মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জিতেছিল বাংলাদেশ, পেয়েছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ। আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন, আমিনুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, খালেদ মাসুদ, নাঈমুর রহমান, মোহাম্মদ রফিক, সাইফুল ইসলাম, হাসিবুল হোসেন শান্ত- দারুণ সব খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটির ম্যানেজার ছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। আজ (সোমবার) সোনালী ট্রফি জয়ের ২৩ বছর পূর্তিতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলার সময় গৌরবময় সেই স্মৃতিতে ডুব মারলেন লিপু।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্রীড়াপ্রেমের কথা কারোই অজানা নয়। বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি তার ভালোবাসা অনেক পুরোনো। ১৯৯৭ সালে ট্রফি জয়ের পরদিনই বিশেষ ফ্লাইটে পুরো দলকে দেশে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিনটি যেন দেশের মানুষের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন ক্রিকেটাররা, এই চিন্তা থেকেই দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ক্রিকেটারদের দেশে ফিরিয়ে আনেন। অথচ অর্থনৈতিক জায়গায় তখনও লড়াই করছিল বাংলাদেশ।
সেইসব কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন আইসিসি ট্রফিজয়ী দলের ম্যানেজার লিপু, ‘সবচেয়ে চমকপ্রদ খবরটি ছিল, দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য চার্টার্ড বিমান পাঠিয়েছিলেন। এই মুহূর্তটা সত্যিই গর্বের। পহেলা বৈশাখ দেশের সবার সঙ্গে করার আনন্দ অন্য কিছুতে হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী সেই সুযোগটা আমাদের করে দিয়েছিলেন। তখনকার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিকভাবে আমরা তেমন সমৃদ্ধ ছিলাম না। তার মধ্যে ক্রিকেট ততটা জনপ্রিয় খেলাও ছিল না। তারপরও প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য এতটা করেছিলেন।’
শুধু তা-ই নয় এখনকার মতো তখনও প্রধানমন্ত্রী ফোনে ক্রিকেটারদের খোঁজখবর নিতেন। ১৯৯৭ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ ছিল। ওই সময় দেশ থেকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যেটির বর্ণনা দিলেন লিপু এভাবে, ‘এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেকখানি এগিয়ে গেছে। আমাদের অনেক অর্জন আছে। এখনও প্রধানমন্ত্রী যেভাবে খবর নিচ্ছেন, তখনও তিনি নিতেন। আইসিসি ট্রফিতে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে খেলা হচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে সফরে ছিলেন। বৃষ্টিতে খেলাটা যখন বন্ধ হয়ে গেল, উনি ফোন করলেন। আকরাম খান, আমি ও গর্ডন গ্রিনিস (বাংলাদেশের কোচ) ছিলাম। আকরামের সঙ্গে কথা বললেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি আছে, খেলা হলে আমাদের সুযোগ কতখানি আছে, এই ম্যাচটি কোনও কারণে বাতিল হলে আমাদের কোনও লাভ আছে কিনা। এসব সত্যিই দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক।’
কুয়ালালামপুরে ১২ এপ্রিল ম্যাচটি শুরু হলেও নিষ্পত্তি হয় ১৩ এপ্রিল। আগের দিন বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশের ইনিংস শুরু হয়নি। টানা বৃষ্টির কারণে টেনশনে ছিল পুরো দল। লিপু জানালেন সেই গল্প, ‘আমরা নিশ্চিত ছিলাম, যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছিল ম্যাচটি কার্টেল ওভার হতে যাচ্ছে। তাই কিছুটা টেনশন ছিল। আমরা তখনও খুব বেশি একটা কার্টেল ওভার খেলিনি। ব্যাটিং অর্ডার কেমন হবে, কিভাবে সাজানো- সব মিলিয়ে কিছুটা দুচিন্তা ছিল।’
১২ এপ্রিল নির্ভার থাকলেও সকালে মাঠে গিয়ে দুচিন্তা গ্রাস করে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। লিপু বলে গেলেন, “সারারাত রিলাক্সেই ছিলাম। তবে মাঠে গিয়ে মন খারাপ হয়। মাঠ বৃষ্টির কারণে খারাপ হয়ে গিয়েছিল। হেলিকপ্টার এনে শুকানোর চেষ্টা করা হলো। মাঠ ভর্তি আমাদের দর্শক ছিল। মালয়েশিয়া প্রবাসীদের ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে অনেক দর্শক খেলা দেখতে এসেছিল। এছাড়া সাবের হোসেন চৌধুরী, আ হ ম মুস্তাফা কামালসহ বোর্ডের কর্মকর্তা অনেকেই ছিলেন। এমন অসংখ্য মানুষ মাঠে ছিলেন। তখন তো ডেসিংরুম খোলা জায়গাতে, গ্যালারি থেকে সবাই বলছিল, ‘ভাই ম্যাচ জিততে হবে।’ ওসব কথায় চাপ কিছুটা বেড়েছিল।”
কার্টেল ওভারে ১৬৬ রানের লক্ষ্য পেয়ে ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন করে বাংলাদেশ। আতাহর আলীর পরিবর্তে ওপেনিংয়ে নামানো হয় নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে। মোহাম্মদ রফিককে খেলানো হয় ওপরে। কেন, সেই ব্যাখ্যা দিলেন লিপু, ‘ব্যাটিং অর্ডার কিছুটা পরিবর্তন করেছিলাম। আতহার আলীর জায়গা দুর্জয়কে পাঠানো হয়েছিল। এরপর রফিক গিয়েছিল। যেহেতু আর্টিফেশিয়াল উইকেট ছিল, বল কিছুটা থেমে আসতো। আমরা হার্ডহিটার ব্যাটসম্যানদের ওপরে খেলানোর চিন্তা করেছিলাম।’
শেষ ওভারে দরকার ১১ রান, তখনকার সময়ে অবিশ্বাস্য লক্ষ্য হলেও দলের ওপর আস্থা ছিল সাবেক এই অধিনায়কের, ‘তখনকার সময়ে ৬ বলে ১১ রান অনেক অবিশ্বাস্য। যখন আউটফিল্ড স্লো হয়, তখন তো আরও কঠিন। সেই মুহূর্তে ১১ রান আসা সত্যিই দারুণ ব্যাপার। পাইলট (খালেদ মাসুদ) মূলত গ্রাউন্ডশটস খেলে অভ্যস্ত। কিন্তু যেভাবে ছক্কাটা হাঁকালো সেটা অবিশ্বাস্য ছিল। প্রথম ৩ বলে পাইলটের এবং শেষ ৩ বলে শান্তর দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে আমরা জয় লাভ করি। আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে এটা একটি গোল্ডেন মুহূর্ত হয়ে থাকবে।’








