টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে টানা ব্যর্থতায় এশিয়া কাপের ঠিক আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে উড়িয়ে আনা হয় শ্রীধরন শ্রীরামকে। চলমান বিশ্বকাপের আগে প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোকে একপ্রকার ‘ওএসডি’ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)! ঠিক প্রধান কোচ না হলেও শ্রীরামের দায়িত্ব প্রায় একই। নিয়োগে পদ দেওয়া হয়- টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট। তো তার অধীনে এশিয়া কাপ ও নিউজিল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজে সাফল্য না এলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই ম্যাচেই জিতেছে বাংলাদেশ। এই সময়টাতে তার ‘ইনটেন্ট’ ও ‘ইমপ্যাক্ট’ নিয়ে বেশ চর্চা হচ্ছিল। শেষমেষ শ্রীরামের অধীনে বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য পেয়ে যায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। বিশ্বকাপ শেষে, তার মেয়াদ শেষ হতেই, আবারও আলোচনায় ভারতীয় কোচ। তাকে কি দীর্ঘমেয়াদে নিয়োগ দিচ্ছে বিসিবি?
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দলের পারফরম্যান্সে উন্নতির ছোঁয়া লাগিয়ে দেওয়া শ্রীরামের মেয়াদ শেষ হয়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে বদল আনতে শ্রীরাম ‘ইনটেন্ট’ ও ‘ইমপ্যাক্টে’ নিয়ে কাজ করেছেন। এই সময় ‘মেকশিফট’ ওপেনার হিসেবে মেহেদী হাসান মিরাজ ও সাব্বির রহমানের কাছ থেকে ইমপ্যাক্ট পারফরম্যান্স বের করার চেষ্টা করেন শ্রীরাম। যদিও এক্ষেত্রে খুব একটা সফল হননি তিনি। তবে দুই মাসের মধ্যে কিছুটা হলেও তার শিষ্যরা ইনটেন্ট ও ইমপ্যাক্টের সমন্বয় করতে পেরেছেন। যার সুফল পাওয়া শুরু করেছে গোটা দল। পুরো সময়টাতে ফলাফল পক্ষে না এলেও শ্রীরামের এই ইনটেন্ট-ইমপ্যাক্ট হয়তো ভবিষ্যতে বড় সাফল্য এনে দেবে।
শ্রীরামের সাফল্যের পরও দীর্ঘমেয়াদে তাকে সাকিব-লিটনদের কোচ হিসেবে দেখা যাবে কিনা সেটি নিয়ে আছে ধূম্রজাল। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান জালাল ইউনুসের অবশ্য শ্রীরামকে বেশ মনে ধরেছে। তবুও শ্রীরাম যে দীর্ঘমেয়াদে সাকিবদের কোচ হবেন- এ ব্যাপারে কোনও গ্যারান্টি নেই! কেননা তার দীর্ঘমেয়াদে কোচ হওয়ার সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। সব বিষয়ে বোর্ড পরিচালকরা একমত হলেই কেবল ভারতীয় এই কোচকে দেখা যাবে বাংলাদেশের ডাগআউটে। এমনটাই বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস।
প্রথমত, বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীরামের দীর্ঘমেয়াদে সম্পৃক্ত হওয়ার পথে বাধা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হলেও শ্রীরামকে আইপিএলের সময় ছেড়ে দিতে হবে। কেননা অস্ট্রেলিয়ার স্পিন বোলিং কোচের দায়িত্ব সামলানো শ্রীরাম রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুরের পদটা ঠিকঠাকভাবে সামলাতেই দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। এরপর আসেন বাংলাদেশে। ভারতীয় এই কোচের এমন সিদ্ধান্তেই বোঝা যাচ্ছে তার কাছে আইপিএলের গুরুত্ব কতখানি। এই অবস্থায় বিসিবির সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করা হলে নিশ্চিতভাবেই আইপিএলের বিষয়টি সামনে আসবে। কেননা বিশাল অঙ্কের টাকা ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশের কোচের ভূমিকাতে থাকতে চাইবেন না শ্রীরাম!
পুরনো ইতহাস অবশ্য বলছে, শ্রীরামের এমন সুযোগের সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণই। একমাত্র জাতীয় দলের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখরনের বাংলাদেশ দলের দায়িত্বের পাশাপাশি আইপিএলে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। বিসিবি শ্রীনিবাসকে ছাড়া কাউকেই এমন সুযোগ দেয়নি। এই যেমন, আইপিএলে কাজ করার অনুমতি না পেয়ে বাংলাদেশের চাকরি ছেড়েছিলেন মারিও ভিল্লাভারায়েন। শ্রীরামের ব্যাপারে বিসিবি নমনীয় হয় কিনা, সেটাই দেখার। জালাল ইউনুস অবশ্য শ্রীরাম ইস্যুতে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি, ‘সেকেন্ডারি আলোচনা আগে কেন? আইপিএল, পারিশ্রমিক এগুলো তো পরের ব্যাপার। প্রথম তো আমাদের শ্রীরামের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কবে, কতদিনের জন্য তাকে আমরা চুক্তিবদ্ধ করবো; আদৌ করবো কিনা! আর আইপিএলের কথা বললেন, সেটা তো অনেকেই করছে। তবে সেটা আমাদের খেলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে ওখানে (আইপিএল) সুযোগ নেই। কিন্তু এসব পরের আলোচনা।’
আরও একটি কারণে শ্রীরামের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে ভীষণ ভাবতে হচ্ছে বিসিবিকে। বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, ভারতীয় এই কোচের সোজাসাপ্টা কথা-বার্তায় কিছুটা বিরক্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ সংস্থা! এমনকি টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজনকে চার্জ করার বিষয়টি পরিচালকরা ভালোভাবে নেয়নি বলে জানা গেছে। এই কারণে শ্রীরামের ভালো পারফরম্যান্স স্বত্ত্বেও তাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে! জালাল ইউনুসের কূটনৈতিক উত্তর, ‘দেরি কোথায়? তাকে তো আমাদের দীর্ঘমেয়াদী কোচ হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। কোন সময়, কোন সিরিজ, কোন ফরম্যাট নাকি সব ফরম্যাটে তাকে পাবো- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আমাদের তো অলরেডি রাসেল ডমিঙ্গো আছেন, যিনি এখানে কাজ করছেন। আমরা কীভাবে এগোবো, আগে তো সেগুলো ঠিক করবো। তারপর না আইপিএল কিংবা অন্য ইস্যুগুলো আসবে। হুট করেই বলে দিলাম, শ্রীরাম কোচ; আর কোচ হয়ে যাবে, সেটা কিন্তু না। এটা কিন্তু সহজ না।’
এদিকে অধিনায়ক সাকিব আল হাসানসহ দলের ক্রিকেটাররা শ্রীরামকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ক্রিকেটাররা। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সবুজ সংকেতের ওপর। তার আগে অবশ্য ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলো। ক্রিকেটারদের মতো জালাল ইউনুসও ভীষণ খুশি শ্রীরামের পারফরম্যান্সে, ‘সে তার (শ্রীরাম) কাজটা খুব ভালোভাবে করেছে। আমি তো তার সঙ্গেই ছিলাম, টিম মিটিংয়ে ছিলাম। খুব কাছ থেকে তার কাজ দেখেছি। সে দারুণ মোটিভেটর। একটা দলকে যেভাবে মোটিভেট করতে হয়, ঠিক সেভাবেই সে মোটিভেট করেছে। আমি মনে করি, একজন মোটিভেটর হিসেবে শ্রীরাম অসাধারণ। সবকিছুই আমি সামনে থেকে দেখেছি। এটা তো আমার একার সিদ্ধান্ত না, এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত।’









