শেখর ধাওয়ানের রেকর্ড ভাঙবেন সাইফ

রবিউল ইসলাম
১৮ জানুয়ারি ২০১৬, ২০:৩৭আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৬, ২০:৪৯

ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার টানেই সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন বর্তমানে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ওপেনিং ব্যাটসম্যান সাইফ হাসান। সৌদি আরবে বাংলাদেশের খেলা দেখতে পারতেন না তিনি। চ্যানেল আইয়ে শুধু স্কোর দেখতেন। ওই সময় ধারাবাহিক ম্যাচ জেতা শুরু করেনি বাংলাদেশ। নিজ দেশের হার দেখে ছোট সাইফ বাবাকে প্রশ্ন করতেন, 'বাবা বাংলাদেশ এতো হারে কেন?' সাইফের বাবা প্রতি উত্তরে বলতেন, 'তুমি একদিন ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশকে জয় এনে দিও।' সেই থেকেই ছোট্ট সাইফের স্বপ্নের পরিধি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে মা-বাবাকে বুঝিয়ে তাই ফিরে আসেন নিজ দেশে।  সাইফ হাসান

দেশে ফিরেই ভর্তি হন ধানমণ্ডি ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখানে অনুশীলন ও টুর্নামেন্ট খেলার সুবিধা কম বলে একাডেমি বদলে ভর্তি হন ক্রিকেট কোচিং স্কুলে। সেখানে শুরু থেকে সাইফের ক্রিকেট শেখার মিশন। অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলের হয়ে বিভাগীয় দলে সুযোগ মেলে তার। এরপর ডাক পান অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে। এরপর কিছুদিন যেন ব্যাট কথা বলছিলো না সাইফের। তাইতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সাইফ কঠোর পরিশ্রমটাই বেছে নিলেন। পরবর্তীতে অনূর্ধ্ব-১৮তে দারুণ ব্যাটিং করে সুযোগ করে নেন অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে।

সাইফ হাসান জাতীয় দলের মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ভক্ত। তার ব্যাটিং স্টাইল অনেকটাই রিয়াদের মতোই। দলের সতীর্থ বন্ধুরা তাকে রিয়াদ বলেই ডাকেন! ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিতব্য আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারতীয় ব্যাটসম্যান শেখর ধাওয়ানের করা ৫০৫ রানের রেকর্ডটি ভাঙ্গতে চান সাইফ। ধাওয়ান ২০০৪ যুব বিশ্বকাপে এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৫০৫ রানে করেছিলেন। একইসঙ্গে  টুর্নামেন্টে শেষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় নিজের নাম দেখতে চান সাইফ। আপাতত তার ভাবনাজুড়ে আসন্ন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপে ভালো খেলে জাতীয় দলে ঢোকার রাস্তাটা পাকা করে রাখতে চান তিনি। ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বড়দের বিশ্বকাপে ওপেনার হিসেবে খেলতে চান তিনি।

সাইফ হাসানের প্রিয় মূহুর্ত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরির আগের ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি পেয়েও কোচের কথা শুনতে হয়েছিলো। কোচ তাকে বলেছিলেন, তুমি ১৯ ম্যাচ খেলেছো। ওপেনার হিসেবে তোমার এখনও সেঞ্চুরি নেই। তোমার কাছ থেকে আরও বড় ইনিংস আশা করি। কোচের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাইফ হাসান পরের ম্যাচেই প্রথম সেঞ্চুরি করেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত হয়ে মাঠ ছাড়ছেন সাইফ ও শান্ত

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ সোমবার থাকছে ওপেনার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ সাইফ হাসানের একান্ত সাক্ষাৎকার :-

বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে কেন এলেন?

