অনেক দিন ধরেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার মার্টিন ক্রো। শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছেন পরপারে। অকল্যান্ডে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুর সময় পরিবারের সব সদস্যের সান্নিধ্যেই ছিলেন সাবেক এই গ্রেট ক্রিকেটার।
আর বন্ধুর এমন বিদায় মর্মাহত বর্তমান পাকিস্তান দলের কোচ ওয়াকার ইউনুস। বৃহস্পতিবার দুপুরে অনুশীলনের পর সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন পাকিস্তানের এই জীবন্ত কিংবদন্তি। সেখানে প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু নিয়ে কথা বলেন উপস্থিত সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে।
মার্টিন ক্রোর সঙ্গে থাকা নানা গল্প স্মৃতি হাতড়ে বের করার চেষ্টা করলেন ওয়াকার ইউনুস। বিশেষ করে এক বছর আগে এক সঙ্গে ধারাভাষ্য দেওয়ার ঘটনাটি বেশি নাড়া দিচ্ছে ওয়াকারকে। তিনি বলেন, ‘তার ক্যানসার ধরা পড়ার এক বছর আগে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড সিরিজে ধারাভাষ্য দিয়েছি একসঙ্গে। ব্যাপারটি ছিল অসাধারণ। তিনি মানুষ হিসেবে যেমন দুর্দান্ত তেমনি খেলা সমন্ধে তার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। তিনি গ্র্যান্ট ইলিয়টকে নিয়ে কাজ করেছিলেন। তার মনে হয়েছিল, গ্র্যান্টের প্রতিভা আছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলেন।’
মৃত্যুর সংবাদ শুনে হতবিহবল হয়ে পড়েন ওয়াকার ইউনুস। যেন নিজের কান ও চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। আবেগ জড়িত কণ্ঠে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মার্টিন ক্রোর চলে যাওয়ার দুঃসংবাদটা আজ(বৃহস্পতিবার) সকালেই জেনেছি। এই খবরটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। তিনি আমার অসাধারণ এক বন্ধু ছিলেন। তার পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা। তিনি নিউজিল্যান্ডের একজন কিংবদন্তি। তার অনুপস্থিতি ক্রিকেট বিশ্বে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘তার জন্য খারাপ লেগেছে। যে কষ্ট ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, সেটা কখনই সহজ ছিল না। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য আজ দুঃখের দিন। আমাদের জন্যও তাই।’
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ওয়াকার ইউনুস ও মার্টিন ক্রোর ২২ গজের যুদ্ধ বেশ উপভোগ্যই ছিল। নিউজিল্যান্ডের এই কিংবন্তির বিপক্ষে অনেক ম্যাচ খেলেছেন ওয়াকার ইউনুস। পাকিস্তানী এই কোচের দৃষ্টিতে মার্টিন অসাধারণ এক ব্যাটসম্যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সম্ভবত সেই ফাস্ট বোলার, যে কিনা মার্টিনের বিপক্ষে প্রচুর ক্রিকেট খেলেছে। মার্টিন পরিপূর্ণ একজন ব্যাটসম্যান। তাকে একটি প্রতিষ্ঠানও বলা যেতে পারে। তরুণদের অনুসরণ করার মতো অনেক ব্যাপারই তার মধ্যে বিদ্যমান। এমন একজন মানুষের বিদায়, পরিবার, জাতি এবং আমার জন্যও বিশাল ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তার বন্ধুত্বের কথা আমি চিরকাল মনে রাখবো।’
আরেক সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামও মার্টিন ক্রোকে রিভার্স সুইংয়ের বিপক্ষে সেরা ব্যাটসম্যান বলে মনে করেন। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ওয়াকার বলেন, ‘আমার মনে হয়, ওয়াসিম সম্ভবত ১৯৯১ সালের কথা বলেছে। তিনি সেবার কয়েকটা সেঞ্চুরি করেছিলেন। তিন টেস্টের ওই সিরিজে নিউজিল্যান্ডের হয়ে তিনি সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। ঘাসের উইকেটে আমাদের বিপক্ষে তিনি দারুণভাবে রিভার্স সুইং খেলেছিলেন। যেটা তখনকার দিনে একটা নতুন কিছু ছিল। ওরকম গতিতে বল আসার পরও তিনি অসাধারণ দক্ষতায় সেগুলো সামলাতেন। সম্ভবত রিভার্স সুইংয়ের বিপক্ষে তিনিই ছিলেন সেরা ব্যাটসম্যান।’
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পরেও ক্রিকেটের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন ক্রো। ক্যানসারের যন্ত্রণা কোনওদিনই তাকে দমাতে পারেনি। ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালেও ক্রিকেট বিশ্ব তাকে পেয়েছে ধারাভাষ্যকার ও লেখক হিসেবে।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে মনে করা হতো। ১৯৮২-৯৫ এই ১৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৭৭ টেস্টে ৪৫.৩৬ গড়ে ৫ হাজার ৪শ ৪৪ রান করেছেন। সেঞ্চুরি করেছিলেন ১৭ টি, ফিফটি ১৮ টি। টেস্টে তার ২৯৯ রান ছিল দীর্ঘদিন নিউজিল্যান্ডের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ। এখনও তার সমান টেস্ট সেঞ্চুরি নিউজিল্যান্ডের কারও নেই। কিউইদের হয়ে অধিনায়কত্বও করেছেন চার বছর। এছাড়া ১৪৩টি ওয়ানডে খেলে ৩৮.৫৫ গড়ে করেছেন ৪ হাজার ৭শ চার রান। সেঞ্চুরি চারটি।
১৯৯২ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচে ৪৫৬ রান করে অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেমিফাইনাল পর্যন্ত। হাঁটুর ইনজুরির জন্য ১৯৯৫ সালে অবসরে যাওয়ার পরেও গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত থাকেন মার্টিন। তার ভাই জেফ ক্রোও ছিলেন কিউই ক্রিকেটার। নিউজিল্যান্ডের ওপেনার ছিলেন তিনি। বর্তমানে আইসিসির ম্যাচ রেফারি হিসেবে এশিয়া কাপে দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্লেখ্য, টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার, ভিন্ন সংস্করণের ‘ক্রিকেট ম্যাক্স’ এর প্রবক্তা (যা থেকে পরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট), জাতীয় দলের কয়েকজন সদস্যের পরামর্শকসহ লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন মার্টিন ক্রো।
/এফআইআর/








