চট্টগ্রামে চলছে তীব্র তাপদাহ। পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণও বেশি। এমন কঠিন কন্ডিশনে ৯ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ব্যাটিং করেছেন লঙ্কান ব্যাটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ। অন্য প্রান্তের ব্যাটাররা একে একে ব্যর্থ হলেও ম্যাথুজ ছিলেন লঙ্কান লড়াকু এক বীর! দলের সবাই যখন লড়াই করতে করেত ক্লান্ত, তিনি তখন একাই দুর্গ রক্ষা করার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিলেন। শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব ঠিকমতোই পালন করে গেছেন তিনি। কিন্তু এমন বীরত্বের পর দুঃখ নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাকে। নাঈমের ঘূর্ণিতে ১৯৯ রানে আউট হয়ে যাওয়ায় একরাশ হতাশা নিয়ে ড্রেসিং রুমে ফিরেছেন। অপর দিকে তাকে হতাশায় ডুবিয়ে ঘরের মাঠে আনন্দে মাতলেন অফস্পিনার নাঈম হাসান।
লঙ্কান অলরাউন্ডার অবশ্য একা নন। সাগরিকায় বিশ্বের ১৪তম ব্যাটার হিসেবে ১৯৯ রানে আউট হয়েছেন। নাঈমের বল অনসাইডে খেলে ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ব্যাটে-বলে পারফেক্ট সংযোগ না ঘটায় বলটি চলে যায় স্কয়ার লেগে দাঁড়ানো সাকিব আল হাসানের হাতে। আর তাতেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি বঞ্চিত হন লঙ্কান সাবেক এই অধিনায়ক।
এদিন সাগরিকায় রোদ গায়ে মেখে সব আলো নিজের করে নেন নাঈম। তার ঘূর্ণি জাদুতে প্রত্যাশিত রানেই আটকে রাখা গেছে লঙ্কানদের। প্রথম দিন দুই উইকেটের পর সোমবার দ্বিতীয় দিনে তুলে নেন চারটি উইকেট। সব মিলিয়ে ৩০ ওভারে ১০৫ রান খরচ করে তার শিকার ছিল ৬ উইকেট। ক্যারিয়ারে এর আগে দুইবার ৫ উইকেট নিলেও এবারই প্রথম নিলেন ৬ উইকেট।
অথচ নাঈম খেলার মধ্যেই ছিলেন না অনেক দিন। ১৫ মাস আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছিলেন। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে দুই টেস্টে চেনা নাঈমকে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৫০ ওভার করে ৫ উইকেট নিলেও বেশ খরুচে ছিলেন তিনি। তার এলোমেলো বোলিংয়ের সুযোগ নিয়েই কাইল মায়ার্স ২১০ রানের ইনিংস খেলে দলকে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দিয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরে প্রথম ইনিংসেও নাঈম এলোমেলো ছিলেন। ২৪ ওভার বোলিং করে পাননি কোনও উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য তুলে নেন তিন উইকেট। ওই টেস্টের পরই দল থেকে বাদ পড়েন এই অফস্পিনার। শুধু দল নয়, বাদ পড়েন কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকেও।
এরপর বাংলাদেশ দল আরও ৯টি টেস্ট খেললেও তার কোনোটিতেই ছিলেন না তিনি। মিরাজের ইনজুরিতেই মূলত তাকে দলে ভিড়ানো হয়। যার সুযোগটা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগালেন এই অফস্পিনার। রবিবার ওপেনার দিমুথ করুণারত্নেকে (৯) দ্রুতই ফেরান তিনি। অষ্টম ওভারে প্রেসবক্স প্রান্ত থেকে বোলিং শুরু করেছিলেন। প্রথম ওভারে তুলে নেন মেডেন উইকেট।
দ্বিতীয় উইকেটে ওশাডা ফার্নান্ডো ও কুশল মেন্ডিস মিলে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিলেন। সেই চাপে পিষ্ট হওয়ার আগেই নাঈমের দ্বিতীয় শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন ফার্নান্ডো (৩৬)। তারপর আগের দিনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে সোমবার দারুণ খেলছিলেন ম্যাথুজ-চান্ডিমাল। লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার কয়েক ওভার আগে ম্যাথুজ ও চান্ডিমালের গড়া ১৩৬ রানের জুটি ভাঙেন সেই নাঈম। ভুল সময়ে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউর শিকার হন তিনি। তিন বলের ব্যবধানে নিরোশান দিকবেলাও ক্লিন বোল্ড হলে বিপদে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা।
তবে লঙ্কান ব্যাটারদের বিপক্ষে কমবেশি প্রভাব বিস্তার করা গেলেও ম্যাথুজের বিপক্ষে সবাই ব্যর্থ হচ্ছিলেন। টেল এন্ডারদের নিয়ে ডাবল সেঞ্চুরির পথেই ছিলেন লঙ্কান সাবেক অধিনায়ক। যদিও কয়েকবার সুযোগ এসেছিল ম্যাথুজকে ফেরানোর। সোমবার শ্রীলঙ্কার ইনিংসের ৯৪তম ওভারের পঞ্চম ডেলিভারিটি গুড লেন্থে করেন খালেদ। বুক সমান ডেলিভারিতে ব্যাট চালিয়ে টাইমিং করতে পারেননি তিনি। বল গিয়ে জমা হয় উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে। কেউই বুঝতে পারেননি বল যে ব্যাট ছুঁয়ে কিপারের হাতে পৌঁছেছে। প্রথম দিনেও সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন এই ব্যাটার। ৬৯ রানে তাইজুলের বলে ক্যাচ তুললেও স্লিপে দাঁড়ানো মাহমুদুল হাসান জয় তা নিতে পারেননি। তারপর এই জীবনগুলো পেয়েই ম্যাথুজ খেললেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেরা ইনিংস। ৩৯৭ বলে ১৯ চার ও ১ ছক্কায় লঙ্কান অলরাউন্ডার নিজের ইনিংসটি সাজিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নাঈমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে অভিজ্ঞ ব্যাটারকে।
তাতে ম্যাথুজ এক রানের জন্য আক্ষেপে পুড়তে থাকলেও বন্দরনগরীতে জন্ম নেওয়া নাঈম নিজ শহরে এসে দর্শকদের আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছেন।









