বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল কি আবারও বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাবে? দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত যুবাদের বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এই কমন প্রশ্ন। তবে এর উত্তর আপাতত কঠিন। অবশ্য লাল-সবুজ জার্সিধারীদের জন্য কাজটা সহজ হয়ে যেতে পারে যদি অলরাউন্ডার সত্তা নিয়ে চৌধুরী মোহাম্মদ রিজওয়ান জ্বলে উঠতে পারেন! বিকেএসপি থেকে উঠে আসা এই কিশোর ব্যাট করেন তিন নম্বরে, বল হাতেও তুলতে পারেন গতির ঝড়।
মন ও মননে মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ধারণ করে এগোচ্ছেন রিজওয়ান। ক্রিকেটার হিসেবে তিনি চলতে চান মাশরাফির পথেই। অবশ্য মাশরাফির মতো শুধু বোলিংয়ে নয়, রিজওয়ান নিজের সামর্থ্য নিংড়ে দিতে চান ব্যাটেও। দুই বছর ধরে যুব দলে ব্যাটারের দায়িত্বই পালন করে যাচ্ছেন তিনি। এবারের এশিয়া কাপ জয়েও দারুণ ভূমিকা রেখেছেন রিজওয়ান।
রিজওয়ানের ক্রিকেটার হওয়ার শুরুর পথ কুসুমাস্তীর্ণই ছিল। বাবা পঞ্চগড় জেলার পামুলি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তানভীর যোবায়ের হোসেন চৌধুরী এবং মা স্কুল শিক্ষক সুলতানা মাহফুজুন নাহার ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার পথকে সহজ করে দিয়েছেন। যদিও বিকেএসপির প্রথম ট্রায়ালে টিকতে না পারায় কিছুটা হতাশা জন্মেছিল রিজওয়ানের মনে। কিন্তু দ্বিতীয় ট্রায়ালে ঠিকই পা রাখেন স্বপ্নপূরণের চৌকাঠে। ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমি থেকে উঠে এসে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার পর রিজওয়ানকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বয়সভিত্তিক প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন যুব দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার ভালো পারফরম্যান্সে লেখা হতে পারে আসন্ন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাফল্যমণ্ডিত এক গল্প। বড় মঞ্চে ব্যাটিং নৈপুণ্য দেখাতে নিয়মিত ভারতীয় গ্রেট বিরাট কোহলির ব্যাটিং পর্যবেক্ষণ করছেন। তার ব্যাটিং দেখেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই তরুণ অলরাউন্ডার।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে অলরাউন্ডার চৌধুরী মোহাম্মদ রিজওয়ানের সাক্ষাৎকার।
বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি চাচারাই আপনার ভেতর ক্রিকেটকে ঘিরে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন...
চৌধুরী মোহাম্মদ রিজওয়ান: ছোটবেলা থেকে দেখতাম আমার চাচ্চুরা বাড়ির পাশে ক্রিকেট খেলেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে তাদের হাত ধরে মাঠে যেতাম। তখন আমার বয়স সাত-আট বছর হবে। বড় ভাই ও চাচ্চুদের সঙ্গে পাড়া-মহল্লায় খেলে বেড়াতাম। অবশ্য ব্যাটিং-বোলিং কিছুই করার সুযোগ পেতাম না। কেবল ফিল্ডিং করতে পারতাম। তবুও খুশি থাকতাম এই ভেবে যে, আমাকে দলে তো অন্তত নিয়েছে! ছোটদের সঙ্গে খেলে ভালো লাগতো না। তাই বড় ভাই ও চাচ্চুদের সঙ্গে খেলতাম। তাদের সঙ্গে ব্যাটিং-বোলিং করে ক্রিকেটের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। এভাবে মাঠে যেতে যেতেই আমার মধ্যে ক্রিকেটের প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট বলে খেলা শুরু কবে থেকে?
রিজওয়ান: ২০১৭ সালে আমাদের এলাকায় আমার চাচ্চুর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ক্রিকেট বলে প্রথম অনুশীলন শুরু করি। এরপর বিকেএসপিতে ট্রায়াল দেই। প্রথমবার অবশ্য বাদ পড়েছিলাম। তখন ব্যর্থ হয়ে মন খারাপ হয়েছিল খুব। তবে হতাশ না হয়ে পঞ্চগড়ে ফিরে রাহাত স্যারের ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হই। সাজু নামে এক চাচ্চুর মাধ্যমে ভর্তি হয়েছিলাম। এর আগে তার কাছে কিছুদিন অনুশীলন করেছি। রাহাত স্যারের অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলন করে রংপুর বিভাগের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে খেলেছি। আমি ছিলাম অধিনায়ক। সেখানে খেলেই বিকেএসপিতে ট্রায়ালে গিয়ে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। বিকেএসপি থেকে বয়সভিত্তিক বাকি স্তরগুলো ভালোভাবে পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার নাকি পড়াশোনায় একদম মন ছিল না। বাবা-মাকে রাজি করালেন কীভাবে?
