বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এক আশ্চর্য মেঘদল। কখনও তা গাল ফোলানো অভিমানী বিষণ্নতা। কখনও বা রোদ্দুরছোঁঁয়া সোনালি আলোকচ্ছটা। ২০২৩ বিশ্বকাপে কোন বাংলাদেশকে দেখা যাবে? বিশ্বকাপের সময় যত এগিয়ে আসছে, প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে ততই। কারণ ক্রিকেটের অনিশ্চিত চরিত্রের মতোই অননুমেয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। সময়ের ঘড়িতে তাই ভয়-সংশয়-আতঙ্কের কাঁটা। আবার আশা-সাহস-স্বপ্নেরও তুমুল ঘণ্টা। প্রত্যাশার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোই যে দায়!
ভাবুন না, মাস কয়েক আগেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে আপনি কী ভাবতেন? দলটা বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব উতরেও গেছে দাপটের সঙ্গে। সেখানে পয়েন্ট টেবিলে তিন নম্বরে থেকে শেষ করা যেনতেন অর্জন নয়! ঘরের মাঠে ভারত বলুন কিংবা বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে সিরিজ হারানো। অভিজ্ঞ ক্রিকেটযোদ্ধাদের ব্যাট-বলে ঝংকার। তরুণরাও জানাচ্ছেন সামর্থ্যের নিনাদ।
এমন দলকে নিয়ে আপনি স্বপ্ন দেখবেন না কেন? এমন দলকে নিয়ে প্রতিপক্ষ দলগুলো বিশ্বকাপ সমীকরণের আলাদা ক্লাস করবে না কেন? অথচ বিশ্বকাপ আসতে আসতে সে দলটির কী হতশ্রী চেহারা! মোটা দাগে। ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল রাগ-ক্ষোভ-অভিমানে খেলা ছেড়ে দেন। পরে সে সিদ্ধান্ত পাল্টালেও ক্যাপ্টেন্সিতে আর থাকেন না। আড়াই বছর ধরে একটু একটু করে যে বিশ্বকাপ স্বপ্নের সৌধ গড়ে তোলেন, টুর্নামেন্টের আড়াই মাসেরও কম বাকি থাকতে তা বিসর্জন দেন তামিম।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সুখী পরিবারের ছবিটা হঠাৎই বদলে যায়। যার অবধারিত প্রভাব পারফরম্যান্সেও। আফগানিস্তানের কাছে সিরিজ হার। এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচে হোঁচট। সুপার ফোরে গেলেও সেখানে প্রথম দুই খেলায় হেরে ফাইনালের সম্ভাবনা থেকে ছিটকে যাওয়া। এ পর্যন্ত হলেও হতো। প্রত্যাশার প্রদীপের সলতে পুড়ে যাচ্ছে, সেটা আর কত আলোই বা দেবে! কিন্তু ওই যে, অননুমেয় বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের শেষ ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে আবার উসকে দেয় আশার সলতে। বিশ্বকাপের আগে তাই আবারও স্বপ্নের আবেশের ছোঁয়া আবেগের এই মানচিত্রে। স্বপ্নের আকাশ কতটা বিশাল?সেমিফাইনাল পর্যন্ত? নাকি একেবারে শিরোপা?
শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে যে দলগুলো বিশ্বকাপে যাচ্ছে, তাদেরও প্রাথমিক লক্ষ্য সেমিফাইনাল। এবং অবশ্যই এটা বলা যায় যে সেজন্য সেই দলগুলোর প্রস্তুতি বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। অন্তত চারটি দল কি নেই, যাদের ট্রফির দাবি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি? মরুভূমির উটের মতো বালুতে মুখ গুঁজে থাকতে পারেন, তবে তাতে এই প্রশ্নের উত্তরটা পাল্টাবে না। তাই বলে কি বাংলাদেশের সম্ভাবনা নেই? অবশ্যই আছে। কাগজ-কলমের হিসাব তো মাঠের ক্রিকেটে বদলে যায় কত! সাকিব আল হাসানের দল তাই সেটা পারবে না কেন! পারবে না প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারাতে? যাদের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বশেষ দুই ওয়ানডে ও দুই টি-টোয়েন্টি জয়ের আত্মবিশ্বাস আছে! পারবে না চেন্নাইয়ের স্পিন সহায়ক উইকেটে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে? নেদারল্যান্ডসের কথা তো আর আলাদা আলোচনার দাবিই রাখে না। শ্রীলঙ্কার কাছে এশিয়া কাপের দুই ম্যাচ হারলেও বিশ্বকাপে লঙ্কা-জয় কি অসম্ভব? কিংবা ধরেন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো গেলে ভারতের মাটিতে নয় কেন?
