খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে ফারুক আহমেদ ক্রিকেটের সঙ্গেই ছিলেন। দুই দফায় তিনি প্রধান নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম দফায় ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এবং পরে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিসিবির সীমাহীন দুর্নীতি-অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন আট বছর আগে। দায়িত্ব ছেড়েও ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। ক্রিকেটের অনিয়ম নিয়ে বরাবরই ছিলেন সোচ্চার। প্রতিবাদী সেই সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি। বুধবার দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিলেন ব্যক্তি নয়, দায়িত্ব পালনের সময়টাতে কাজকেই প্রাধান্য দেবেন তিনি।
বুধবার ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হন ফারুক। শুরুতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত গর্বিত। খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। আমার খেলোয়াড়ি জীবন থেকে ধরলে, ১৯৮২ থেকে আজকে ২০২৪ সাল, ৪২ বছরের বেশি হবে (ক্রিকেটে সম্পৃক্ত)। বিভিন্ন পরিক্রমায় আমি খেলেছি, অধিনায়কত্ব করেছি। নির্বাচক কমিটিতে ছিলাম। সবাই জানে দুই দফায়, আসলে তিন দফায় ছিলাম। ছোট্ট একটা মেয়াদে ছিলাম খেলোয়াড় থাকার সময়। তারপর এখানে এসেছি (সভাপতি হিসেবে)।’
ক্রিকেট জাতি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। কিন্তু লম্বা সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনও আন্তর্জাতিক কোনও ট্রফি জিততে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে দলের পারফরম্যান্স তলানিতে নেমেছে। নতুন সভাপতি বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন, ‘বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় একটা দেশের যতটা করার দরকার ছিল, আমরা ততটা পারিনি। আমাদের সাফল্য একদম কম নেই। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আমাদের আরও উন্নতি করার দরকার ছিল, আমরা পারিনি। আমাদের দায়িত্ব হবে, এই সিস্টেমটাকে পুনর্গঠন করা। আমার মেয়াদ কতদিন হবে, এটা জানি না। তবে আপনাদেরকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমার সময়কাল যতদিন থাকবে, ততদিন সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে এই জিনিসগুলোর খেয়াল রাখার।’
নাজমুল হাসান পাপনের অধীনে থাকা অনেক পরিচালক ঠিকঠাক কাজ করতে পারেননি বলে অভিযোগ। ২৩ পরিচালকদের মধ্যে মাত্র আট জন বর্তমানে আছেন, বাকিরা কোথায়, কেউই জানেন না। মিটিংয়ে কোরাম সংকট কাটাতে নতুন করে নেওয়া হয়েছে আরও একজন পরিচালককে। নাজমুল আবেদীন ফাহিম জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কোটা থেকে পরিচালক হয়ে এসেছেন। আপাতত বোর্ড সভাপতি ফারুক এই নয়জনকে নিয়েই কাজ চালিয়ে যাবেন। নাজমুল আবেদীন ছাড়া বাকি আটজন হচ্ছেন- মাহবুব আনাম, আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজন, কাজী ইনাম আহমেদ, সাইফুল আলম স্বপন, ফাহিম সিনহা, ইফতেখার আহমেদ মিঠু, সালাউদ্দিন চৌধুরী।