সাইফ হাসান : সৌদি আরবের এক হাসপাতালের সাইট ম্যানেজার হিসেবে আমার বাবা কাজ করতেন। সেখানে হাসপাতালের স্টাফরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুই ভাগে ভাগ হয়ে ক্রিকেট খেলতেন । মূলত বাবার সঙ্গে আমি ওখানে যেতাম। তাদের খেলা দেখে দেখেই আমার আগ্রহ বাড়ে। বাংলাদেশে এসে আমি ধানমণ্ডি ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হই। ওখানে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই খেলার প্রতি ভালোবাসাটা আরও বেড়েছে। এরপর ভর্তি হই ক্রিকেট কোচিং স্কুলে। অনূর্ধ্ব-১৪ হয়ে প্রথমবারের মতো ভালো ক্রিকেট খেলেছিলাম। এরপর অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলের ক্যাম্পে সুযোগ পেলাম। এরপর অনূর্ধ্ব-১৭ সুযোগ পাইনি। মনের মধ্যে জেদ চেপে গেলো। ২ বছর কঠোর পরিশ্রম করলাম। এরপর অনূর্ধ্ব-১৮ খেলে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পেলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: কী কারণে ঝুঁকি নিয়ে সৌদি থেকে চলে এলেন?

সাইফ হাসান: সৌদি আরবে কোনও স্পোর্টস চ্যানেল ছিলো না। শুধু চ্যানেল আইয়ের নিচে একটু করে স্কোরটা লেখা থাকতো। ওই সময় বাংলাদেশ বেশিরভাগ ম্যাচেই হারতো। তখন আব্বুকে জিজ্ঞেস করতাম বাংলাদেশ এতো হারে কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, তুমি একদিন ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশ দলকে জয়ী করবে। এরপর একদিন আব্বুকে বলি আমি বাংলাদেশের হয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই। সে জন্য দেশে ফেরত যাওয়াটা জরুরি। উনি প্রথমে একটু অবাক হন। পরে আমার ক্রিকেটপ্রেম দেখে আম্মু ও বোনের সঙ্গে আমাকে দেশে ফেরত পাঠান। পরে অবশ্য তিনিও চলে আসেন।

ফিল্ডিং অনুশীলনে সাইফ হাসান

বাংলা ট্রিবিউন: কড়া নাড়ছে যুব বিশ্বকাপ। দলের প্রস্ততি কেমন?

সাইফ হাসান: আমাদের প্রস্তুতি খুবই ভালো হচ্ছে। আমরা অনেকগুলো ম্যাচ সাম্প্রতিক সময়ে খেলেছি। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপেক্ষ রেজাল্টটা দেখলেই বোঝা যাবে আমাদের প্রস্তুতি কতটা ভালো। গত কয়েক বছরের মধ্যে গত ত্রিদেশীয় সিরিজটা ছাড়া আর কোনও সিরিজে আমরা খারাপ খেলিনি। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে হারলেও আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এছাড়া ক্যাম্প চলাকালে আমরা স্যারদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। যার যা সমস্যা ছিলো সবাই চেষ্টা করেছে সেগুলো শুধরানোর। সব মিলিয়ে আমাদের প্রস্তুতি অনেক ভালো। দলের সবাই অনেক আত্মবিশ্বাসী বিশ্বকাপে ভালো করার ব্যাপারে।

বাংলা ট্রিবিউন:  ব্যক্তিগত প্রস্তুতি কেমন?

সাইফ হাসান: আমার খুব ভালো সময় যাচ্ছে। ব্যাটে বলেও খুব ভালো সংযোগ হচ্ছে। প্রথম কয়েকটা সিরিজে রানে ছিলাম না। এখন খুব ভালো টাচে আছি। চেষ্টা করব এই ফর্মটা বিশ্বকাপে ধরে রাখার।

বাংলা ট্রিবিউন : ছোটদের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহ করেছেন শেখর ধাওয়ান (৫০৫); রেকর্ডটা নিজের করে নিতে চান কিনা? 

সাইফ হাসান : আমি এটা চিন্তা করে রেখেছি। যদি বিশ্বকাপে সবগুলো ম্যাচ খেলতে পারি অবশ্যই ইচ্ছে আছে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার। আর এই রেকর্ড খুব একটা বড় নয়। চেষ্টা করবো এটা ভেঙ্গে ফেলার।

সতীর্থদের সঙ্গে সাইফ হাসান

বাংলা ট্রিবিউন: কত সালের মধ্যে নিজেকে জাতীয় দলে দেখতে চান?

