যা করেছি কিছুই না, আমাকে আরও রান করতে হবে: মুনিম

রবিউল ইসলাম
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৪:৪০আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৫:০০

মুনিম শাহরিয়ারের ক্রিকেট যাত্রার শুরু ময়মনসিংহের নয়াপাড়া থেকে। মেডিকেল কলেজের উল্টো দিকের এই এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা একটি বেসরকারি বীমা কোম্পানির চাকরিজীবি ছিলেন। শুরুতে বাবার কাছ থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার প্রেরণাটা পেয়েছেন। তাই বাবাকে নিয়ে অনুশীলন মাঠেও চলে যেতেন।

অথচ বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়েও মুনিম ছিলেন দিশাহীন! শেষ পর্যন্ত বাবা-মা, বন্ধুদের প্রেরণা নিয়ে সঠিক পথটা খুঁজে পেয়েছেন। সেই পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন ও আবাহনী। গত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে ঝড় তুলে আলোতে এসেছিলেন। এরপর বিপিএলের ড্রাফটে তাকে নিয়ে অনেকের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে ড্রাফট থেকেও এই ব্যাটারকে দলে নেয়নি কেউ। ড্রাফটের বাইরে থেকে পরে তাকে দলে নেয় ফরচুন বরিশাল। শুরুতে দল না পাওয়া সেই মুনিম বিপিএলে সুযোগ পেয়েই নিজেকে চেনাচ্ছেন। বরিশালকে বেশ কিছু ম্যাচ জয়ের ভিত গড়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে তার ইনিংস। ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলে দারুণ প্রশংসা কুড়ানো মুনিম বাংলা ট্রিবিউনকে শোনালেন নিজের কথা।

বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি ক্রিকেট খেলাই নাকি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন?

মুনিম: আউটপুট আসছিল না। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট শেষ করার পর কোনও কিছুই হচ্ছিল না। অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে স্ট্যান্ডবাই ছিলাম। ২০১৬ সালের ব্যাচেও স্ট্যান্ডবাই ছিলাম; মিরাজ-সাইফউদ্দিনরা যে ব্যাচে খেলেছিল।  এরপর প্রিমিয়ার লিগে দল পেতেও কষ্ট হতো। দল পেলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতাম না। যেহেতু খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতাম না, ফলে  নিজের পাফরম্যান্সও দেখাতে পারতাম না। মাঝে মাঝে পারফরম্যান্স হলেও ধারাবাহিকতা ছিল না। সবমিলিয়ে ভীষণ হতাশ ছিলাম। এই জিনিসটাই আসলে কাজ করেছে- আমি কি আসলে ক্রিকেট খেলবো, নাকি অন্য কিছু করবো, আমার সময়তো চলে যাচ্ছে।  

বাংলা ট্রিবিউন: এই হতাশা থেকে বেরিয়ে আসলেন কীভাবে?

মুনিম: প্রথমত, পরিবার থেকে অনেক সাপোর্ট পেয়েছি। বাবা আমাকে সবচেয়ে বেশি মোটিভেট করেছে। বরাবরই বলতেন, আমার সিদ্ধান্তের ওপর ওনার আস্থা আছে। আরও বলতেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত সবাইকে চেনাতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তোমাকে ক্রিকেট নিয়ে বহুদূর যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’ বাবার কথাগুলো আমাকে অনেক বেশি উৎসাহিত করেছে।  এছাড়া আশে পাশের বন্ধু-বান্ধব বলেন, বড় ভাইরা, আমাকে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছে। সুজন ভাই আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছেন। শান্ত (নাজমুল হোসেন শান্ত) আছে, সে আমাকে উৎসাহিত করেছে। সর্বশেষ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে সুজন ভাই আমাকে সুযোগ দিল, ওখানে ভালো খেললাম। এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট বলতে পারেন। সত্যি কথা বলতে আমার অতীত এতটা খারাপ ছিল যে, পাওয়া সুযোগ যে কোনও মূল্যে লুফে নিতে চেয়েছি।

বাংলা ট্রিবিউন:  ড্রাফটে শুরুতে দলই পাননি, যেভাবে পারফর্ম করছেন তাতে কেমন লাগছে?