আর উপমহাদেশের দুই পরাশক্তি ভারত-পাকিস্তান এবং বিশ্বকাপের অন্যতম দুই ফেভারিট ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া? ধারে-ভারে, শক্তি-সামর্থ্যে ওই চতুষ্টয় হয়তো এগিয়ে। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটে, নির্দিষ্ট দিনের পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের কাছে অজেয় নয় কেউই। তাহলে? প্রাথমিক লক্ষ্য সেমিফাইনালের স্বপ্নপূরণ বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। খুবই সম্ভব। সে লক্ষ্য ছোঁয়া গেলে আকাশ স্পর্শ তো কেবল দুই ম্যাচের ব্যাপার, নাকি! এবং বাংলাদেশের সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে দুজনের কাছে। ক্যাপ্টেন সাকিব আল হাসান। কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে।
মাঠের ক্রিকেটে অবশ্যই ১১ জন খেলবেন। খেলার ছক কষবেন প্রধান কোচসহ অনেকে মিলে। তারপরও ওই দুই জনের কথা আলাদা করে বলা কেন? কোচ হাথুরুসিংহের কথাই ধরুন। জাতীয় দল পরিচালিত হয় তাঁর ইশারাতেই। আগের দফায় হতো; এবার আরও বেশি করে। সে লাইসেন্স নিয়েই পুরনো পদে নতুন করে ফিরেছেন। সেটা দল নির্বাচন বলুন অথবা এই যে ক্যাপ্টেন্সির পরিবর্তন। নেপথ্যে মূল ভূমিকা এই লঙ্কানের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ হলে হাথুরুর ব্যাপারে বিসিবির মোহভঙ্গ হওয়ার ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্বমঞ্চে ক্ষুরধার ক্রিকেটমস্তিষ্ক প্রমাণ তাই তাকে দিতেই হবে।
আর সাকিব তো অধিনায়ক। দলের সেরা পারফরমারও। যার কাছ থেকে ওয়ানডে ক্যাপ্টেন্সি নিয়েছেন, সেই তামিমের সঙ্গে তার সম্পর্কের শীতলতা আর গোপন কিছু নয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের হতচ্ছাড়া পারফরম্যান্সও স্পষ্ট। পাশাপাশি আবহসংগীতের মতো বেজে চলবে ২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিবের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স। এরপর বছর চারেক পেরিয়ে গেলেও অলরাউন্ডারের ব্যাট-বলের দিকে আগের মতোই তাকিয়ে থাকবে দল।
সাকিব-হাথুরুর যুগলবন্দিতেই তাই আঁকা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন। কতটা একাট্টা দলকে তারা করতে পারেন, কতটা সেরা বের করতে পারেন ক্রিকেটারদের কাছ থেকে, সেটাই এখন তাদের চ্যালেঞ্জ। আর মাঠের বাইরে গলা ফাটানোর জন্য ১৭/১৮ কোটি ক্রিকেটপাগল তো রয়েছেনই।
এর আগে ছয়টি ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছে বাংলাদেশ। প্রথম তিন আসরে প্রত্যাশা তেমন ছিল না। পরের তিন আসরে তা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। প্রাপ্তির খেরোখাতাটায় তবু শূন্যতার হাহাকার। ইতিহাসের সেই আকাশে উড়ে বেড়ায় কেবলই বিষণ্নতার মেঘমালা।
এবার কি তা চিকমিকিয়ে উঠবে সোনালি সাফল্যের রোদ্দুরের স্পর্শে? অনেক কান্নার বৃষ্টির পর চকচকে আকাশে উঠবে স্বপ্নের রঙধনু? হ্যাঁ, অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আছে অনেক চ্যালেঞ্জ। অনেক প্রশ্ন। কিন্তু পাশাপাশি সেই প্রশ্নের অনুরণনও তো আছে– এই বিশ্বকাপে না হলে আর কবে!
লেখক: ক্রীড়া সাংবাদিক









