বিশ্বকাপ শুরুর আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটার, ভক্ত-সমর্থক-বোর্ড সবার ভাবনাতেই ছিল সেমিফাইনাল। বিশ্বকাপে ভারতের মুখোমুখি হওয়ার আগেও পর্যন্ত ক্রিকেটারদের মুখে ছিল এই কথা। তবে সুর পাল্টাতে সময় লাগেনি। পরের দুটি ম্যাচে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর ভালো অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করার কথা জানিয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। কলকাতায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হেরে সাকিব স্বীকার করে নেন এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বাজে বিশ্বকাপ। শনিবার পুনেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ হেরে শেষ হলো বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন। আর তাতেই পুরো টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হয়ে বেদনায় নীল বাংলাদেশের ক্রিকেট!
বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দল ছিল বাংলাদেশের। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা ছিলেন। সাকিব-মুশফিক তো চতুর্থ বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। মাহমুদউল্লাহর ছিল তিনটি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা। লিটন-তাসকিন-মোস্তাফিজ-শান্ত-মিরাজরাও লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেছিলেন এটি বিশ্বকাপ জেতার মতো দল। কিন্তু নানা ঘটনা-রটনার জন্ম দিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে সাকিবের দল খেই হারিয়েছে। ২০০৩ বিশ্বকাপের পর বাকি আসরগুলোতে অন্তত তিনটি করে ম্যাচ জিতলেও এবার মাত্র দুটি জিতে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হচ্ছে ক্রিকেটারদের। সাথে একরাশ হতাশা, গ্লানি তো থাকছেই। শঙ্কা আছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ছিটকে যাওয়ার। রবিবার ভারতকে হারাতে পারলে নেদারল্যান্ডস চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, আর ছিটকে যাবে বাংলাদেশ।
শনিবার পুনেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুযোগ ছিল শেষটা রাঙানোর। কিন্তু হয়নি। সকালের সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে দুপুর হতেই। আর শেষ বিকেলটা আরও বিবর্ণ, আরও বিষন্ন। পুনেতে বেদনার রঙয়ে নীল হয়েছেন ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে যেখানে বেদনার সুর, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমে উল্লাস। টানা দুই ম্যাচে হেরে পরের সবগুলো ম্যাচ জিতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অজিরা। শুরুর ম্যাচগুলোতে ব্যাটিং ব্যর্থতার খেসারত দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কিন্তু আজ ভালো ব্যাটিং করেও সাফল্য পায়নি। কেননা বোলিংয়ে ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। বোলারদের নখদন্তহীন বোলিংয়ের সুযোগ নিয়ে পুনের ২২ গজে ত্রাস ছড়িয়েছেন অজি ব্যাটাররা।
বাংলাদেশের দেওয়া ৩০৭ রানের লক্ষ্যটা মামুলি হয়ে যায় মিচেল মার্শের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে। ১৩২ বলে ১৭৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন স্টিভেন স্মিথ। ৬৪ বলে তিনিও ৬৫ রানে অপরাজিত থাকেন। তাদের দুইজনের অবিচ্ছিন্ন ১৭৫ রানের জুটির ওপর দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া ৩২ বল আগেই ৮ উইকেটে জয় নিশ্চিত করে। পুনের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশের বোলাররা অজি ব্যাটারদের চাপে ফেলতে পারেননি। তাসকিন ১০ ওভারে ৬১ রান খরচ করে নিয়েছেন একটি উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ ওভার প্রতি আটের কাছাকাছি রান দিয়ে ছিলেন উইকেট শূন্য। শেখ মেহেদীও বেহিসাবী খরচ করে নিয়েছেন একটি উইকেট।
আঙুলের চোটে দলের সঙ্গে ছিলেন না সাকিব। তার না থাকাটা বেশ ভুগিয়েছে। এদিন মাঠে থাকলে স্কোরবোর্ডে আরও কিছু রান আসার পাশাপাশি বোলিংয়ে রাখতে পারতেন অবদান। তার বদলে সুযোগ পাওয়া নাসুম আহমেদ বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেননি। আটের বেশি রান দিয়ে ছিলেন উইকেটশূন্য।
ব্যাটিংয়ে শুরুর ছন্দটা ছিল না বাংলাদেশের। ওপেনিং জুটিতে লিটন-তানজিদ তামিম মিলে ৭৬ রানের জুটি গড়েছিলেন ১১.২ ওভারেই। কিন্তু দুজনই বাজে শটে ৩৬ রান করে আউট হয়েছেন। দারুণ ব্যাটিং করতে থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত (৪৫) ও মাহমুদউল্লাহ (৩২) কাটা পড়েছেন দুর্ভাগ্যজনক রান আউটে। তাওহীদ হৃদয়ই কেবল হাফ সেঞ্চুরি করতে পেরেছেন। দলের স্কোর বাড়াতে গিয়ে লম্বা শট খেলতে গিয়ে আউট হন ৭৪ রানে। হৃদয় আউট হতেই স্কোরবোর্ড থমকে যায়। ৪৬ ওভারে ২৮৩ রানে পৌঁছানো বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত করতে পারে ৩০৬ রান। শেষ চার ওভারে বাংলাদেশ তুলতে পারে মোটে ১৯ রান। এখানেই মূলত পিছিয়ে পড়ে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা।
এই তো গেলো অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের চিত্রনাট্য। প্রায় প্রতি ম্যাচেই এমন ঘটনার জন্ম হয়েছে। ভালো শুরুর পরও দুই ওপেনার তাদের ইনিংস বড় করতে পারেনি। শুরুর ম্যাচগুলোতে ব্যাটিং অর্ডারে অদল-বদলের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। দারুণ ছন্দ নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিলেন শান্ত। প্রথম ম্যাচে সেই ধারাবাহিকতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডার ওলটপালট হতেই শান্তর ব্যাট যেন থেমে গেলো। মিডল অর্ডার মুশফিক-সাকিব-হৃদয়দের অধারাবাহিক পারফরম্যান্স ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে বোলিংয়ে আধিপত্য দেখোনো তাসকিন-শরিফুল-হাসান-মোস্তাফিজরা যেন ব্যাটিং উইকেটে ছন্দ হারিয়েছেন!
নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনও মনে করছেন ব্যাটিং-বোলিংয়ের দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক দক্ষতার তেমন উন্নতি হয়নি বাংলাদেশ দলের। তাই হাবিবুল বাশারের মতে ‘মেন্টাল স্কিল’ নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা উচিত ক্রিকেটারদের।
অথচ বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে বাংলাদেশ অতীতে প্রায় প্রতিবারই দুই তিনটি বড় বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে চমক দিয়েছে। কিন্তু এবারে আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়া আর কোনও ম্যাচেই তারা জেতার ধারেকাছে যেতে পারেনি। এই কারণে বড় স্বপ্ন নিয়ে ভারতে পা রাখলেও তাদের প্রস্থানটা হলো খুবই বাজেভাবে। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘নতুন শুরু’ প্রয়োজন। সেটি বোর্ড থেকে শুরু করে সবখানে। তাহলেই হয়তো আগামী বিশ্বকাপ ঘিরে স্বপ্ন দেখা সম্ভব। নয়তো প্রতিবারের মতো স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ ভেন্যুতে যাত্রা করা দলটিকে আবারও হতাশায় নিমজ্জিত হতে হবে।









