রাসেল ডমিঙ্গো হাইপারফরম্যান্স ইউনিটের কোচ হিসেবে ইন্টারভিউ দিতে এসে হয়ে গেছেন জাতীয় দলের কোচ। মূলত ডমিঙ্গোর পরিকল্পনায় মুগ্ধ হয়েই তাকে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু জাতীয় দলের কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তার মতে হাইপ্রোফাইল নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সংস্কৃতি বুঝবে এমন কোচকেই নিয়োগ দেওয়া উচিত।
জাতীয় দলের জার্সিতে দীর্ঘসময় ধরে খেলেছেন মাশরাফি। ফলে বিদেশি কোচদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে সেই অভিজ্ঞতা যে ভালো ছিল না সেটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার মাধ্যমে জানিয়েছেন ওয়ানডের সফলতম অধিনায়ক, ‘একটা কোচ যখন নিয়োগ দেওয়া হয়, তার প্রসেস আসলে কী থাকে সেটা জানার খুব ইচ্ছা আমার। এ যাবৎ কালে প্রায় ৯/১০ জন কোচের সঙ্গে কাজ করেছি। আমি যতটুকু দেখেছি প্রত্যেকটা কোচ তার নিজের মতো করে কাজ শুরু করে, যেটা করাটাও স্বাভাবিক। কারণ এক এক জনের কাজের ধরন এক এক রকম।'
বাংলাদেশে কোচ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বিদেশিরা। বিষয়টি উল্লেখ করে মাশরাফি লিখেছেন, ‘কিন্তু সব সময় দেখেছি প্রত্যেকটি কোচ তার নিজস্ব একজন বা দু’জন প্রিয় খেলোয়াড় বানিয়ে নেয়, যা পরে সিলেক্টর, ক্যাপ্টেন বা অন্যকেউ তাকে আর কিছুই বুঝাতে পারেনা বরং সম্পর্কগুলো জটিল হতে থাকে আর ঐ পছন্দের জন্য সে আবার দু’জনকে এমন অপছন্দ করা শুরু করে যে তাদের আর দেখতেই পারেনা। এক পর্যায়ে এমন জেদ শুরু করে যে প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দিবো, এমন কথা প্রকাশ্যেও বলতে শুনেছি কোচের মুখে।’
মাশরাফি যে বিষয়টা এখানে তুলে আনতে চেয়েছেন সেটা হলো, ‘আমার পয়েন্টটা হলো যে, কোচের পছন্দ নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড় হতেই পারে সেটা সব কোচেরই হয়। অন্যান্য দেশেও হয় এটাই স্বাভাবিক। তবে কখনও সেটা প্রকাশ্যে বুঝতে দেয় না, অনুমান করতে হয়। কারণ দলের সেরা ৩/৪ জন খেলোয়াড়ই শুধু ম্যাচ জেতায় না। আর জেতালেও আপনি একজনের জন্য আরেকজনকে ছোট করতে পারেন না। দর্শক বা সাংবাদিক অনেক কিছু লিখতেও পারে বলতেও পারে। যেটা একদম স্বাভাবিক ব্যাপার।’
বাংলাদেশে প্রধান কোচের দায়িত্বে যারা আসেন। তাদের প্রোফাইল ভারি করা ছাড়া বাড়তি কিছুই করার থাকে না বলে মনে করেন মাশরাফি, ‘কোচকে বলা হয় (ফাদার অফ দ্য সাইড) সে সবাইকে দেখে রাখবে। প্রয়োজনে কঠোর হবে আবার দলের স্বার্থে যাকে প্রয়োজন তাকে ব্যবহার করবে। তার সব কিছুই হতে হবে পজিটিভ। কারও প্রতি কঠোর, কারও প্রতি নমনীয় এটা এক রকমের বৈষম্যতে রুপ নেয় আমাদের দেশে। যা গোছানো দলকে অগোছালো করে ফেলে। এক পর্যায়ে তারা আবার নিজেদের দেশে, না হলে