এমন শুরু কখনও চায়নি বাংলাদেশ। খেলা শুরু হতে না হতেই ২ উইকেট নেই! মাঝে একটু স্থিতিশীল অবস্থার পর আবার দেখতে দেখতে নেই ৫ উইকেট। ওপেনার সাইফ হাসান কিংবা মিডল অর্ডারে সাকিব আল হাসানের অসহায় আত্মসর্মপণ হতাশার ছবি এঁকে দেয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের গায়ে। আর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই ওই হতাশার ছবি মুছে যায় লিটন দাস ও মাহমুদউল্লাহর অসাধারণ ব্যাটিংয়ে।
বলা হচ্ছে হারারে টেস্টের প্রথম দিনের কথা। আলোর স্বল্পতায় ৭ ওভার আগে দিন শেষ হয়ে যাওয়ার আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অম্লমধুর সময় কেটেছে বাংলাদেশের। যেখানে টপ অর্ডারের ব্যর্থতা বড় ক্যানভাসে ফুটে ওঠার বিপরীতে লিটন-মাহমুদউল্লাহর দৃঢ়তার ছবিও ধরা পড়েছে। তাই দিন শেষে বাংলাদেশের অবস্থা ভালো-খারাপ মিলিয়ে। ৮৩ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে সফরকারীদের সংগ্রহ ২৯৪ রান।
টস জিতে ব্যাটিং নেমে বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা চলছিলেন উল্টোরথে। প্রথম ওভারেই ফেরেন সাইফ। খানিক পর নাজমুল হোসেন শান্ত। তারপর সাদমান ইসলাম, মুশফিকুর রহিম কিংবা সাকিব- কেউই হাল ধরতে পারেননি। অধিনায়ক মুমিনুল হক একা হাতে টেনেছেন অকেনটা পথ। কিন্তু তিনি ৭০ রান করে ফিরে গেলে আবার বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকেই শুরু লিটন-মাহমুদউল্লাহর প্রতিরোধ। তাদের ১৩৮ রানের জুটিতে বড় সংগ্রহের ভিত পায় বাংলাদেশ।
দলকে টেনে তুললেও নিজে হতাশায় পুড়েছেন লিটন। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৫ রান দূরে থাকতে আউট হয়ে গেছেন এই উইকেটকিপার। টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলে আউট হয়েছেন ৯৫ রানে। ডোনাল্ড তিরিপানোর বল ফাইন লেগে খেলতে গিয়ে ধরা পড়েন ভিক্তর নিয়াউচির হাতে। আউট হওয়ার আগে লিটন ১৪৭ বলের ইনিংসটি সাজান ১৩ চারে।
লিটন আউট হলেও আশার মশাল জ্বালিয়ে টিকে আছেন মাহমুদউল্লাহ। ১৬ মাস মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে নেমেই প্রত্যাবর্তনটা রাঙিয়ে নিয়েছেন হাফসেঞ্চুরি দিয়ে। ৫৪ রানে অপরাজিত থাকা এই ব্যাটসম্যানের সঙ্গে দ্বিতীয় দিন শুরু করবেন ১৩ রানে অপরাজিত থাকা তাসকিন আহমেদ।
শুরুর ধাক্কা ও প্রতিরোধ
সপ্তম উইকেটে লিটন-মাহমুদউল্লাহ জুটির আগে দৃশ্যপট ছিল অন্যরকম। ইনিংসের পঞ্চম বলেই দৃশ্যপট এলোমেলো। সাইফের বিদায়ে বাংলাদেশ হারায় প্রথম উইকেট। ওই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার ফিরে যান শান্ত!
জিম্বাবুয়েকে দারুণ শুরু এনে দেন ব্লেসিং মুজারাবানি। এই পেসারের বলে রানের খাতা খোলার আগেই বোল্ড হয়ে যান সাইফ। ওই মুজারাবানির বলেই মাত্র ২ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরেন আবার শান্ত। স্বাগতিক পেসারের ডেলিভারি শান্তর ব্যাটের কানায় লেগে গেলে তৃতীয় স্লিপে তালুবন্দি করেন ডিয়োন মায়ার্স।
৮ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অধিনায়ক মুমিনুল হাল ধরেন দলের। তাকে সঙ্গ দেন আরেক ওপেনার সাদমান। কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকেনি। তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠ ছাড়েন সাদমান। রিচার্ড এনগারাভার প্রথম শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন ২৩ রান করে। জিম্বাবুয়ের বাঁহাতি পেসারের ভেতরে ঢোকা বল তার ব্যাটের কানায় লেগে জমা পড়ে প্রথম স্লিপে থাকা ব্রেন্ডন টেলরের হাতে। সাদমান তার ৬৪ বলের ইনিংসটি সাজান ৪ বাউন্ডারিতে।
পারলেন না মুশফিক
পারফরম্যান্সের বিচারে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। টেস্ট ক্রিকেটে তার সৌরভ যেন আরও বেশি ছড়ায়। তাই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের আগে যখন চোট শঙ্কায় তার খেলা নিয়ে সংশয় জন্মেছিল, তখন দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছিল অনেক ক্রিকেটক্তরই। যদিও শঙ্কা কাটিয়ে ঠিকই মাঠে নেমেছেন এই ব্যাটসম্যান। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেন না।
হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসে বেশিদূর যেতে পারেননি মুশফিক। মুমিনুল হকের সঙ্গে বড় জুটি গড়ায় ইঙ্গিত দিয়েও পারলেন না তিনি। ব্লেসিং মুজারাবানির তৃতীয় শিকার হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। এলবিডাব্লিউ হয়ে ফেরার আগে ৩০ বলে করেছেন ১১ রান।
ব্যর্থ সাকিবই দেখা দিলেন
জুয়াড়ির প্রস্তাব গোপন করে আইসিসি থেকে পাওয়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর থেকে তিনি অচেনা। বোলিংয়ে তবু কিছুটা হলেও পাওয়া গেছে, কিন্তু ব্যাটিংয়ে? একেবারে যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স সাকিব আল হাসানের। সেই তিনি যখন জিম্বাবুয়েতে প্রস্তুতি ম্যাচে রান পেলেন, তখন মনে হলো এই বুঝি ফিরলেন সাকিব। কিন্তু না, মূল লড়াই টেস্টে এসে সেই ব্যর্থ সাকিবকেই পাওয়া গেলো!
আবারও হতাশ করলেন সাকিব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর শ্রীলঙ্কা সিরিজ, ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছেন এমনকি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটেও। সাকিব যেন ব্যাট করতেই ভুলে গেছেন! জিম্বাবুয়ে সফরে আশা আলো দেখালেও হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ। দলের প্রয়োজনের সময় মাত্র ৩ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
আগের ওভারে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম আউট হয়েছেন, সেই মুহূর্তে সাকিবের কাছ থেকে দায়িত্বশীল ইনিংসের ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু ভিক্তর নিয়াউচির বলে উইকেটকিপার রেগিস চাকাভার গ্লাবসবন্দি হয়ে ফিরেছেন দ্রুত। খেলেছেন মোটে ৫ বল।
বাজে শটে মুমিনুলের ইনিংসের সমাপ্তি
ব্যর্থতার ভিড়ে উজ্জ্বল আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছিলেন মুমিনুল হক। সম্ভাবনাময় ইনিংসে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন দলকে। ঠিক সত্যিকার অধিনায়কের মতো। এত চমৎকার এক ইনিংস কিনা বাজে এক শটে ইতি টেনে দিলেন!
হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসে দলের বিপদে হাল ধরেছিলেন মুমিনুল। হাফসেঞ্চুরি পূরণ করে সেঞ্চুরির পথেও হাঁটছিলেন তিনি। কিন্তু ভিক্তর নিয়াউচির বলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সেই ধারাতে নিয়াউচির বাইরের বল কাট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যাটে ঠিকঠাক হয়নি, ফলে সরাসরি বল জমা পড়ে পয়েন্টে থাকা ডিয়োন মায়ার্সের হাতে। ফেরার আগে মুমিনুল খেলেছেন ৭০ রানের ঝলমলে ইনিংস। ৯২ বলের ইনিংসটি বাংলাদেশ অধিনায়ক সাজান ১৩ বাউন্ডারিতে।
প্রয়োজনের সময় লিটনের ব্যাটে ঝিলিক
সময়টা একেবারেই ভালো যাচ্ছিল না লিটন দাসের। করোনাভাইরাস যেন তার ব্যাটিং শৈলী কেড়ে নিয়েছিল! প্রাণঘাতী ভাইরাস বাংলাদেশে ছড়ানোর আগে সবশেষ খেলা সিরিজে হেসেছিল তার ব্যাট। এরপর থেকে কেবলই হতাশার ছবি। তবে প্রয়োজনের সময় জ্বলে উঠলো এই উইকেটকিপারের ব্যাট। যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবশেষ আলো ছড়িয়েছিলেন, সেই প্রতিপক্ষের সামনেই ফিরলেন চেনা রূপে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কা সিরিজে খারাপ সময় কাটালেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে ছন্দে ফিরেছেন লিটন। টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় এলোমেলো ব্যাটিং লাইনআপে স্বস্তি ফেরান তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম হাফসেঞ্চুরি পূরণ করে সেঞ্চুরির পথেও হাঁটতে থাকেন। যদিও ৯৫ রানে আউট হয়ে আক্ষেপে পুড়েছেন তিনি।
মুজারাবানির তোপ
বাংলাদেশের টপ অর্ডার এলোমেলো করে দিয়েছিলেন ব্লেসিং মুজারাবানি। শুরুতেই দুই ব্যাটসম্যানকে ফেরানো এই পেসার প্রথম দিনে জিম্বাবুয়ের সেরা বোলার। ১৬ ওভারে ৪৮ রান দিয়ে তার শিকার ৩ উইকেট। ডোনাল্ড তিরিপানো ১৩ ওভারে ৩৬ রান খরচায় নেন ২ উইকেট। তার সমান ২ উইকেট পেতে ভিক্তর নিয়াউচির খরচ ৬৯ রান।









