টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেক কিছুই সামনে এসেছে। প্রাথমিক রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে হারটাই ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে বাংলাদেশ সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে পুরো টুর্নামেন্টেই মাহমুদউল্লাহরা নিজেদের ‘ব্র্যান্ডের’ ক্রিকেট খেলতে পারেনি।
সেই ব্যর্থতা ভুলে এখন নতুন শুরুর দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ। সেই শুরুর পথে কাল তাদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। বাংলাদেশ দলে একটা গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই অবস্থায় তারা কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ডেভেলপমেন্ট বিভাগে কাজ করা নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন, মানসিক বাধা থেকে মুক্তি মিললেই সাফল্য আসবে।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম রাউন্ডে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ হেরে যাওয়ার পরপর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সিনিয়র ক্রিকেটারদের সমালোচনা করেছিলেন। বাজেভাবে হারের জন্য খেলোয়াড়দের দায়িত্ববোধ এবং টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ওসব সমালোচনা সাকিব-মাহমুদউল্লাহ-মুশফিকরা নিতে পারেননি। সংবাদ সম্মেলনে এসে তারাও পাল্টা সমালোচনা করেছেন। এসব করতে গিয়ে মাঠের খেলায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেন ক্রিকেটাররা। পুরো টুর্নামেন্টেই সেখানে থেকে বের হতে পারেননি। ফলে শুক্রবার শুরু হতে যাওয়া পাকিস্তান সিরিজের আগেও একই প্রশ্ন উঠলো অবধারিতভাবে।
নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন, ক্রিকেটারদের ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পারেন টিমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা সদস্যরাই। ক্রিকেটারদের মানসিক বাধাটা দূর করতে পারলেই পাকিস্তানের বিপক্ষে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলের প্রতিটি ক্রিকেটার মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। পাকিস্তানের বিপক্ষে জিততে হলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াটা জরুরি। কেননা স্কিলতো আর হারিয়ে যাবে না। মানসিক বাধাটা কাটাতে পারলেই সাফল্য পাওয়া সম্ভব।’
আর ক্রিকেটারদের এই মানসিক বাধা কাটিয়ে উঠতে ভূমিকা রাখতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট। ফাহিম বলেছেন, ‘মানসিক আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য যদি আমরা কিছু করতে পারি, তাহলে সেটি ড্রেসিংরুমে ইতিবাচক ভাইভ আনতে পারবে। টিম লিডার যারা আছে কিংবা দলের আশাপাশে যারা আছে, তাদেরকেই দায়িত্বটা নিতে হবে। আর এটি করতে পারলে আমরা স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারবো। এই মুহূর্তে দলের শারীরী ভাষা দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়, মানসিকভাবে দল কতটা কঠিন সময় পার করছে। ওই জায়গায় একটু যত্ন নেওয়া উচিত।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে সাফল্য পেতে ফর্মহীন ক্রিকেটারদের বাদ দিয়ে নতুন বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওপেনিং নিশ্চিতভাবেই পরিবর্তন আসছে। লিটন-সৌম্য দলে না থাকাতে ওই জায়গায় সাইফ হাসান কিংবা নাজমুল হোসেন শান্তর মধ্যে একজনকে দেখা যেতে পারে। নাজমুলের এই ফরম্যাটে তিনটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও সাইফ হাসানের নেই। শুক্রবারের ম্যাচে নাঈমের সঙ্গে ইনিংসের গোড়াপত্তনে এই দুইজনের একজনকেই দেখা যাবে।
এই অবস্থায় একটা বিষয় খুব করে ভাবাচ্ছে। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যর্থতার মূল কারণ পাওয়ার প্লে ব্যবহার করতে না পারা। শান্ত কিছুটা আক্রমণাত্মক খেললেও সাইফ একদম রয়ে-সয়ে খেলতে অভ্যস্ত। নাঈম রান করছেন ঠিকই, কিন্তু স্ট্রাইকরোটেট করতে পারেন না। সবমিলিয়ে তাই পাওয়ার প্লের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়! এর ওপর ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তান পেস আক্রমণেও দুর্দান্ত। বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির জন্য যেটা আরও বেশি ভয়ের কারণ। শুরুতেই উইকেট হারিয়ে ফেললে দলের বড় স্কোর নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেই পড়তে হবে।
নাজমুল আবেদীনের মতে এখানেও সাফল্য লুকিয়ে মানসিক জায়গাতে। মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করতে পারলেই ব্যাটসম্যানরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে পারবে, ‘সবকিছুর মূলে আত্মবিশ্বাস। বাংলাদেশ দল যদি মানসিক বাধা থেকে মুক্ত হতে পারে, তাহলে ব্যাটাররা ভালো করবে। কারণ আত্মবিশ্বাসহীনতাই মূলত ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে।’
ব্যাটসম্যানদের পাশাপাশি কুড়ি ওভারের ফরম্যাটে অধিনায়কত্বও বড় ফ্যাক্টর। অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলেই কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে বিষয়টাকে ‘এক্স ফ্যাক্টর’ বলা হয়ে থাকে। আইপিএলে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে যেমন চেন্নাই সুপার কিংস নয়বার ফাইনাল খেলেছে। তার নেতৃত্ব-জাদুতে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি চারবার শিরোপাও জিতেছে। তবে উল্টো উদাহরণও আছে। বিরাট কোহলির দল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু দারুণ সব ক্রিকেটারকে নিয়ে ফাইনাল খেলতে পারেনি একবারও। কোহলির দুর্বল নেতৃত্বই বেঙ্গালুরুর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সুতরাং অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারলেই সাফল্য পাওয়া সম্ভব। তবে নাজমুল আবেদীন কিছু আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছেন। বিশ্বকাপ ব্যর্থ হওয়ার পর যেভাবে নতুন করে শুরুর কথা ছিল, সেভাবে হয়নি বলেই তার এই শঙ্কা, ‘বিশ্বকাপে দলটা যে কারণে পারফরম্যান্স করতে পারলো না, সেগুলো যেভাবে চিহ্নিত করার দরকার ছিল, বোর্ড কিন্তু সেটি করেনি। আমরা সব দায় খেলোয়াড়দের ওপরই চাপালাম। বেশ কিছু খেলোয়াড়কে পরিবর্তন করে আমরা দায়িত্ব শেষ করলাম। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে হোম সিরিজে বাজে উইকেটে খেলে যে ক্ষতিটা হয়েছিল, সেটা কিন্তু আমরা একবারও সামনে আনলাম না।’
এ সময় বোর্ড প্রধানের সমালোচনার বিষয়টিও তুলে আনেন তিনি, ‘পাশাপাশি দলের খারাপ সময়টাতে বোর্ড পাশে না থেকে উল্টো সমালোচনায় মুখর ছিল। এটাইতো মূলত ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে ডাউন করে দিয়েছে। ওসব কোনও কিছুই আমরা চিহ্নিত করলাম না। আমরা কিছু খেলোয়াড়কে বাদ দিয়ে দিলাম।’