আইপিএল বা আরও ভালো কোন অফার পেয়ে চলে যাবে। কারণ এত দিন সে আমাদের দেশের ক্রিকেটকে নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে, নিজের প্রোফাইলও ভারি করেছে মাঝখান দিয়ে। বেতন তো নিয়েছে মাসে ১২/১৫ লাখ টাকা। আর আমাদের কোচগুলো না খেয়ে মরে। গালিও কোচরাই হজম করে। আর পরে ওনারা চলে গেলে আমরা পড়ি বিপদে। আবার নতুন কোচ নতুন পরীক্ষা নতুন দাবি মেটানো। এভাবেই চলছে বাংলাদেশে কোচদের যাওয়া আসা।’
কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে এর পর সরাসরি প্র্রশ্ন তুলে মাশরাফি লিখেছেন, ‘আবার আসি আমার প্রথম লাইনটায়, কোচ নিয়োগের সময় যে নতুন কোচের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, সেখানে আসলে তাকে কি প্রশ্ন করা হয়? বা আদৌও কোন প্রশ্ন করা হয়? নাকি শুধু জানতে চাওয়া হয় তোমার কী করার ইচ্ছা? হয়তো তখন সে কিছু পয়েন্ট তুলে ধরে, ওখান থেকে নতুনত্ব কিছু পেলে চিন্তা করে দারুণ কোচ কি সুন্দর প্ল্যান, এর মতো কোচই হয় না।’
হাইপ্রোফাইল নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সংস্কৃতি বুঝবে, খেলোয়াড়দের স্টাডি করবে, খেলোয়াড়দের নিবেদনকে সম্মান করবে- এমন কোচকেই নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন মাশরাফি, ‘আমার তো মনে হয় ভুল ওখানেই হয়ে যায়, কারণ আমরা মানুষকে বোঝাতে সব সময় হাইপ্রোফাইল কোচ খুঁজি যা পরে আর কোন কাজে আসেনা। আমাদের প্রয়োজন আমাদের ক্রিকেট যে ফলো করে বা আমাদের ম্যাক্সিম্যাম খেলোয়াড়দেরকে নিয়ে স্টাডি করে এসে ইন্টারভিউ দিচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নিয়ে আসা। তা না হলে -ও তো বুঝবেই না একজন সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ তৈরি করতে কতো দিন লেগেছে। বা অতীতে তাদের অবদান কী। একজন মোস্তাফিজ কীভাবে উঠে এসেছে। বার বার বলেছি আবারও বলছি দলের আগে কখনোই কোন খেলোয়াড় হতে পারে না, ভালো না করলে বাদ পড়তেই হবে।’
মাশরাফি আরও বলেছেন, ‘অফ ফর্ম সব খেলোয়াড়ের জীবনেই যায়। বাদও পড়ে কিন্তু ম্যানেজমেন্ট থেকে অপমানিত শুধু আমাদের দেশেই বেশি হয়। পারর্ফম না করলে বাদ দিবেন স্বাভাবিক, আবার তাকে তো সহযোগিতা করতে হবে কীভাবে ফর্মে আনা যায় বা তাকে মেন্টালি কীভাবে সাপোর্ট করা যায়। কোন ভাবেই আপনি বুঝতে দিতে পারেন না যে আপনি তাকে আর আপনার সময়কালে দেখতে চান না। এটার কারণ একটাই কোন কোচই আমাদের দেশে কাজ করার আগে আমাদের দেশের ক্রিকেট ফলোয়ার না। চাকরির জন্য আসে শেষ হলে চলে যায়।’
শেষে একটি বাক্য দিয়েই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন মাশরাফি, 'তাই আমার মনে হয়- হাই প্রোফাইল নয়, আমাদের প্রয়োজন আমাদের কোচ, বাংলাদেশের কোচ। একদম নিজস্ব মতামত আপনাকে মানতে হবে তা বলিনি।’









