ক্রিকেটকে কেন গৌরবময় অনিশ্চয়তায় খেলা বলা হয়, সেটির বড় প্রমাণ মিললো আবার। নিশ্চিত হার যেখানে নিয়তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল, সেই ম্যাচ অবিশ্বাস্যভাবে শেষ হলো ড্রতে। প্রায় দুই দিন ব্যাট করে ১৭২ ওভার পার করে ঐতিহাসিক এক টেস্টের জন্ম দিলো পাকিস্তান। বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের অসাধারণ সেঞ্চুরিতে করাচি টেস্টে জয়ের সমান ড্র পেয়েছে স্বাগতিকরা। সমান্তরালে অস্ট্রেলিয়া দল ছেয়ে গেছে হতাশায়।
প্রথম ইনিংসে রানের পাহাড় গড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। বোলিংয়েও উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পাকিস্তানকে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৪৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয় দেখছিল সফরকারীরা। যদিও পাকিস্তানকে ফলোঅন না করিয়ে নিজেরা নেমেছিল দ্বিতীয় ইনিংসে। ২ উইকেটে ৯৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করলে বাবরদের লক্ষ্য ঠিক হয় ৫০৬ রান। কঠিন এই লক্ষ্যে পৌঁছানো একরকম অসম্ভবই ছিল। ড্র যে করবে, সেখানেও ছিল কঠিন পথ। খেলতে হবে ১৭২ ওভার! বাবররা সেই কঠিন পথটাই পাড়ি দিলো অসাধারণ দক্ষতায়।
চতুর্থ দিন পাকিস্তান ব্যাট করেছে ৮২ ওভার। আর শেষ দিনে খেলেছে ৮৯.৪ ওভার। বাকি ২ বল আর খেলেনি, ড্র মেনে নেয় দুই দল। দীর্ঘ ১৭১.৪ ওভার খেলে পাকিস্তান করেছে ৪৪৩ রান। আগের দিন সেঞ্চুরি পাওয়া বাবর দেখালেন তিনি কোন জাতের ব্যাটার। করাচি টেস্টের মহাকাব্য তিনি যেভাবে লিখলেন, তাতে শুধু পাকিস্তান নয়, ক্রিকেট ইতিহাসই তাকে মনে রাখবে বিশেষভাবে। ১০ ঘণ্টা ক্রিজে পড়ে থেকে ৪২৫ বল খেলে করেছেন ১৯৬ রান। একটুর জন্য ডাবল সেঞ্চুরি মিস করা পাকিস্তান অধিনায়ক মেরেছেন ২১ চার ও ১ বাউন্ডারি।
তার বিদায়ের পর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে ড্র করেই মাঠ ছেড়েছেন রিজওয়ান। ১৭৭ বলে ১১ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ছিলেন ১০৪ রানে। ১১ চার ও ১ ছক্কায় সাজানো তার ইনিংসও ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।
বাবর-রিজওয়ানের সঙ্গে আরেকজনের নাম বলতে হবে আলাদাভাবে। সেঞ্চুরি পাননি, তবে ঐতিহাসিক এই ড্রয়ে তার অবদান কোনও অংশে কম নয়। তিনি ওপেনার আব্দুল্লাহ শফিক। রান করেছেন ৯৬, তবে সেটা বড় কথা নয়, ড্র করার পথে তিনি খেলেছেন ৩০৫ বল। ক্রিজে টিকে ছিলেন ৪৬৫ মিনিট। শেষ দিকে নুমান আলীকেও বাদ দেওয়া যাবে না। রানের খাতা খোলেননি তিনি, তবে খেলেছেন গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি বল।
যে টেস্ট ধরেই নেওয়া হয়েছিল জিততে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, দুই দিন ব্যাট করে সেটির ফলাফল অন্যভাবে লিখলো পাকিস্তান। চতুর্থ ইনিংসে, তাও আবার চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে বাবর-রিজওয়ান-আব্দুল্লাহ যেভাবে ব্যাট করেছেন, ক্রিকেট বিশ্বের প্রশংসার দাবিদার তারা অবশ্যই!
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাকিস্তানের ব্যাটারদের সামনে হার মানতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। শেষ দিকে বাবরের পরপরই ফাহিম আশরাফ দ্রুত বিদায় নিলে তাদের আশা কিছুটা হলেও জেগেছিল। সাজিদ খানও বেশিক্ষণ টিকতে না পারলে জয়ের স্বপ্ন আবারও উঁকি দিয়েছিল অজিদের মনে। কিন্তু সফল হতে পারেনি। নাথান লায়ন ৫৫ ওভার বল করে ১১২ রান দিয়ে পেয়েছেন ৪ উইকেট। আর ২ উইকেট শিকার প্যাট কামিন্সের।
মহাকাব্যিক এই টেস্টে ইতিহাস লেখা বাবরের হাতেই যে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুই দলের লড়াই কিন্তু শেষ হয়নি। তৃতীয় টেস্ট তো এখনও বাকি। প্রথম দুই টেস্ট ড্রতে শেষ হওয়ায় লাহোরের শেষ টেস্টেই নির্ধারণ হবে সিরিজ যাচ্ছে কার ঘরে!