মুনিম: অবশ্যই ইতিবাচক ভাবে নিচ্ছি। ইনিংসগুলো ভালো হচ্ছে, ভালো হবে।  ইনশাআল্লাহ এটা বিশ্বাস করি। ড্রাফট থেকে দল না পেয়ে কিছুটা হতাশতো ছিলাম। পরে আলহামদুলিল্লাহ সুজন স্যার এবং ফাহিম স্যার আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। মানসিক ভাবে অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন, দিচ্ছেনও।

বাংলা ট্রিবিউন: এক পাশে ক্রিস গেইলকে রেখে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কতটা উপভোগ করেছেন?

মুনিম: ক্রিস গেইল অসাধারণ একজন ক্রিকেটার, দারুণ একজন মানুষ। আমার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি হচ্ছে ক্রিস গেইলের সঙ্গে ওপেন করার অভিজ্ঞতা। উনি খুবই নরমাল থাকতে বলেন, আমার সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে বলেন। মূল কথা হচ্ছে ক্রিজে পুরো সময়টা উপভোগ করতে বলেন। আসলে ক্রিজে উনি খুব বেশি কথা বলেন না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সেভাবে কথা-বার্তা বলারও সময় থাকে না। মাঝে মাঝে বাউন্ডারি মারলে উনি এসে হাত মিলিয়েছেন, এটুকুই।

দলের বিদেশি সতীর্থদের সঙ্গে মুনিম। বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিস গেইল-ডোয়াইন ব্রাভো টি-টোয়েন্টির বড় বিজ্ঞাপন, তাদের সঙ্গে ব্যাটিং নিয়ে কোনও কথা হয়েছে?

মুনিম: আলাদা করে সেভাবে সময় পাইনি কথা বলার। গেইলের সঙ্গে যতখানি কথা বলতে পেরেছি, উনি ব্যাটিংটা কেবল উপভোগ করতেই বলেছেন। ওর সঙ্গে আমি আরও আলোচনা করবো। গেইল ছাড়া ব্রাভোর সঙ্গেও আলোচনা করবো।

বাংলা ট্রিবিউন: শুরুতে সুযোগ পাননি, বরিশাল অনেক বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। হুট করেই সুযোগটা কীভাবে এলো। এর প্রেক্ষাপটটা জানতে চাই…

মুনিম: আমিতো শুরুতে করোনায় আক্রান্ত ছিলাম। করোনা থেকে ফিরে ম্যাচের জন্য ফিট হতে হতে সময় লেগেছে, এই সময়টাতে ছয়টা ম্যাচ চলে যায়। বরিশাল শুরু থেকেই ওপেনিং নিয়ে সমস্যায় ছিল। সবাইকেই আসলে পরখ করে দেখা হচ্ছিল। যেহেতু সুজন স্যার গত প্রিমিয়ার লিগে আমাকে দেখেছে। তাই আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল। উনি আমাকে ডেকে বলেন, ‘তুই ওপেনিংয়ে খেল, ৩/৪ টা ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবি। টেনশন ছাড়া ফ্রিডম নিয়ে খেল।’ প্রথম ম্যাচে চট্টগ্রামের সঙ্গে ব্যর্থ হই। পরের তিন ম্যাচে আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: দলটির কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন, অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, ব্যাটিং পরামর্শক নাজমুল আবেদীন ফাহিম কীভাবে আপনাকে মোটিভেট করেছেন?

মুনিম: ফাহিম স্যার প্রতিনিয়ত ব্যাটিং নিয়ে কাজ করছেন। টেকনিক্যালি কীভাবে আরও ভালো করা যায়, এই ব্যাপারে ফাহিম স্যার আমাকে অনেক হেল্প করছেন। আর সাকিব ভাইয়ের সঙ্গে ম্যাচের আগে খুব বেশি কথা হয় না। তবে উনি আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করছেন ভালো খেলার ব্যাপারে।

বাংলা ট্রিবিউন: সাকিব আপনাকে বিপিএলের সেরা আবিষ্কার বলছেন। তার মতো একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে এমন মন্তব্য নিশ্চয়ই আপনাকে জাতীয় দলের স্বপ্ন দেখাচ্ছে?