রিজওয়ান: সত্যিই পড়াশোনায় মন বসতো না আমার। এখনও মন নাই! আমার সবকিছুই ক্রিকেটকে ঘিরে। আব্বা-আম্মা হয়তো বুঝতে পেরেছেন– আমাকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। এজন্যই ক্রিকেট খেলতে চেয়েছি বলে তারা বারণ করেননি। আব্বা-আম্মা আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। আম্মুর সমর্থন পেয়েছি বেশি। আম্মু যখন যা লাগতো আমাকে কিনে দিয়েছেন। শুধু আব্বু-আম্মুই নন; আমাদের এলাকার বড় ভাই, বন্ধু ও চাচ্চুরা সবাই অনেক সহযোগিতা করেন।
বাংলা ট্রিবিউন: সেটা কেমন?
রিজওয়ান: আমি বাড়িতে গেলে বোলিং করে সময় দেন। বন্ধুরা বোলিং করে আর আমি টানা ব্যাটিং করি। যখনই বাড়িতে যাই, আমার যেন অনুশীলনের ঘাটতি তৈরি না হয় এজন্য চাচ্চুরা ও বড় ভাইয়েরা সবসময় সচেষ্ট থাকেন। ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমির রাহাত স্যার থেকে শুরু করে রাশেদ স্যারসহ যারা আছেন, সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন। তার ভাবেন– বাড়িতে এসে যদি আমার প্রস্তুতির ঘাটতি হয়? তাই আমার প্রস্তুতি যেন ঠিক থাকে তারা সবসময় সেই চেষ্টা করেন।
বাংলা ট্রিবিউন: মাশরাফিকে আইডল মনে করেন। তার প্রতি ভালো লাগা প্রসঙ্গে বলুন।
রিজওয়ান: স্পোর্টসম্যান হিসেবে মাশরাফি ভাইকে অনেক ভালো লাগে। তার ব্যক্তিত্ব আমার খুব পছন্দ। তিনি জাতীয় দলের অধিনায়ক থাকাকালে যেভাবে সবাইকে এক সুতোয় আগলে রেখেছিলেন, সেটা আমার কাছে অন্যরকম লাগে। তার নেতৃত্বেই কিন্তু বাংলাদেশ দল বদলে যেতে শুরু করে। তিনি পেস বোলার, আমিও পেস বোলিং করি। তার মতোই আগ্রাসী ভূমিকায় থাকতে চাই বোলিংয়ের সময়।
বাংলা ট্রিবিউন: তিন নম্বর পজিশনে দলের সেরা ব্যাটাররা সুযোগ পেয়ে থাকেন। আপনিও নিশ্চয়ই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের মধ্যে সেরা। আস্থার প্রতিদান দিতে কতটা প্রস্তুত?
রিজওয়ান: তিন নম্বরে ব্যাটিং করতে আমার অনেক ভালো লাগে। ভারত সিরিজ থেকে কোচেরা বলছিলেন, আমাকে তিনে খেলানো হবে। এরপর থেকে বিরাট কোহলির ভিডিও দেখতাম। তিনি কীভাবে ইনিংস গড়ে তোলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে দলের হাল ধরেন, ভালো অবস্থায় কীভাবে ব্যাটিং করেন, কীভাবে সিঙ্গেল ও ডাবল নেন, পার্টনারশিপ কীভাবে গড়ে তোলেন– এসব খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি। তার ভিডিও দেখে অনেক উদ্বুদ্ধ হয়েছি। তিন নম্বরে ব্যাটিং করা অনেক চ্যালেঞ্জের জানি। এগুলো উপভোগ করি। আমি চাপের মধ্যেই বেশি ভালো খেলি।
বাংলা ট্রিবিউন: শ্রীলঙ্কার কন্ডিশন মাথায় নিয়ে আপনাদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। কিন্তু হুট করেই বিশ্বকাপ ভেন্যু পরিবর্তন হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রস্তুতিতে কোনও ব্যাঘাত ঘটেছে?