সাইফ হাসান: ২০১৯ বিশ্বকাপে জাতীয় দলে নিজেকে ওপেনার হিসেবে দেখতে চাই। এরজন্য যতটুকু পরিশ্রম করার প্রয়োজন আমি তাই করছি। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন : নিজের ব্যাটিং স্ট্রেন্থ নিয়ে কিছু বলেন…

সাইফ হাসান: আমি যেহেতু একজন ওপেনার। আমার কাছে দল বড় ইনিংস চায়। দল চায় আমি যেন প্রথম দশ ওভার কাজে লাগিয়ে স্কোরবোর্ডে বেশি রান তুলতে পারি। স্পিনের তুলনায় আমি পেস বল ভালো খেলি। তবে সেট হওয়ার পর স্পিনেও তেমন কোনও সমস্যা হয় না। ম্যাচের প্রথম দশ ওভার ব্যবহার করাই আমার মূল দায়িত্ব। সব ধরনের শট খেলতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তবে কাভার ড্রাইভ আমার প্রিয় শট। আর স্ট্যাম্পের একটু বাইরের বল পেলেতো ওটাকে সীমানা ছাড়া করতে আমার খুব ভালো লাগে।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিপক্ষ দলের বোলারদের নিয়ে কোনও কাজ করেছেন কিনা?

সাইফ হাসান: গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ড এবং নামিবিয়াকে নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। প্রথম ম্যাচটি আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। আমার তাদের সঙ্গে প্রচুর ক্রিকেট খেলেছি। বেশিরভাগ ম্যাচই আমরা জিতেছি। আমরা জানি ওরা কী খেলবে, না খেলবে। ওদের বোলিং আক্রমণ এবং ব্যাটিং কেমন আমরা জানি। নিজের পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারলে, আমরা খুব ভালোমতোই জিতবো। ওদের সঙ্গে জিতে আমরা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবো।

সাইফ হাসান

বাংলা ট্রিবিউন: মিরাজ-শান্ত-সাইফরা যুব বিশ্বকাপ না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচাতে পারবেন কিনা?

সাইফ হাসান: আমাদের সবার চোখে মুখে একই স্বপ্ন। আমরা ভালো রেজাল্ট করার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। আমাদের প্রস্তুতি শেষ। সবাই তৈরি। অপেক্ষা করছি কবে বিশ্বকাপ শুরু হবে আর, কবে আমার জেতা শুরু করবো।

বাংলা ট্রিবিউন : ঘরের মাঠে খেলা বাড়তি কোন চাপ...?

সাইফ হাসান: বাড়তি চাপ না। এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। কারণ আমরা দর্শদকদের সাপোর্ট পবো। পুরো গ্যালারি আমাদের পক্ষেই থাকবে। হয়তো যারা দর্শকদের সামনে খেলেনি তাদের একটু চাপ লাগতে পারে। তবে আমার মনে হয় না কেউ এটা নিয়ে বাড়তি চাপ অনুভব করছে।

প্রোফাইল

নাম : মোহাম্মদ সাইফ হাসান

ডাক নাম : সাইফ

জন্ম : ৩০ অক্টোবর ১৯৯৮

উচ্চতা : ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি

ওজন : ৭৭ কেজি

পড়াশুনা : এ লেভেল

প্রথম ক্লাব : ধানমণ্ডি ক্রিকেট একাডেমি

বর্তমান ক্লাব : ইনডোর ক্রিকেট একাডেমি

ব্যাটিং স্টাইল : ডানহাতি ওপেনার

প্রিয় শটস : কাভার ড্রাইভ ও স্টেইট ড্রাইভ

প্রিয় মানুষ : মা-বাবা

প্রিয় ক্রিকেটার : কুমারা সাঙ্গাকারা (শ্রীলঙ্কা) মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ (বাংলাদেশ)

ক্রিকেট ছাড়া অন্য প্রিয় খেলা : বিলিয়ার্ড

প্রিয় ফুটবল তারকা : নেইমার

প্রিয় ফুটবল দল : ব্রাজিল

প্রিয় বন্ধু : হালিম, পিনাক, সোহাগ ও স্বাধীন

ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত : জিম্বাবুয়ের সঙ্গে অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি

ছবি : সাজ্জাদ হোসেন

/এমআর/

সম্পর্কিত
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সিরিজে সমতা অস্ট্রেলিয়ার
১৫ বলে ফিফটি, পারভেজের রেকর্ডে ভাগ বসালেন হাবিবুর
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম