বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট মানেই হতাশার গল্প। সেই গল্প কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িতই হচ্ছিল। দেশের মাটিতে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু জয় এলেও বিদেশের মাটিতে দীর্ঘদিন জয়হীন ছিল বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজেদের শততম টেস্টে জয় পেয়েছিল, এরপর বিদেশের মাটিতে জয় কী জিনিস, সেটি ভুলেই গিয়েছিল সফরকারীরা। অবশেষে হারারেতেই এলো কাঙ্ক্ষিত সেই জয়। ব্যাটি-বোলিং-ফিল্ডিং তিন বিভাগে আধিপত্য বিস্তার করে জিম্বাবুয়েকে ২২০ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
বিদেশের মাটিতে সব মিলিয়ে ৫৯ টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। এবারের হারারে টেস্টসহ পাঁচটিতে জিততে পেরেছে বাংলাদেশ। এর আগে সর্বশেষ জয়টি ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। আর প্রথমটি ছিল এই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই, ২০১৩ সালে। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে বিদেশের মাটিতে সাফল্য বলতে এতটুকুই। বাকি ৫৪ টেস্টের মধ্যে মাত্র চারটিতে ড্র করতে পেরেছে, আর হেরে যাওয়া ৫০ ম্যাচের বেশিরভাগই ইনিংস ব্যবধানে!
২০১৭ সালে শততম টেস্ট জয়ের পর এই ফরম্যাটে পুরোপুরি খেই হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের মুখ দেখেনি বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কিছুটা লড়াই করতে পারলেও বাকি দলগুলোর বিপক্ষে হতাশাই উপহার দিয়েছে মুমিনুলবাহিনী। হারারেতে তাই বহু প্রতীক্ষিত জয়ের অপেক্ষায় ছিল ক্রিকেটপ্রেমীরা। শেষ পর্যন্ত নিরাশ করেননি ক্রিকেটাররা, বহুল প্রত্যাশিত জয় এসেছে মাহমুদউল্লাহ-তাসকিন-মিরাজদের হাত ধরে। সব মিলিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ জয় সংখ্যা এখন ৫।
এমনিতে জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বরাবরই হতাশাজনক ছিল। আগের সাত টেস্টের মাত্র একটিতে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেটি হারারেতেই সর্বশেষ সফরে। জিম্বাবুয়েতে সেবার একটি টেস্ট জিতলেও টেস্ট সিরিজের ট্রফি আনতে পারেননি সাকিব-তামিমরা। এবার প্রথমবারের মতো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়ের সুযোগ হলো মুমিনুলদের। এক সেশন বাকি থাকতেই তাসকিন-মিরাজ-সাকিবদের বোলিংয়ে ছত্রখান হয়ে গেছে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনআপ। আর তাতেই ২২০ রানের বড় জয় পায় সফরকারীরা।
এই টেস্টর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুই দলের পার্থক্য কতখানি। একসময়কার শক্তিশালী জিম্বাবুয়েকে এখন অনেকটা বলে-কয়েই হারাতে পারছে বাংলাদেশ। টেস্ট শুরুর আগে জিম্বাবুয়ে যতই হুঙ্কার দিক না কেন, টেস্ট শেষ হতেই জিম্বাবুয়েও বুঝে গেলো দুই দলের পার্থক্য আসলে কতখানি! তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বাজে এই ফরম্যাটেই। তবুও জিম্বাবুয়ে বলেই প্রত্যাশিত ভাবে ফেভারিট ছিল সফরকারীরা।
বিদেশের মাটিতে হারের বৃত্ত ভাঙার মিশনে দলীয় পারফরম্যান্স ভূমিকা রেখেছে। হারারে টেস্ট শুরুর আগের দিন অধিনায়ক মুমিনুল ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। জিম্বাবুয়েকে হারাতে হলে সমন্বিত পারফরম্যান্সের বিকল্প ছিল না। বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ পারফরম্যান্স দিয়েই টেস্টে জয়ের খরা কাটিয়েছে।
লম্বা ব্যাটিং লাইনআপে নিয়ে ম্যাচ খেলতে নামা বাংলাদেশ শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে। ১৩২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ দলের ত্রাতা হয়ে আসে মাহমুদউল্লাহ-লিটন জুটি। সপ্তম উইকেটে তারা ১৩৮ রান যোগ করেন। তাতেই ম্যাচ চলে আসে বাংলাদেশের পক্ষে। এরপর তাসকিনকে সঙ্গে নিয়ে মাহমুদউল্লাহ রেকর্ড ১৯১ রানের জুটি গড়েন। মাহমুদউল্লাহ ১৬ মাস পর টেস্ট দলে ফিরে ক্যারিয়ারসেরা ১৫০ রানের ইনিংস খেলেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ৪৬৮। এরপর সাকিব-মেহেদী ঘূর্ণি জাদুতে ২৭৬ রানে অলআউট হয় জিম্বাবুয়ে। ১৯২ রানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ শান্ত ও সাদমানের জোড়া সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় ইনিংসে ১ উইকেটে ২৮৪ রানে ইনিংস ঘোষণা করে। জিম্বাবুয়ে ৪৭৭ রানের কঠিন লক্ষ্যে খেলতে গিয়ে তাসকিন-মিরাজ-সাকিবের কাছে পরাস্ত হয়।









