২০১৬ সালে নির্বাচক প্যানেলে যুক্ত হন হাবিবুল বাশার সুমন। তার আগে ছিলেন নারী দলের নির্বাচক প্যানেলে। লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলের নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এই সময়ে অনেক সাফল্য যেমন আছে, তেমন ব্যর্থতাও সঙ্গী হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনিসহ পুরো নির্বাচক প্যানেল নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছিল। শেষমেশ গত ১২ ফেব্রুয়ারি সবাইকে চমকে দিয়ে নতুন নির্বাচক কমিটি করে বিসিবি। নতুন এই কমিটি থেকে বাদ পড়েন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশার। সোমবার শুরু হয়েছে ইউল্যাব ফেয়ার প্লে কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। খেলা চলাকালে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছেন সাবেক এই অধিনায়ক।
বাংলা ট্রিবিউন: কেমন আছেন?
হাবিবুল বাশার সুমন: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। লম্বা সময় পর ক্রিকেটকে ভিন্ন চোখে দেখতে পারছি। আগে খেলাটা দেখতাম একভাবে, গত কিছু দিন ধরে খেলাটা সাধারণ দর্শকদের মতো করে দেখতে পারছি। কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও এই সময়টা উপভোগ করছি।
নির্বাচকের দায়িত্বে নেই, গালমন্দও আর খেতে হচ্ছে না, কতটা স্বস্তির?
বাশার: হা হা…, যেকোনও চাকরিতে পছন্দ অপছন্দ থাকবেই। নির্বাচকদের কাজের খুঁতটা সবাই একটু বেশিই ধরার চেষ্টা করে। সব দেশেই হয় কম বেশি, আমাদের দেশে একটু বেশিই হয় আর কী! তবে আমি নির্বাচকের দায়িত্বটা উপভোগ করছিলাম। আমি আমার কাজটা উপভোগ করতাম। খুব কাছ থেকে দলের সঙ্গে থাকাটা আমার জন্য ভীষণ রকম আনন্দদায়ক ছিল। এই মুহূর্তে স্বস্তিতে আছি সেটি বলবো না, কিছুটা ভিন্ন সময় পার করছি, যেটা এতদিন পারিনি।
যাকেই নেওয়া হোক না কেন, সমর্থক, মিডিয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা থাকতোই। এসব আলোচনা আপনি কীভাবে গ্রহণ করতেন?
বাশার: লম্বা সময়ের এই দায়িত্বে শেষ দিকে এসে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। বিশেষ করে গত কয়েক মাস অনেক চাপের মধ্য দিয়ে পার করেছি। গত কয়েক মাসে আমরা যে সিদ্ধান্তই নিচ্ছিলাম, সবগুলোই হয়েছিল সমালোচিত। আমি মনে করি এখন যারা আসবেন, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন। কারণ আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক বেশি প্রভাব আছে, যেটা প্রিন্ট, অনলাইন কিংবা টেলিভিশন মিডিয়াতে অতটা নেই! আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক প্রগতিশীল। ফলে আপনি যাই করবেন, আপনাকে নিয়ে কথা হবে। এসব নিয়ে শেষ দিকে এসে খুব বেশি বিরক্ত হয়েছি।
দল সাফল্য পেলে আপনাদের নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না, কিন্তু ব্যর্থ হলে সব দোষ আপনাদের ঘাড়েই পড়ে—এসব আলোচনাতেই কি বিরক্ত হচ্ছিলেন বেশি?
বাশার: বলতে পারেন, আমাদের সব কিছু নিয়েই আসলে কথা খুব বেশি হচ্ছিল। কিন্তু আমি মনে করি আইসিসি ইভেন্ট ছাড়া বাংলাদেশ দল কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে খুব একটা খারাপ করেনি। তারপরও আমাদের নিয়ে একটু বেশিই কথা হয়েছে। এটাতে বেশি বিধ্বস্ত হয়েছি। আমি মানুষ। এতটুকু বলতে পারি, যতদিন আমি কাজ করেছি সততার সঙ্গেই করেছি। সমালোচনা মানুষ করতেই পারে, কিন্তু যেটা ঠিক না, সেটা নিয়ে সমালোচনা হলে মেনে নেওয়াটা কঠিন হয়ে যেত। ওই সময় প্রচণ্ড কষ্ট পেতাম। কখনও যদি ভুল করতাম, ওই ভুল নিয়ে সমালোচনা হলে মন খারাপ হতো না। আপনি দশ জনকে নির্বাচিত করলে দশ জনই সেরা হবে না। দুনিয়ার কোনও জায়গাতেই এটা সম্ভব নয়। একটা ছেলেকে আপনি মনে করলেন ভালো, কিন্তু সে জায়গামতো ক্লিক নাও করতে পারে। ওই বিষয়টাকে নিয়ে যখন অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হয়, তখনই আসলে কষ্টটা লাগে।
আপনিসহ নির্বাচক প্যানেল কি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে?
বাশার: আপনিই বলেন, পরাধীনভাবে এতদিন কাজ করা কি সম্ভব? এক দশক তো লম্বা সময়, এতদিন কাজ করেছি, নিশ্চয়ই পরাধীন ছিলাম না। দল নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে সবার বক্তব্য থাকে। এই কাজে অনেক কিছু থাকে। পক্ষে বিপক্ষে মত থাকে। সেসব নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচক প্যানেলের সঙ্গে অনেকের যোগাযোগ থাকে। তাদের বক্তব্য শুনতে হয়। এসব শোনা মানে তো পরাধীন হয়ে যাওয়া নয়। এখানে শেয়ারিংয়ের অনেক ব্যাপার থাকে, মত প্রকাশের অনেক কিছু থাকে। আমি শুধু এতটুকুই বলবো, একদম পরাধীনভাবে এত লম্বা সময় কাজ করা সম্ভব না। সঙ্গে আরেকটা কথা বলতে চাই, নির্বাচকদের কাজ সবাইকে খুশি করাও না।
তবু তো কোনও না কোনও প্রভাব নিশ্চয়ই থাকে?
বাশার: বিষয়টা এমন না…। কথা তো অনেকেই বলতে পারে…। আমাদের সিস্টেমেই তো আছে দল নির্বাচনের পর ব্যাখ্যা দিতে হয়। সত্যি কথা বলতে, কখনও কখনও বাইরের কথা শুনে আমরা কিছুটা প্রভাবিত হই। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় সেটাই। একশ’ জন লোকের একশ’ রকম মত থাকবে। সেই মতটা যদি আমরা গুরুত্ব দেই, তাহলে নির্বাচনে প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। তবে আমাদের চেষ্টা ছিল সবসময় বাইরের প্রভাব থেকে দূরে সরে সেরা দলটা নির্বাচন করা।
আপনি প্রভাবের কথা বললেন, সেটি কি পরিচালক নাকি বোর্ড সভাপতি থেকে আসার প্রভাব?
বাশার: না….না। অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা বলছি। কিছু কিছু মিডিয়ার অতিরঞ্জিত নিউজের কথাও বলবো। আমি একটু আগেও বললাম, আমাদের এখানে অতিরঞ্জিত অনেক কিছুর চর্চা হয়। এসব অনেক সময় আমাদের কাছে আসে, কখনও কখনও এর প্রভাব থেকে আমরা বের হতে পারি না।
আপনি যেসব আলোচনার কথা বলছেন, চাইলে তো সেগুলো উপেক্ষা করা সম্ভব।
বাশার: সম্ভব তো বটেই, আমি উপেক্ষা করিও। কিন্তু একটি ইস্যু নিয়ে যদি নিয়মিত চর্চা হতে থাকে, সেটি আমার কানে কোনও না কোনোভাবে পৌঁছাবেই। সেক্ষেত্রে আপনি চাইলেও এটাকে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং আমাদের আগের নির্বাচক প্যানেল চেষ্টা করেছে এর প্রভাব থেকে দূরে থাকতে। হয়তো কখনও সেটি আমরা করতে পারিনি। সেটা হয়তো আমাদের ব্যর্থতা। তবে ক্রিকেটের ভালোর জন্য এসব আলোচনা থেকে দূরে থাকা উচিত হবে।
গত সপ্তাহে জাকের আলীকে নিয়ে কুমিল্লার কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন একটি মন্তব্য করেছেন, নির্বাচক হিসেবে তার মন্তব্যকে কীভাবে দেখছেন?
বাশার: নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন হতেই পারে। এটা এমন একটি জিনিস, এটি নিয়ে প্রশ্ন হবেই। যদি না হয়, তাহলে বুঝতে হবে নির্বাচকরা কাজ করছেন না। নির্বাচকদের কাজ সবাইকে খুশি করা না। নির্বাচনে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কিছু থাকে। অনেক অনেক কথা বলতে পারে, সেখানে সমস্যা নেই। তবে ওনার এই কথাটা আমার ভালো লাগেনি। এটা শুধু অশোভনীয় নয়, উনি যাকে নিয়ে কথা বলেছেন তার জন্য বিব্রতকর। এটা কিন্তু স্রেফ বর্ণবাদের মধ্যে পড়ে। এটা অনেক শক্তিশালী বাক্য। আমি জানি না উনি এটা কী চিন্তা থেকে বলেছেন! একটা ছেলের সুযোগ পাওয়া কিংবা না পাওয়া নিয়ে কথা হতেই পারে। কিন্তু গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলাটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। এভাবে বলাটা মারাত্মক অশোভনীয় কাজ হয়েছে। ও (জাকের আলী) কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় আছে। এই সিরিজে ওয়ানডের শেষ ম্যাচটাতে ওর খেলার কথা।
নতুন দায়িত্ব নিতে কতখানি প্রস্তুত?
