বিপিএলে দারুণ সব শটস খেলে ক্রিকেটপ্রেমীদের বিমোহিত করেছেন মুনিম শাহরিয়ার। যার পুরস্কারটা পেয়েছেন হাতেনাতেই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলে প্রথমবারের মতো ডাক পেয়েছেন। অথচ হতাশায় একসময় ক্রিকেটই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন! পরে বাবার প্রেরণাতেই ২৩ বছর বয়সী তরুণের মাঠে ফিরে আসা। তাই ছেলের সুযোগ প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা বাবা এইচ এম নুরুজ্জামানেরই।
ফরচুন বরিশাল হয়ে মাঠ মাতানো মুনিম সাকিব আল হাসানেরও প্রশংসা আদায় করে নিয়েছিলেন। মুনিমকে বলেছিলেন বিপিএলের সেরা আবিষ্কার। এমন প্রশংসা তার প্রাপ্যই ছিল। ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইলকে পাশে রেখে যেভাবে প্রতিপক্ষের ওপর তাণ্ডব চালিয়েছেন, তা ছিল এক কথায় প্রশংসনীয়। বরিশালের হয়ে ১৫২.১৩ স্ট্রাইক রেটে ৬ ম্যাচে ১৭৮ রান করেছেন। বিপিএলের এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই নজর কাড়ে সবার।
সোমবার সন্ধ্যায় দল ঘোষণার ঠিক আগে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফীসের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফোন পেয়ে যান। যেই ফোনের পর স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলো। সুযোগ পেয়ে মুনিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন সেই মুহূর্তের কথা, ‘মোবাইলের স্ক্রিনে নাফিস ভাইয়ের ফোন নম্বর দেখে মনে হচ্ছিল দারুণ কোনও খবর হয়তো হবে। আলহামদুলিল্লাহ। সন্ধ্যার দিকে উনি আমাকে ফোন দিয়ে বলেছেন, ২৫ তারিখ থেকে অনুশীলন শুরু হবে। তবে কোথায় সেটি বলেননি, সম্ভবত চট্টগ্রামেই হবে।’
করোনায় বিপিএলের শুরুতে কিছু ম্যাচ খেলতে পারেননি। সুস্থ হয়ে ফিরলেও শুরুটা ভালো ছিল না। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই নিজেকে চেনান নতুন করে। দুর্দান্ত আগ্রাসন, নিখুঁত টাইমিং, প্লেসমেন্ট মিলে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক ক্রিকেটার। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে এমন ব্যাটারই খুঁজছিল বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। সুযোগ পেয়ে মুনিম নিজেও ভীষণ খুশি, ‘‘খুব ভালো লাগছে। বিপিএল শেষ হওয়ার আগে আশপাশ থেকে শুনছিলাম, কয়েকজন বলেছিল, ‘তোর সুযোগ হতে পারে।’ আমারও মনে হচ্ছিল, হয়তো হয়েও যেতে পারে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।’’
তবে ক্রিকেটের এই পথটা সহজে আসেনি তার জীবনে। অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে দুই দফা স্ট্যান্ডবাই থাকতে হয়েছে। এরপরও হতাশ হয়ে পড়েননি। তবে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে হুট করেই তাকে হতাশা গ্রাস করেছিল। শেষ পর্যন্ত বাবা-মা, বন্ধুদের প্রেরণা নিয়ে সঠিক পথটা খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই পথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন ও আবাহনী। গত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে ঝড় তুলে আলোতে এসেছিলেন। এরপর বিপিএলের ড্রাফটে তাকে নিয়ে অনেকের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে ড্রাফট থেকেও এই ব্যাটারকে দলে নেয়নি কেউ। ড্রাফটের বাইরে থেকে পরে তাকে দলে নেয় ফরচুন বরিশাল। পরের গল্পতো সবারই জানা।
মুনিম শাহরিয়ারের ক্রিকেট যাত্রার শুরু ময়মনসিংহের নয়াপাড়া থেকে। মেডিকেল কলেজের উল্টো দিকের এই এলাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা একটি বেসরকারি বিমা কোম্পানির চাকরিজীবী ছিলেন। শুরুতে বাবার কাছ থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার প্রেরণাটা পেয়েছেন। তাই বাবাকে নিয়ে অনুশীলন মাঠেও চলে যেতেন। মাঝে হতাশ হওয়ার পর বাবার প্রেরণা নিয়েই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে নেমেছেন। এখন বাবা কতটা খুশি? জবাবে মুনিমের উত্তর, ‘বাবা খুব খুশি হয়েছেন। ফোনে সেভাবে কথা হয়নি। বাসায় গেলে বুঝতে পারবো।’
মাত্র জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও মুনিমের স্বপ্নটা আকাশ সমান। বহু কষ্ট করে দিক খুঁজে পাওয়া এই তরুণ এখন টিকে থাকতে চাইছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তা-ই বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলবো। মাঝে তো অনেক হতাশাজনক সময় পার করেছি। আমার ফিরে আসার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সবাইকে অনেক বেশি ধন্যবাদ। এখন স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছি, যদি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই তাহলে জাগয়াটাকে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ থাকবে। আসলে আর হারিয়ে যেতে চাই না। জায়গাটা ধরে রাখা আরও বেশি কঠিন।’









