ছক্কা মারতে না পারার জেদ থেকেই ব্যাটার আরিফুল

রবিউল ইসলাম
২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮:০৬আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০৫

বড় ভাই টেপ টেনিসের ভালো ব্যাটার ছিলেন। সেই দেখাদেখি ছোট্ট আরিফুল ইসলামের হাতে ওঠে ব্যাট-বল। ক্লাস ফোরে থাকতেই বড় ভাইয়ের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ জেলার জামালপুরের হাজী জাফর আলী কলেজ মাঠে যাওয়া নিয়মিত। কিন্তু ব্যাট করতে নেমে ছক্কা মারতে পারতো না ছোট্ট আরিফুল। সেই আক্ষেপ থেকেই ব্যাটার হওয়ার স্বপ্নটা বুনে ফেলেন মনে। তবে যখন ক্রিকেট শুরু করেন, তখন পরিবার থেকে আসতে থাকে বাধা। ‘ক্রিকেট খেলে কী হবে, পড়াশুনা মন দিয়ে করো’- এমন কথা শুনতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। ওই কথায় কান দিলে কি আর অনূর্ধ্ব-১৯-এর বিশ্বমঞ্চে পাওয়া যেতো অফ স্পিনিং অলরাউন্ডার আরিফুলকে!

ক্লাস সিক্সে থাকতে গ্রামের এক কাকার ‍মুখ থেকে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) নাম শোনেন আরিফুল। এরপর মা ফারজানা পারভীনের হাত ধরে কিশোরগঞ্জ থেকে সাভারে চলে আসেন। কিন্তু ক্রিকেট বলে খেলার অভিজ্ঞতা না থাকায় ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। মুখ কালো করে বিকেএসপির গেট দিয়ে বের হওয়ার পথেই হাতে পান এক প্রসপেক্টাস। সেখানে দেওয়া ফোন নম্বরে কল দিয়ে ভর্তির যাবতীয় তথ্য নেন আরিফুল। তবে প্রাইভেট ক্রিকেট একাডেমিতে খরচ বেশি হওয়ায় মা চাননি ছেলেকে ভর্তি করাতে। কিন্তু নাছোড়বান্দা আরিফুল বাবা-মাকে বোঝান, তিনি ক্রিকেটার হতে চান। ওষুধের ব্যবসায় জড়িত বাবা আফজাল হোসেন শেষমেষ ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বাংলাদেশ স্পোর্টস একাডেমিতে (বিএসএ) ভর্তি করিয়ে দেন ছেলেকে।

ক্রিকেটে সেই শুরু আরিফুলের। ওখানে চার মাসের কোচিংয়ে নরসিংদী গিয়ে টিকে যান বিকেএসপির ট্রায়ালে। এরপর কয়েক দফা ক্যাম্প করে ২০১৬ সালে দিনাজপুর বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে। ওখানেই ব্যাটার আরিফুল হয়ে ওঠেন অফস্পিনিং অলরাউন্ডার। আরিফুল ভালো ফিনিশ করতে পারেন বলে তাকে ‘ফিনিশার’ খেতাব দিয়েছেন নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ শিপন। যুব বিশ্বকাপে ফিনিশার খেতাবটা প্রমাণ করতে মুখিয়ে এই অলরাউন্ডার।

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ (শনিবার) থাকছে অলরাউন্ডার আরিফুল ইসলামের একান্ত সাক্ষাৎকার-

ছক্কা মারতে না পারার জেদ থেকেই ব্যাটার আরিফুল বাংলা ট্রিবিউন: বড় ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতেই নাকি ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন?

আরিফুল: আমার গ্রাম কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া থানায় জামালপুরে। যখন গ্রামে ছিলাম, পড়তাম বারি আদর্শ বিদ্যালয়ে। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। আমার ভাই টেপ টেনিসে খুব ভালো ক্রিকেট খেলতো। বিভিন্ন জায়গায় ভাইয়াকে ‘ভাড়া’ করে নিয়ে যেতো। আমাদের এলাকার হাজী জাফর আলী কলেজ মাঠ ছিল, সেখানেই বেশি ম্যাচ হতো। আমিও আমার ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে যেতাম। কিন্তু কখনও ছয় মারতে পারতাম না। ভাইয়াসহ, সবাই বড় বড় ছয় মারতো। এইসব দেখে আমার মনে হতো, আমি যদি এমন ছয় মারতে পারতাম।

বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি ক্রিকেট বলে না খেলেই বিকেএসপিতে ট্রায়ালে গিয়েছিলেন...