বাশার: হা.. হা.. নতুন দায়িত্ব যে কী হবে, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। যেটাই হোক, দেখি আগে কী দায়িত্ব পাই!
সাইফউদ্দিনের খেলা তো নিশ্চয়ই দেখেছেন, দল নির্বাচনের সময় তিনি কি আপনাদের ভাবনাতে ছিলেন?
বাশার: সাইফউদ্দিন অনেক দিন পর দলে ফিরেছে। ভালো খেলেছে। কিন্তু ৯ মাস পর এসেই ২-১টি ম্যাচ ভালো খেলা দেখে তাকে বিচার করা ঠিক হবে না। এর আগেও কয়েকবার হয়েছে, দারুণ পারফরম্যান্স করে দলে নেওয়ার পর সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারেনি। আমরা শ্রীলঙ্কা সিরিজের দল নির্বাচনের সময় ওকে মাথায় রেখেছিলাম। ওর এই বিষয়গুলো বিবেচনা করেই দল নির্বাচন করেছি। সে কিন্তু আমাদের প্রাথমিক স্কোয়াডেও আছে। তবে ও যেভাবে পারফরম্যান্স করছে, এই ধারাবাহিকতা রাখতে পারলে অবশ্যই পরের সিরিজ তো বটেই, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ট্রাম্পকার্ড হতে পারে। এর জন্য অবশ্যই তাকে স্কিল এবং ফিটনেসের প্রমাণ দিতে হবে।
আলিস আল ইসলাম নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, তিনি কি পারবেন লম্বা রেসের ঘোড়া হতে?
বাশার: আমি আলিসকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, তবে আলিসকে লম্বা রেসের ঘোড়া হতে হলে বোলিংয়ে আরও বৈচিত্র্য আনতে হবে। ক্রিকেটের ভাষায় আলিস ‘মিস্ট্রি স্পিনার’। আমার ধারণা শুরুতে ও (আলিস) খারাপ করবে না। তবে ‘মিস্ট্রি স্পিনারদের’ যদি আপনি দেখেন, শুরুতে তারা খুব ভালো করে, পরে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। এই ধরনের বোলারদের টিকে থাকতে হলে নতুন নতুন অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে।
শান্তর ফর্ম নেই, নতুন অধিনায়কও হয়েছেন- সব মিলিয়ে তার জন্য এটি চাপের হয়ে গেলো কিনা?
বাশার: আমি আশা করি ওর জন্য চাপের হবে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তো ফর্মেই ছিল। হয়তো শুরুর দিকে বিপিএলের উইকেট বেশ স্লো ছিল, এই কারণে হয়তো সমস্যা হয়েছে তার। তারপরও ঘরোয়া ক্রিকেট এত ম্যাচে রান খরায় থাকাটা একটু অস্বস্তিকর ওর জন্য। চট্টগ্রামে যখন উইকেট ভালো হয়েছে, তখন ওর কাছ থেকে ভালো ইনিংস আশা করছিলাম। তবে একটা খারাপ সময় যেতেই পারে। বিপিএলে খারাপ সময়টা কেটে গেলো। আশা করি শ্রীলঙ্কা সিরিজেই ফর্মে ফিরে আসবে।
সামনেই শ্রীলঙ্কা সিরিজ, লিটন সেভাবে ক্লিক করতে পারছেন না, এটা কতটা চিন্তার?
বাশার: লিটন সবসময়ই অন অ্যান্ড অফ। ফর্মটাও তার ধারাবাহিক থাকে না। আবার অফফর্মটাও ধারাবাহিক না। এই ভালো তো এই খারাপ। আমি আশা করবো লিটন দ্রুতই ফর্মে ফিরবে। যখন ফিরবে, তখন উচিত হবে ফর্মটাকে লম্বা সময় ধরে রাখা। লিটন-শান্ত ভালো খেলোয়াড়, তাদের ফর্মে ফিরতে সময় লাগার কথা নয়। যখন ফিরবে, তখন এটাকে পূরণ করে নেবে। লিটন-শান্ত এর আগেও সেটি করেছে।
বিশ্বকাপে একটি আউট নিয়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বেশ উত্তেজনা হয়েছিল, ঘরের মাঠে আসন্ন সিরিজে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আশা করছেন?
বাশার: এর আগে ছিল বোধহয় নাগিন ড্যান্স (হাসি)। এবার টাইমড আউট! আমার মনে হয় যখন খেলোয়াড়রা মাঠে নেমে যায়, তখন এসব আসলে মাথায় থাকে না। তারপরও ম্যাচের মধ্যে এসব ভাইব থাকাটা ভালো। তবে মাঠে ভিন্ন আবহ থাকে। এগুলো থাকে সাপোর্টারদের মধ্যে।









