৭২১ দিন পর মিরপুরের গ্যালারিতে উন্মাতাল নৃত্য! করোনাকালের ‘ভয়ংকর অভিজ্ঞতা’ কাটিয়ে মিরপুর ফিরেছে তার চেনা ছন্দে। একই দিন ছন্দে ফিরলেন মাহমুদউল্লাহরাও। টি-টোয়েন্টিতে টানা আট ম্যাচ ধরে ছিল না কোনও জয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার আফগানদের হারিয়ে খুলেছে সেই গেরো। এমন জয়ের নায়ক নিশ্চিতভাবেই নাসুম আহমেদ। যাকে নিয়ে গ্যালারিতে হয়েছে উৎসব। মিরপুরে পুরো গ্যালারি-ই ‘নাসুম নাসুম’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
সংক্ষিপ্ত এই ফরম্যাটে ব্যর্থতার শুরু সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে! এরপর ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে হতে হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। অবশ্য ৫০ ওভারের ক্রিকেটের কথা এলে সেখানে ভিন্ন এক বাংলাদেশেরই দেখা মিলেছে। যেমনটা দেখা গেছে আফগানদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও। কিন্তু সবচেয়ে ছোট সংস্করণ এলে ‘জ্বর’ উঠে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। আগের ইতিহাস অন্তত তাই বলে। তবে বুধবার কোনও ভুল করেনি লিটন-আফিফরা। ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সবখানেই সেরাটা দিয়ে ৬১ রানের বিশাল জয় তুলে নিয়েছে। এই জয় আবার টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর বিপক্ষে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের নজিরও। তার আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাপুয়া নিউ গিনিকে ৮৪ রানে এবং ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ডকে ৭১ রানে হারানোর রেকর্ড আছে।
অথচ এমন দাপুটে জয়ের দিন শুরুটাই হয়েছে চোটের খবরে। ইনজুরির কারণে প্রথম ম্যাচের আগে ছিটকে যান মুশফিকুর রহিম। যা কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তার সাগরে ডুবিয়েছিল স্বাগতিকদের। কারণ, অভিজ্ঞ দুই ব্যাটার মাহমুদউল্লাহ ও সাকিবের ব্যাটে নেই রান। এমন প্রতিকূল অবস্থায় ওয়ানডের মতোই দিশা দেখালেন লিটন। যার ভয়-ডরহীন ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ আফগানদের ওপর চড়ে বসতে পেরেছে ১৫৫ রান তুলে। বাকি কাজটুকু সুন্দরভাবে শেষ করেছেন বোলাররা। বিশেষ করে ম্যাচ সেরার পুরস্কার পাওয়া নাসুম আহমেদ তো ছিলেন দুর্দান্ত।
আফগানদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। একমাত্র লিটন ছাড়া কেউই ভালো ফর্মে নেই। তাই অস্বস্তি নিয়েই ব্যাটিংয়ে নামতে হয় মাহমুদউল্লাহর দলকে। বিপিএলে দারুণ করা মুনিম শাহরিয়ারের অভিষেক হয়েছে এই ম্যাচে। পাশাপাশি বিপিএলে চরম ব্যর্থ নাঈম শেখও ছিলেন তার ওপেনিং পার্টনার। নিজের অভিষিক্ত ম্যাচে মুনিম শুরুটা ভালো করলেও ইনিংসটাকে বড় করতে পারেননি। ১৮ বলে ১৭ রান করে আউট হয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচকদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠা নাঈম ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন শুরুতে। ৫ বলে ২ রান করে ফজল হক ফারুকির শিকারে পরিণত হন তিনি। এরপর সাকিব-মাহমুদউল্লাহও ব্যর্থ হলে বাজে কিছুই চোখ রাঙাচ্ছিল। কিন্তু সেই শঙ্কা দূর হয় ইনফর্ম ব্যাটার লিটনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে। তার দুর্দান্ত হাফসেঞ্চুরিতে ১৫৫ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। ৪৪ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় লিটন ৬০ রানের ইনিংস খেলেছেন।
শেষ দিকে অবশ্য ফারুকির স্লোয়ারে পরাস্ত হওয়াতেই থেমে যেতে হয় তাকে। এরপর আফিফের ২৪ বলে ২৫ রানের ইনিংসও সমৃদ্ধ করে স্কোরবোর্ড।
লিটনের ইনিংসটি মূল হাইলাইটস হলেও বাংলাদেশের ইনিংসে আজ খুব বেশি চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছোটেনি। মাত্র ১১টি চার ও ৩টি ছক্কা এসেছে পুরো ইনিংসে। ব্যাটসম্যানরা রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে-ই ভরসা রেখেছিল। যে কৌশলে চাপ বাড়ে রশিদ খানদের।
যার প্রভাবটা টের পাওয়া যায় আফগানদের ইনিংসেও। জাজাই-গুরবাজরা ব্যাট হাতে নামতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছেন নাসুম। বাঁহাতি এই স্পিনারের শুরুর ধাক্কাতে আফগান ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ডটাই ভেঙে গেছে। ৪ ওভারে মাত্র ১০ রানে ৪ উইকেট তুলে নেন বামহাতি স্পিনার। যার টানা ২৪ বলের স্পেলে ডট ছিল ১৭টি! অবশ্য প্রথমবারের মতো ৫ উইকেটের স্বাদও পেয়ে যেতে পারতেন তিনি। পাঁচের আনন্দে পুষ্পা ড্যান্সও করেছিলেন। মোহাম্মদ নবীকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেললেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান আফগান অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত ১৪ বল আগে সবকটি উইকেট হারিয়ে আফগানিস্তান করতে পারে ৯৪ রান।
নবীদের ৭২ রানে অলআউটের রেকর্ডও আছে বাংলাদেশের। সেটা অবশ্য ২০১৪ সালে। এরপর তাদের খেলার ধরণ পাল্টে গেছে পুরোটাই। নিজেদের দিনে তারা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। সেজন্যই ভয় ছিল বাংলাদেশ শিবিরে। কিন্তু মাঠে মাহমুদউল্লাহর দল স্রেফ উড়িয়ে দিলো নবী-রশিদদের।