আরিফুল: তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। ২০১৪ সালের দিকে আমার এক কাকার মুখে বিকেএসপির কথা শুনলাম। পরের বছর যখন ক্লাস সেভেনে উঠি, তখন আসি বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিতে আসি। ট্রায়াল দিতে গিয়েই আমি ক্রিকেট বল প্রথমবার দেখি। কখনও ধরিওনি। যখন ট্রায়ালে আসতে চেয়েছি, বাসা থেকে কেউই আমাকে সাপোর্ট দেয়নি। তারপরও অনেক জোরাজুরি করেছি, বাসায় বলেছিলাম আমি পড়াশোনা করবো না ক্রিকেট খেলবো। এরপর আম্মু বাধ্য হয়ে আমাকে সাভার নিয়ে আসলো। কিন্তু ওই বছর ট্রায়াল দিয়ে সুযোগ পাইনি। কেননা আমার ক্রিকেট বলে খেলার কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে দিনাজপুর বিকেএসপিতে সুযোগ এলো কীভাবে?

আরিফুল: বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় মূল গেটের সামনে একটা প্রসপেক্টাস পেয়েছিলাম। বাংলাদেশ স্পোর্টস একাডেমির (বিএসএ)। বিকেএসপিতে না হওয়ার পর আব্বা-আম্মা বলেছে, এগুলো হবে না, শুধু শুধু সময় নষ্ট। তারপরও আমি প্রসপেক্টাস দেখে ওখানকার ফোন নম্বরে কল দিয়ে কথা বলেছি, বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছি। খরচটা বেশিই ছিল। ৪০ হাজার টাকার কথা শুনে আব্বা-আম্মা বলেছিল, কোনও লাভ নেই, শুধু শুধু খরচ হবে। পরে আমি জোর করাতে আব্বা ভর্তির করিয়ে দেন। ওখানে চার মাসের মতো অনুশীলন করেছিলাম। এরপর জেলা পর্যায়ে নরসিংদী থেকে বিকেএসপিতে ট্রায়াল দেই। এক মাসের ক্যাম্পে সুযোগ পাই। ওখানে ভালো করার পর আমাকে চার মাসের ক্যাম্পে ডাকে। দুই মাসের ক্যাম্পের পর এক সপ্তাহের একটি বিশেষ ক্যাম্পে সুযোগ পাই। এটা বোর্ড (বিসিবি) থেকে হয়েছিল। ওই ক্যাম্পে ভালো করার পর ২০১৬ সালে দিনাজপুর বিকেএসপিতে সুযোগ পাই। এরপর পর্যায়ক্রমে বয়সভিত্তিক সব ধাপ পেরিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাই।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ক্রিকেট জীবনের শুরুটা হয়েছিল ব্যাটার দিয়ে। এরপর স্পিনার হয়ে ওঠা কীভাবে?

আরিফুল: প্রথম প্রথম আমি পেস বোলারই ছিলাম। বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আসলে অফ স্পিন করা। অনূর্ধ্ব-১৪তে অফ স্পিন করে ১২ উইকেট পেয়েছিলাম। আমি একটু খাটো ছিলাম, আর অফ স্পিনে ভালো করার কারণে সবাই বলছিল, তুই স্পিন কর। কোচদের সিদ্ধান্তেই স্পিনার হয়ে উঠি।

বাংলা ট্রিবিউন: একসময় পরিবার থেকে সাপোর্ট পাননি, এখন কেমন প্রেরণা পাচ্ছেন?

আরিফুল: আমি যখন খারাপ করি। আমার ভাই আমাকে বলে, ‘আরে তুই ভালো খেলোয়াড়, এগুলো নিয়ে ভাবিস না। ভালো করে অনুশীলন কর।’ আমাকে অনেক সাহস দেয়। আমি কখনও খারাপ করলে আমার আব্বু-আম্মুও মন খারাপ করে না। এখন বুঝে গেছে আমি আস্তে আস্তে ভালো একটা পর্যায়ে যাচ্ছি। এখন আমি আমার পরিবার থেকে অনেক সাপোর্ট পাই।

বাংলা ট্রিবিউন: খুব কাছে চলে এসেছে বিশ্বকাপ। দলের প্রস্তুতি কেমন দেখছেন?