মুনিম:  সাকিব ভাইয়ের মতো একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে এমন প্রশংসা পাওয়া আমার জন্য দারুণ ব্যাপার। এখনো নিজেকে এতটা বড় মনে করছি না, ন্যাচারালি খেলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যা অর্জন করেছি এগুলো কিছুই না। আরও অনেক রান করতে হবে। সামনের ম্যাচগুলোতেও যেন ধারাবাহিকভাবে রান করতে পারি, সেই চেষ্টাই করবো। একদিন আমি জাতীয় দলে যেতে চাই। তবে এটাও জানি যে, এই কয়েকটা ভালো ইনিংসে স্বপ্নপূরণ হবে না। বছরের পর বছর এরকম খেলে যেতে হবে। আর সেটাই করতে চাই।

বাংলা ট্রিবিউন:  ইনিংস বড় হচ্ছে না, বাকি ম্যাচগুলোতে নিশ্চয়ই এই লক্ষ্য থাকবে?

মুনিম: ইনিংস বড় হচ্ছে না, এটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নই। আমার কাজটাই হচ্ছে পাওয়ার প্লে-র ঠিকমতো ব্যবহার। ওটা করতে পেরেই খুশি। সামনের ম্যাচগুলোতে এমন সুযোগ আসলে চেষ্টা করবো শেষ করে আসার।

বাংলা ট্রিবিউন: কুড়ি ওভারে ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিগ হিটিং নিয়ে সমস্যা আছে, আপনি কী প্রস্তুত সেই জায়গা নিতে?

মুনিম:  আমি ওই জায়গাতে ফিট কিনা সেটাতো মুখে বললে হবে না। মাঠে খেলেই প্রমাণ করতে হবে। মাঠে যে কয়েকটা ম্যাচ খেলেছি, আমার মতো চেষ্টা করেছি। পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করবে টিম ম্যানেজমেন্ট, আমিতো মূল্যায়ন করতে পারি না। কেবল চেষ্টা করেছি নিজের হিটিং নলেজ কাজে লাগাতে। ভবিষ্যতে কতটা কী করতে পারি, সেটা নিয়েও ভাববো।

বাংলা ট্রিবিউন:  আপনার শক্তির জায়গা কোথায়?

মুনিম: বলের পেস কাজে লাগিয়ে টাইমিংয়ে ওপর ভিত্তি করে গ্যাপ শটগুলো আমার খুব পছন্দের।

বাংলা ট্রিবিউন: যদি আফগানিস্তানের বিপক্ষে সুযোগ পান। মুজিব, রশিদদের খেলতে কতটা আত্মবিশ্বাসী?

মুনিম: সুযোগ আসলে তো আলহামদুলিল্লাহ। নেটে মুজিবকে খুব বেশি খেলা হয়নি। কেননা মুজিব অনুশীলনে খুব বেশি বল করে না। মোটামুটি যতটুকু খেলেছি, খুব বেশি সমস্যা হয়নি। তবে এর মধ্যে আফগান দলের খেলা দেখেছি। ওদের সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা আছে। সবমিলিয়ে বলবো আত্মবিশ্বাস আছে, বাকিটা দেখা যাক।

বাংলা ট্রিবিউন: ফরচুন বরিশাল কী চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে?

মুনিম: মাঠের খেলার ওপর সব নির্ভর করে। খেলোয়াড়রা শতভাগ চেষ্টা করবে শিরোপা জিততে। আমরাও শিরোপা জিততে আত্মবিশ্বাসী। টি-টোয়েন্টি খেলা, এই ফরম্যাটে যে মোমেন্টাম ধরতে পারবে সেই জয়ী হবে।

/এফআইআর/
সম্পর্কিত
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
এলিসের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে সিরিজে সমতা অস্ট্রেলিয়ার
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান