখানি উপভোগ করেন?
ক্রিস গেইল: সমর্থকদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া সত্যিই ভালো খেলতে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগায় । মাঠে তারা বিনোদন চায়। এটা মাঝে মাঝে খেলোয়াড় হিসেবে আপনাকে বাড়তি অনুপ্রেরণা দেয়। আর খেলোয়াড় হিসেবে আমার খেলাটাও এমন ধরনের। আমার জন্য এটা এক ধরনের কাজের মতো, যেখানে আমি যতটা পারি বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে খেলছি এবং চমৎকার সময় কাটে এখানে।
প্রশ্ন: ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার চিন্তা করছেন?
ক্রিস গেইল: এটা দারুণ হবে। সুযোগটা নেওয়ার জন্য দুয়ার খোলাই আছে। দেখা যাক কী হয়! আমাদের কিছু উজ্জ্বল তরুণ তারকাও আছে। নিজের ক্ষেত্রে আমি আমার পরিবারের কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আছি। দেখা যাক ইউনিভার্স বস কোথায় কীভাবে এগিয়ে যায়!
প্রশ্ন: ক্রিকেট পরবর্তী জীবন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
ক্রিস গেইল: জীবন সবসময়ই আমার শুরুর ভাবনাতে ছিলো। আমি এটা উপভোগ করি এবং কখনওই জীবনের সঙ্গে ক্রিকেটকে মিলিয়ে ফেলিনি। পৃথিবীর যেখানেই আমি যাই না কেন, উপভোগ করার চেষ্টা করি। কারণ গত ২০ বছরের অধিকাংশ সময় আমি ঘরের বাইরে ছিলাম। নতুন নতুন মানুষ আর খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে এবং সেটা আসলে নতুন পারিবারিক বন্ধন তৈরি করেছে। তাই নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়েছে। খুবই চমৎকার জীবন কাটছে আমার। এটা সম্ভব হয়েছে আমি কখনও ক্রিকেটকে জীবনের সঙ্গে মেশাইনি।
প্রশ্ন: জীবনকে এভাবে উপভোগের রহস্য কী?
ক্রিস গেইল: আমার বইয়ে আমি যেটা লিখেছি, অস্ট্রেলিয়ায় আমার হার্ট সার্জারি হয়েছিল এবং সেটাই আমার জীবনের প্রথম সার্জারি। যখন আমার জ্ঞান ফিরল, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায় সেটাই করবো, কখনোই পেছনে তাকাবো না। তখন থেকে নানাবিধ কর্মকাণ্ডে এবং চারপাশে কী ঘটছে তা নিয়ে আমার কোনও সমস্যা হয়নি। আমি সবসময়ই চেষ্টায় থাকি সর্বোচ্চটা উপভোগ করার। যার ফলে দীর্ঘদিন ভালো সময়ের মধ্যে থাকতে পারছি।
প্রশ্ন: অবসরের পর কি কোচিংয়ে আসবেন?
ক্রিস গেইল: সত্যি বলতে এমন কোনও পরিকল্পনা আমার নেই। কোচিংয়ের দায়িত্ব আমার কোনও পরিকল্পনাতেই নেই। কিন্তু কখন কী ঘটবে, সেটা তো আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।