আরিফুল: দলের প্রস্তুতি অনেক ভালো। ভারতে গিয়ে আমরা ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপ। ওখানে ভালো করা জরুরি। এশিয়া কাপে ভালো করলে সেই আত্মবিশ্বাস আমরা বিশ্বকাপে নিয়ে যেতে পারবো। আশা করি, বিশ্বকাপের আগে যদি কারও কোনও সমস্যা থাকে সব সমাধান হয়ে যাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: ওয়েস্ট ইন্ডিজে কঠিন কন্ডিশনে খেলতে হবে। আপনার প্রস্তুতি কেমন হয়েছে?

আরিফুল: স্যারদের কথাগুলো শুনেছি। তারা উইকেট নিয়ে আমাদের কিছুটা ধারণা দিয়েছেন। ওখানে যাওয়ার পর আরও কিছু ধারণা পাবো। আমি যেহেতু ব্যাটিং অলরাউন্ডার। আমাকে দুটো রোল প্লে করতে হবে। কন্ডিশন যেমনই হোক, উইকেট টু উইকেট বোলিং করলে ডট বল দেওয়া সম্ভব। ব্যাটিং নিয়েও কাজ করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: গত বিশ্বকাপ খেলা কয়েকজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন দলে, তাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে?

আরিফুল: সবসময় রাকিব ভাইয়ের (রাকিবুল হাসান) সঙ্গে বোলিং নিয়ে কথা হয়েছে। বোলিং নিয়েই বেশি কথা হয়েছে। উনি আমাকে বলেছেন, আমার দায়িত্ব হবে ব্যাটারদের আটকে রাখা। ব্যাটাররা যেন রান না তুলতে পারে সেভাবেই বোলিং করা। আমিও সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন: টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় মিডল অর্ডারের বড় দায়িত্ব পালন করতে হয়। আপনি কতটা প্রস্তুত?

আরিফুল: বড় মঞ্চে পারফরম্যান্স করার সুযোগ পেয়েছি। এটা আমার জন্য দারুণ ব্যাপার। লক্ষ্য তো আসলে একটাই- দলে অবদান রাখা। মিডল অর্ডার ব্যাটার হিসেবে আমার দায়িত্বটা অনেক। কখনও যদি দল বিপদে পড়ে যায়, আমাকে দায়িত্ব নিতে হবে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে বিপর্যয়ের মূহূর্তে প্রতিরোধ গড়ার অভ্যাস আমার আছে। আশা করি, তেমন কিছু হলে বড় মঞ্চেও পারবো।

বাংলা ট্রিবিউন: মাহমুদউল্লাহ-বাবর আজমের খেলা পছন্দ করেন। তাদের পছন্দ করার বিশেষ কোনও কারণ?

আরিফুল: অনূর্ধ্ব-১৭ দলে থাকতে আমি প্রচুর মেরে খেলতাম। তখন শিপন স্যার আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘মাহমুদউল্লাহ একদিন এভাবে মারতো।’ তখন থেকেই আমি উনার ফ্যান। উনার জীবনযাপনও আমাকে মুগ্ধ করে। এছাড়া বাবর আজমের শুরুটা আমার খুব ভালো লাগে।

ছক্কা মারতে না পারার জেদ থেকেই ব্যাটার আরিফুল প্রোফাইল

নাম: মো: আরিফুল ইসলাম

ডাক নাম: আরিফুল

জন্ম: ৮ ডিসেম্বর ২০০৪

জন্মস্থান: কিশোরগঞ্জ

বাবা: আফজাল হোসেন

মা: ফারজানা পারভীন

উচ্চতা: ৫ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চি

পড়াশোনা: এইচএসসি প্রথমবর্ষ

প্রথম ক্লাব: বাংলাদেশ স্পোর্টস একাডেমি (বিএসএ)

বর্তমান ক্লাব: বিকেএসপি (দিনাজপুর)

ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি (মিডল অর্ডার)

প্রিয় শটস: কাভার ড্রাইভ

বোলিং স্টাইল: অফ স্পিন

প্রিয় ডেলিভারি: আর্মার ডেলিভারি

প্রিয় মানুষ: মা-বাবা

প্রিয় ক্রিকেটার: মাহমুদউল্লাহ ও বাবর আজম

ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে একটি ম্যাচ। ওই ম্যাচে ‘ফিনিশ’ করতে না পারলে হয়তো এতদূর আসা হতো না আরিফুলের। সে ম্যাচে ৮৫ রানে অপরাজিত ছিলেন।

/কেআর/
সম্পর্কিত
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সিরিজে সমতা অস্ট্রেলিয়ার
১৫ বলে ফিফটি, পারভেজের রেকর্ডে ভাগ বসালেন হাবিবুর
সর্বশেষ খবর
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম