ধর্মাশালা, চেন্নাই, পুনে কোথাও ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে ক্লিক করতে পারছিল না বাংলাদেশ। প্রত্যাশা করা হচ্ছিল ভারতের অন্যতম ব্যাটিংবান্ধব উইকেট মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ব্যাট হাতে ঝড় তুলতে পারবেন লিটন-শান্ত-মুশফিকরা। কিন্তু পারলেন না তারা। দক্ষিণ আফ্রিকার করা ৩৮২ রানের চাপে পিষ্ট হয়ে ২২৩ রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটারদের ব্যর্থতার দিনে একাই লড়াই করে গেছেন মাহমুদউল্লাহ। তার দারুণ সেঞ্চুরির পরও বাংলাদেশ হেরেছে ১৪৯ রানের বড় ব্যবধানে।
মুম্বাইয়ের ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রত্যাশিতভাবেই তিনশ ছাড়ানো স্কোর গড়েছে। টস হেরে ফিল্ডিং করতে নেমে বাংলাদেশের বোলাররা ডেথ ওভারের আগপর্যন্ত প্রোটিয়া ব্যাটারদের আটকে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ দশ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকা তুলে নেয় ১৪৪ রান। আর তাতেই বাংলাদেশকে ৩৮৩ রানের বিশাল লক্ষ্য দিতে পারে দলটি। কঠিন এই লক্ষ্যে খেলতে নেমে মুম্বাইয়ের উইকেটে ভালো ব্যাটিং আশা করছিলেন বাংলাদেশের সমর্থকরা। কিন্তু তাদের হতাশ হতে হয়েছে।
প্রোটিয়া বোলাদের সামনে দুমড়ে মুচড়ে গেলো বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটিং লাইনআপ। কেবলমাত্র মাহমুদউল্লাহ খেলেছেন লড়াকু এক ইনিংস। কিন্তু এমন বড় রান তাড়া করতে নেমে তার একার লড়াই যথেষ্ট হওয়ার কথাও নয়। টপ অর্ডার ব্যাটারদের আশা যাওয়ার মিছিলে মাহমুদউল্লাহ ছিলেন লড়াকু কোনও সৈনিক। তাকে আউট করতে প্রোটিয়া বোলারদের রীতিমতো ঘাম ঝরেছে। শেষ পর্যন্ত ১১১ রানে তাকে থামাতে পেরেছেন প্রোটিয়া পেসার জেরাল্ড কোয়েটজে।
মাঠ, কন্ডিশনের সঙ্গে প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বিবেচনা করে এমনিতেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাড়তি বোলার নিয়ে মাঠে নামতে হয়েছে লাল-সবুজ জার্সিধারীদের। এই কারণে তাওহীদ হৃদয়কে বাদ দিয়ে নাসুম আহমেদকে রাখা হয় স্কোয়াডে। কিন্তু তাতে অবশ্য খুব লাভ হয়নি, প্রতিপক্ষ ঠিকই রানের পাহাড় গড়েছে। একজন ব্যাটার কম নিয়ে ৩৮৩ রানের জবাবে খেলতে নেমে প্রোটিয়া দুই পেসার মার্কো ইয়ানসেন ও লিজাড উইলিয়ামসের বোলিংয়ে অস্বস্তিতে ভোগে বাংলাদেশ। দুই ওপেনার লিটন দাস ও তানজিদ তামিম ভালো শুরু এনে দিতে পারেননি।
ইনিংসের সপ্তম ওভারের প্রথম বলেই জুনিয়র তামিমকে (১২) ফেরানোর পর নাজমুল হোসেন শান্তকে ডাক উপহার দেন ইয়ানসেন। প্রোটিয়া পেসারকে হ্যাটট্রিকবঞ্চিত করেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। যদিও ৬ বলের ব্যবধানে দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে আউট হন তিনিও। এরপর ব্যাটিং অর্ডারে সামনের দিকে সুযোগ পাওয়া মুশফিকও ভালো শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে দ্রুত ফিরে গেছেন। দলীয় ৪২ রানে কোয়েটজের বলে বদলি ফিল্ডার ফেলুকোয়ায়োকে ক্যাচ দিয়ে ১৭ বলে ৮ রান করে বিদায় নেন মুশফিক। তখনও ক্রিজে লিটন। ড্রেসিং ব্যাটার লিটন ক্রিজে থাকায় ভক্তরা তবুও কিছু আশা করছিলেন। কিন্তু তিনিও হতাশ করলেন। পুরো সময়টাতে অস্বস্তি নিয়ে ব্যাটিং করে পঞ্চম ব্যাটার হিসেবে যখন আউট হলেন, তখন তার রান ২২।
৫৮ রানে টপ অর্ডারের ৫ ব্যাটারকে হারিয়ে কোণঠাসা বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপে সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার শঙ্কায়! যদিও মাহমুদউল্লাহর দৃঢ়তায় সেই লজ্জা পেতে হয়নি। প্রোটিয়া বোলারদের রীতিমতো তুলোধুনো করে হারের ব্যবধান কমিয়েছেন তিনি। তার ১১১ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ২৩৩ রান সংগ্রহ করতে পারে।
