বাংলাদেশে সফল বাঁহাতি স্পিনারের তালিকা করলে অবধারিতভাবেই সাকিব আল হাসানের নাম চলে আসে সবার আগে। তাকে আদর্শ মেনে বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ছেলে মোহাম্মদ রাফি উজজামান রাফি। আসন্ন আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিতে ঘূর্ণিজাদু দেখানোর প্রত্যয় তার হৃদয়ে।
সাকিবের মতোই বিকেএসপিতে ক্রিকেট-দীক্ষা নিয়েছেন রাফি। তবে অলরাউন্ডার নন তিনি। তার পুরো মনোযোগ বাঁহাতি স্পিনে। বর্তমান যুব দলে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারীর তালিকায় ছেলেটি আছে দুই নম্বরে। ১৫ ম্যাচে তার শিকার ৩১ উইকেট। ১৩০ ওভার বোলিং করে তিনি রান দিয়েছেন ওভার প্রতি ৩.৭১ করে। অর্থাৎ উইকেট নেওয়া তো বটেই, কম খরুচে বোলিংয়ে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন। যদিও টিম কম্বিনেশনের জটিলতার কারণে আপাতত সব ম্যাচে সুযোগ পাচ্ছেন না।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় কোচ রোকনুজ্জামান রাহাতের তত্ত্বাবধানে রাফির ক্রিকেট কোচিং শুরু হয়। তার আগে স্থানীয় এক বড় ভাইয়ের নজরে পড়ায় তার জন্য ক্রিকেটে পথচলা সহজ হয়েছে। ঢাকায় থাকার সময় আর্থিক সহায়তার জন্য বড় ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ এই যুবা। সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ক্রিকেট মাঠে নিজেকে মেলে ধরতে চান তিনি।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রাফি উজ্জামান রাফির সাক্ষাৎকার।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট বলে আপনার শুরুটা হলো কীভাবে?
মোহাম্মদ রাফি উজ্জামান রাফি: ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট বলে ভালো পারফর্ম করি। ২০১৭ সালের কথা। একদিন এলাকার বড় ভাই অ্যাডভোকেট আশিকুর রহমান রিজভি গলিতে দাঁড়িয়ে আমার খেলা দেখেন। তিনি আমাকে ডেকে বলেন, ‘তোমাকে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলাবো।’ ঠাকুরঁগাওতে প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ও তৃতীয় বিভাগ লিগ ক্রিকেট নিয়মিত হয়। ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হওয়ার পর রোকনুজ্জামান রাহাত স্যার আমাকে দেখে দ্বিতীয় বিভাগের একটি দলে সুযোগ করে দেন। সেখানে আমার ভালো পারফরম্যান্স দেখে তিনি নিয়মিত অনুশীলনে আসতে বলেন। এভাবেই জেলায় খেলেছি। একই বছর রংপুর বিভাগের হয়ে খেলেছি। এরপর বিকেএসপিতে সুযোগ পাই।
বাংলা ট্রিবিউন: বিকেএসপিতে কীভাবে ভর্তি হলেন?
রাফি: ২০১৮ সালে বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য ট্রায়াল দিয়ে আসি। এরপর সাতদিনের ক্যাম্পে সুযোগ পাই। বিকেএসপিতে ভর্তির সময় আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। সেখানে থেকেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সব ধাপ খেলেছি। যদিও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল আমাকে।
বাংলা ট্রিবিউন: কঠিন পরিস্থিতিটা কেমন ছিল?
রাফি: সত্যি বলতে, অনেক চাপে পড়েছিলাম। তখন বিকেএসপিতে স্যারেরা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। তখন রিপন স্যারের তত্ত্বাবধানে ছিলাম। ২০১৮ সালে বিকেএসপি থেকে বিভাগীয় ক্রিকেট খেলি। এর আগের বছর যেহেতু অনূর্ধ্ব-১৫’তে ডাক না পাওয়ার কারণে অনেক কষ্ট করেছি। এই সময়টাতে আমার বিকেএসপির কোচ ছাড়াও আমার একাডেমির রাহাত স্যার, রাশেদ ইকবাল স্যার আমাকে মানসিকভাবে উদ্দীপনা জুগিয়েছেন। কষ্টের ফলও পেয়েছি। পরের বছর ঠিকই অনূর্ধ্ব-১৫’তে সুযোগ পাই। পরের বছর বিকেএসপিতে না খেলে রংপুরে চলে যাই। ওখানে ওই বছর করোনার কারণে খেলা হয়নি। অবশ্য অনূর্ধ্ব-১৭’তে শেষ পর্যন্ত থাকি। তার পরের বছর বিকেএসপি থেকে বিভাগীয় ক্রিকেট খেলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে অংশ নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: পরিবার থেকে কতটা সহযোগিতা পেয়েছেন?
রাফি: ক্রিকেটই খেলবো এমন মনস্থির করে আব্বু-আম্মুকে জানাই। তাদের সামনে আমার বড় ভাইও ছিলেন। আমার চাওয়া অনুযায়ী খেলতে দিয়েছেন তারা। পরিবার থেকে আমাকে কখনও বাধা দেওয়া হয়নি। বরং সবসময় সবাই আমার পক্ষে থেকেছেন। কখনও পারফরম্যান্স খারাপ হলে কিংবা কোনও সমস্যায় পড়লে পরিবারই সবার আগে আমার পাশে এগিয়ে এসেছে। যখন যেটা চাই, তারা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে বড় ভাই আমার যাবতীয় সব খরচ বহন করেন।
বাংলা ট্রিবিউন: চাইলে পেসার হতে পারতেন, স্পিনিং অলরাউন্ডার হওয়ার প্রেরণা কে?
রাফি: ছোটবেলা থেকেই স্পিন বোলিং আমার খুব পছন্দ। সাকিব আল হাসানকে অনেক ভালো লাগে। তিনিই আমার আইডল। তার খেলা দেখেই স্পিনার হওয়ার আগ্রহ জন্মে। তাকে দেখে মুগ্ধ হই। তিনি কীভাবে এত কিছু সামলাতে পারেন ভাবলে অবাক লাগে। তার এসব দিক আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাকে অনুসরণ করেই স্পিন বোলিং শুরু করি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা হতো, আমিও যদি এভাবে বোলিং করতে পারতাম! বেড়ে ওঠার পর সাকিবের খেলা দেখে স্পিনার হওয়ার জন্য আরও বেশি আগ্রহী হয়েছি।
বাংলা ট্রিবিউন: যুব দলের হয়ে আপনার উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স কোনটি?
রাফি: ভারত সিরিজের আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে বোলার হিসেবে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছি। ৫ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়েছি। এসব ভালো পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিজে উদ্বুদ্ধ রাখার চেষ্টা করি।
বাংলা ট্রিবিউন: দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে স্পিনারদের আধিপত্য বিস্তার করা কঠিন, তবুও ভালো বোলিং করতে পারলে সুযোগ থাকবে। এক্ষেত্রে আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী?
রাফি: স্পিনারদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন সত্যিই কঠিন হবে। তাই কন্ডিশনের ব্যাপারে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মিরপুরে বেশ কয়েকজন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি, কীভাবে কী করলে সাফল্য পাবো। ২০২০ সালে যারা যুব বিশ্বকাপে খেলেছেন, তাদের পরামর্শ নিয়েছি। এছাড়া আমার কোচ রাশেদ ইকবাল স্যার কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ঘুরে এসেছেন। তার সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তিনি সেখানকার কন্ডিশনের ধারণা দিয়েছেন। এছাড়া ছুটিতে গ্রামে গিয়ে আমার বিভাগীয় কোচের সঙ্গে কাজ করেছি। সেখানে কংক্রিটের স্লাবে বোলিং করেছি। আমার দায়িত্ব ছিল রান আটকে রাখা। সেই অনুযায়ী আমার লাইন-লেন্থ ঠিক রাখার চেষ্টা করেছি। স্পট বোলিং করেছি বেশি।
বাংলা ট্রিবিউন: ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের যুব বিশ্বকাপ মিশন। প্রথমেই কঠিন দলের বিপক্ষে ম্যাচ, কতটা চাপ থাকবে আপনাদের ওপর?
রাফি: এটা চাপ নয়, বরং আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে। ভারতকে এশিয়া কাপে হারিয়ে এসেছি আমরা। ফলে তারাই চাপে থাকবে এবং আমাদের নিয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভীতি কাজ করবে। আমরা যদি বড় দলের সঙ্গে জয় দিয়ে শুরু করতে পারি, তাহলে পরের ম্যাচগুলোতে সবার মধ্যে অনেক আত্মবিশ্বাস থাকবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ব্যাটিংয়ে লোয়ার অর্ডারে আপনার ভূমিকা কী?
রাফি: ব্যাটিংয়ে যখন নামি, আমার দায়িত্বই হলো অন্য ব্যাটারকে সঙ্গ দেওয়া। শেষ দিকে আমার কাজ হলো বোলারের ওপর চড়াও হয়ে দলের স্কোর আরও বাড়িয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করা।
একনজরে
পুরো নাম: মোহাম্মদ রাফি উজ্জামান
ডাক নাম: রাফি
জন্ম: ২৪ ডিসেম্বর, ২০০৬
জন্মস্থান: ফকিরপাড়া, ঠাকুরগাঁও
বাবা: শাহেদুল হক
মা: রওশন আরা
উচ্চতা: ৫ ফুট সাড়ে ১১ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ
প্রথম ক্লাব: ঠাকুরগাঁও ক্রিকেট অ্যাকাডেমি
বর্তমান ক্লাব: বিকেএসপি
প্রথম কোচ: রোকনুজ্জামান রাহাত
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি স্পিনার
বোলিংয়ে শক্তির জায়গা: নতুন বলেও বোলিং করতে পারা
যুব ওয়ানডেতে উইকেট: ১৫ ম্যাচে ৩১টি
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি
প্রিয় শট: স্লগ সুইপ
যুব ওয়ানডেতে রান: ১৫ ম্যাচে ৯৭ রান
প্রিয় মানুষ: বাবা-মা
প্রিয় ক্রিকেটার: সাকিব আল হাসান
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া