নতুন সভাপতি ঘোষণা দিয়েছেন, কোনও ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিবেন না তিনি। তার কাছে কাজই আসল। কাজগুলো যেন ঠিকঠাকভাবে হয় সেই দিকে ফোকাস রাখবেন তিনি, ‘অনেক সময় অনেক কাজ করা যায় না, অনেক বাইরের চাপ থাকে। আশা করবো যে, এবার আমি সভাপতি থাকা অবস্থায়, যতটুকু সম্ভব, একটা সুন্দর সিস্টেম দাঁড় করাতে চাই। এখানে আমি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবো। যাকে যেই দায়িত্ব দেবো, সেই দায়িত্ব যেন ঠিকঠাকভাবে পালন হয়, সেই ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দেবো। মোট কথা, পুরো ব্যাপারটাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবো।’
এইসব কিছু করতে পুরো সিস্টেমের উন্নতি নিশ্চিত করতে চান ফারুক, ‘যদিও পুরানো কথা, একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমি পদত্যাগ করেছিলাম। আমার কাছে তাই এটিই সবচেয়ে বড় প্রাধান্য পাবে যে, সিস্টেম তৈরি করতে চাই। সত্যিকার অর্থেই যারা ক্রিকেট ভালোবাসে এবং ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে চায়, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ১৮ কোটি মানুষের দেশে, আমাদের খেলোয়াড়, দর্শক, আপনারা (সংবাদমাধ্যম), সবাই এত বেশি খেলাপাগল ও ক্রিকেটপাগল, সেখানে অনেক উপাদান ঢুকে যায় এবং ক্রিকেট বোর্ড অনেক গ্ল্যামারাস হয়ে যায়। সবাই এটার অংশ হতে চায়। আমি চাইবো, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে ক্রিকেটের উন্নতি।’
ফারুক প্রত্যাশা করেন যারা এতদিন নানা কারণে কাজ করতে পারেননি, তারা এখন থেকে চেষ্টা করবেন, ‘যাদের কাজ করার আগ্রহ কম… শুধু বোর্ড পরিচালক হিসেবে থাকতে চায়… এই পরিচয় আসলে গর্ব করার মতো কিছু হবে না। তাদের কাছ থেকে আশা করবো… তারা সবাই দারুণ সামর্থ্যবান.. তারা যদি একটু চেষ্টা করে, সময় দেয়, আমার মনে হয় ভালো একটা জায়গায় আমরা যেতে পারবো।’
শুধু ক্রিকেটের উন্নতিতেই থেমে থাকতে চান না ফারুক। ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতিও লাঘব করতে চান সাবেক এই অধিনায়ক, ‘প্রতিটি সেক্টরে বাংলাদেশে এমন দুর্নীতি হয়েছে, এটা আমরা সবাই জানি। আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ। প্রতিটি সংস্থায় যে দুর্নীতির কথা শুনেছি, ক্রিকেট বোর্ড এটির বাইরে নয়। যদি এরকম কিছু থাকে, অবশ্যই আমরা খোঁজ নেবো। দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। কেউ যদি এটা বলে, আমি বিশ্বাস করবো না। তবে একটা সিস্টেম চালু করতে হবে, যেখানে এসব (দুর্নীতি) আমরা কমাতে পারবো।’
নিজের লক্ষ্যের কথা জানাতে গিয়ে ফারুক বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হবে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা। আমি মুখে অনেক কিছু বললাম, অনেক স্বপ্ন দেখালাম, কিন্তু দেখতে গিয়ে যদি দেখেন যে, কথার কাছাকাছি কিছু আমি করতে পারিনি, তাহলে তো হবে না। এজন্য কথা কমিয়ে দিয়ে, ক্রিকেটের জন্য যে জায়গাগুলি গুরুত্বপূর্ণ, ওই জায়গাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবো।’
ফারুক আরও বলেছেন, ‘তিন-চার বছর পরও যাতে আমাদের বলতে না হয় যে ঘরোয়া ক্রিকেটে উন্নতি করতে হবে বা পিচ ভালো করতে হবে, এইচপি দলকে ভালো করতে হবে বা ‘এ’ দলের সফর বেশি করতে হবে। আমরা সবাই চেষ্টা করবো। অনেক পারিপার্শ্বিক ব্যাপার থাকে। যারা কাজ করেছেন, তাদের অনেকের ইচ্ছা থাকলেও অনেক কিছু হয়নি। আবার অনেকের ইচ্ছাও ছিল না। আমরা চেষ্টা করবো।’