বাংলাদেশের এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ের আগে মুম্বাইয়ের ২২ গজ রং তুলিতে রাঙিয়েছিলেন কুইন্টন ডি কক, হাইনরিখ ক্লাসেন ও এইডেন মারক্রামরা। তাদের দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ের পর বাংলাদেশের এমন দৃষ্টিকটু ব্যাটিং বেশ কষ্টই দিয়েছে ক্রিকেট ভক্তদের। শুরুতে অবশ্য এমন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে পারেনি প্রোটিয়ারা। প্রথম দশ ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই উইকেট তুলে নিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছিল বাংলাদেশ।
তবে শুরুর সাফল্য ম্লান হতে বেশি সময় লাগেনি। কারণ উইকেটে ছিলেন অভিজ্ঞ ওপেনার ডি কক। নিজের শেষ বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতে দারুণ সব কীর্তি গড়ে চলছেন প্রোটিয়া এই ব্যাটার। এই বিশ্বকাপের আগের আসরগুলোতে মোট ১৭ ইনিংস খেলে তার কোনও সেঞ্চুরি ছিলো না। ১৭ ইনিংসে তার রান ছিল ৪৫০। অথচ চলতি বিশ্বকাপে ৫ ইনিংসে ডি ককের রান ৪০৭, সেঞ্চুরি তিনটি।
মঙ্গলবার ৩৬ রানে দুই উইকেট হারানোর পর রানরেটকে কখনোই পাঁচের নিচে নামতে দেননি ডি কক। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মারক্রাম। তৃতীয় উইকেট জুটিতে তারা তোলেন ১৩৬ বলে ১৩১ রান। চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে বোলারদের ওপর চড়াও হতে শুরু করেছিলেন মারক্রাম।তাকে ৬৯ বলে ৬০ রানে সাকিবের বলে লং অফে লিটনের তালুবন্দি হয়ে সাজঘরে ফিরতে হয়।
এরপর ডি করের সঙ্গে জুটি বাঁধেন আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি পাওয়া ক্লাসেন। শুরু থেকেই বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়াও হতে থাকেন প্রোটিয়া এই ব্যাটার। ৩৫তম ওভারে বাঁহাতি স্পিনার নাসুমের প্রথম বলে সিঙ্গেল নিয়ে চলতি বিশ্বকাপের তৃতীয় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ডি কক। ৪৭ বলে ফিফটি করা প্রোটিয়া এই ওপেনার সেঞ্চুরি পান ১০১ বলে। সেঞ্চুরি করেই দেশের হয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েন ডি কক, প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে এক বিশ্বকাপে করলেন তিন সেঞ্চুরি। শুধু এটাই নন, এক বিশ্বকাপে তিন সেঞ্চুরি করে মার্ক ওয়াহ, সৌরভ গাঙ্গুলি, কুমার সাঙ্গাকারা, রোহিত শর্মা ও ডেভিড ওয়ার্নারে সঙ্গে অভিজাত ক্লাবে ঢুকে গেছেন এই ওপেনার। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসেবে সাঙ্গাকারার চার সেঞ্চুরি থেকে এক সেঞ্চুরি দূরে দাঁড়িয়ে তিনি।
সেঞ্চুরি ছোঁয়ার পরই যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো ডি ককের ব্যাট। ১৪০ বলে ১৫ চার ও ৭ ছক্কায় ১৭৪ রানের দানবীয় ইনিংস খেলে অবশেষ থামলেন তিনি। হাসান মাহমুদের ফুলটসে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন। সাজঘরে ফেরার আগে ক্লাসেনের সঙ্গে ৮৭ বলে ১৪২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। ডি ককের আউটের পর দানবীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ক্লাসেন। ৩৪ বলে হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেওয়া ব্যাটার ৪৯ বলে ৯০ রান করে থামেন। তার এমন ইনিংসে শেষ ১০ ওভারে ১৪৪ রান তোলে দক্ষিণ আফ্রিকা। ক্লাসেন ফেরার পর ১৫ বলে ৩৪ রান করে ডেভিড মিলার দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরকে নিয়ে যান ৩৮২ রানে।
প্রথম ৪০ ওভারে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের ওপর কিছুটা চাপ প্রয়োগ করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত সেই চাপ অব্যাহত রাখতে পারেনি বাংলাদেশের বোলাররা। হাসান মাহমুদ ৬৭ রান খরচায় নেন দুটি উইকেট নেন। সাকিব, মিরাজ ও শরিফুল নেন একটি করে উইকেট।