রিজওয়ান: আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের দল বিশ্বকাপ মঞ্চে ভালো করতে মুখিয়ে আছে। ব্যাটিংয়ে ওয়াসিম স্যার আমাদের নিয়ে দারুণ কাজ করেছেন। আমরা যেন ভালোভাবে অনুশীলন করতে পারি, তিনি সবসময় সেটা নিশ্চিত করেন। এর ফল আমরা এশিয়া কাপে পেয়েছি। বিশ্বকাপেও আমাদের কাছ থেকে এমন কিছু পরফরম্যান্স দেখবেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পেস নির্ভর উইকেট হওয়ার কথা। বাউন্স থাকতে হয়তো। তারপরও আমাদের দলের ব্যাটাররা এমন কন্ডিশনে খেলতে পুরোপুরি প্রস্তুত। বিশ্বকাপ শুরুর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে যে কয়দিন পাবো, সেখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার এলাকার ছেলে শরিফুল ইসলাম জাতীয় দল মাতাচ্ছেন। দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তার আগুনে বোলিংয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দল শিরোপা জিতেছে। তার সঙ্গে বিশেষ কোনও আলাপ হয়েছে?
রিজওয়ান: বাড়িতে গেলেই শরিফুল ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়। আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করি। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি উইকেট নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন। এছাড়া আকবর আলি ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তিনিও আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন। আশা করি, তাদের পরামর্শ কাজে লাগাতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বমঞ্চে রিজওয়ানের ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
রিজওয়ান: বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবো। এখানে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে পারলে ফোকাসে থাকা যাবে। ফলে আগামীতে হয়তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার সুযোগ আসবে। আমিও সেটাই চাই। অন্তত দুই-তিনটি ম্যাচে বড় ইনিংস খেলতে চাই। তবে কথা দিয়ে তো আর রান করা যাবে না। আমাকে মাঠেই খেলে দেখাতে হবে। তাই ম্যাচ বাই ম্যাচ দলে অবদান রাখার চেষ্টা করবো।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের আগের ব্যাচ শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি, আপনারা কি শিরোপা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন?
রিজওয়ান: শিরোপা নিয়ে আমরা ভাবছি না। কেননা শিরোপা জিততে ভাগ্যও লাগে। আমাদের মূল ফোকাস হলো ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো খেলা। প্রথম ম্যাচেই আমাদের খেলতে হবে ভারতের বিপক্ষে। প্রথম ম্যাচে জয় দিয়ে আমাদের শুরুটা করতে হবে। নির্দিষ্ট দিনে নিজের সেরাটা দেওয়া গেলে অবশ্যই ফল আমাদের পক্ষে আসবে। ইনশাল্লাহ দল হিসেবে আমরা অনেক ভালো অবস্থানে আছি। ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলে অবশ্যই শিরোপা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বাংলা ট্রিবিউন: ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংয়ে আপনার দায়িত্ব নিতে হবে, কতখানি প্রস্তুত?
রিজওয়ান: পেস বোলার হিসেবে আমারও কিছু ভূমিকা তো অবশ্যই আছে। আমার চেষ্টা থাকবে সেরাটা দেওয়ার। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে বোলিং আশা করি উপভোগ্যই হবে। আমাদের দলে আরও কয়েকজন পেসার আছে। আশা করি, সবাই দারুণ বোলিং করতে পারবে। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কন্ডিশনে বোলিং করা সবার স্বপ্ন। আশা করি, ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে স্বপ্নটা দারুণভাবে পূরণ করতে পারবো। আমি যেহেতু অলরাউন্ডার, আমার দায়িত্ব অনেকখানি। আশা করি, সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো।
একনজরে
পুরো নাম: চৌধুরী মোহাম্মদ রিজওয়ান
ডাক নাম: অর্ণব
জন্ম: ৩ মে, ২০০৫
জন্মস্থান: পঞ্চগড়
বাবা: চৌধুরী মোহাম্মদ তানভীর যুবায়ের হোসেন
মা: সুলতানা মাহফুজুর নাহার
ভাইবোন: এক ভাই এক বোন
উচ্চতা: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব: ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমি
বর্তমান ক্লাব: বিকেএসপি
প্রথম কোচ: রাহাত
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
প্রিয় শট: কাভার ড্রাইভ
যুব ওয়ানডেতে রান: ১৭ ম্যাচে ৪২৪ রান
বোলিং স্টাইল: ডানহাতি মিডিয়াম পেসার
প্রিয় ডেলিভারি: ইয়র্কার
যুব ওয়ানডেতে উইকেট: ১৭ ম্যাচে ৩ উইকেট
প্রিয় মানুষ: বাবা-মা
প্রিয় ক্রিকেটার: মাশরাফি বিন মুর্তজা
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: এশিয়া কাপ জয়








