১৯৮৫ সালের নববর্ষের দিন। পাকিস্তানের এক রিফিউজি ক্যাম্পে জন্ম আফগান ক্রিকেটার মোহাম্মদ নবীর। তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত তার প্রিয় স্বদেশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মুজাহেদিনদের মধ্যে চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ফলে তার জন্মের আগেই দেশ ছাড়ে পরিবার। পেশোয়ারের একটি রিফিউজি ক্যাম্পে জন্ম। সেখানেই জীবনের দীর্ঘ ১৬ বছর কাটিয়েছেন নবী। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর যখন অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল তখন প্রথমবারের মতো দেশে ফেরেন মোহাম্মদ নবী।
আফগানিস্তানের উইকেট কিপার-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ শাহজাদের কথাই ধরা যাক। তারও উত্থানের দিনগুলো ছিল আফগানিস্তান টিমের আরও অনেক ক্রিকেটারের মতোই। পেশোয়ারের উদ্বাস্তু শিবির থেকে। কাপড়ের বলে টেপ জড়িয়ে যেখানে ছেলেবেলা থেকে ক্রিকেট খেলতেন শাহজাদ। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্কোরার তিনি। কোয়ালিফাইং রাউন্ডের তিন ম্যাচেই মারকাটারি ব্যাটিংয়ের দেখা মিলেছে শাহজাদের ব্যাটে। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ৬১ রান। দ্বিতীয় ম্যাচে হংকংয়ের বিরুদ্ধে ৪১। তৃতীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৩ বলে করেছেন ৪০ রান।
আফগান পেসার হামিদ হাসানের একটি কথা তাদের ক্রিকেটের প্রেমের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০০৯ সালে কিম্যান আইসল্যান্ডের সঙ্গে এক দুর্দান্ত ম্যাচ জেতার পর তিনি বলেছিলেন, 'আমি অনেক লোককে মরতে দেখেছি, কখনও কাঁদিনি। কিন্তু ক্রিকেট আমার চোখে জল এনেছে।'
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাঁচা মরার লড়াইয়ে ৩২ বলে ৫২ রান করেন মোহাম্মদ নবী। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে বিশাল পুঁজি গড়ে জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে ম্যাচ জিতে নেয় আফগানরা। বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠে নবী-শাহজাদের আফগানিস্তান।
মোহাম্মদ নবীর পরিবারের কেউ ক্রিকেট খেলেননি কোনওদিন। এমনকি পরিবারের সদস্যরা এটি পছন্দও করতেন না। তবু শরণার্থী শিবির পাশে একটু ফাঁকা জায়গা পেলে কাগজ-কাপড়ে জোড়াতালি দেওয়া বল নিয়ে নেমে মজে যেতেন ক্রিকেটে। ২০০১ সালে যখন আফগানিস্তানে ফিরে যান, তখন ক্রিকেট খেলার কোনও উপায় ছিল না। নবী বলেন, 'তখন আফগানিস্তানে কোনও মাঠ ছিল না। কিছুই ছিল না। খেলা প্রায় অসম্ভব ছিল।' সেখান থেকে কেবল ক্রিকেটের প্রতি প্রেম আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিশ্বমঞ্চে আগমন।
কিন্তু বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। বছরখানেক আগে আফগান ক্রিকেট বোর্ডের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছিলেন, 'এখন এখানে সবার প্রিয় ক্রিকেট। এমনকি তালেবানরাও ক্রিকেট ভালোবাসেন!'
২০০৩ সালে আফগানিস্তানের হয়ে খেলা শুরু করেন নবী। ২০১৩ সালের মার্চে তার বাবা অপহৃত হয়েছিলেন। আগস্টে নামিবিয়িার বিপক্ষে ম্যাচের আগে খবর পান তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাবাকে পুনরায় ফিরে পাওয়াটা দারুণ ভাবে উদযাপন করেছিলেন তিনি। ব্যাট হাতে ৪৫ বলে ৮১ রানের পর, বল হাতে ১২ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন মোহাম্মদ নবী!
বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ঝড় তোলা মোহাম্মদ শাহজাদের উত্থানের দিনগুলো ছিল আফগানিস্তান টিমের আরও অনেক ক্রিকেটারের মতোই। পেশোয়ারের উদ্বাস্তু শিবিরে বেড়ে ওঠা। কাপড়ের বলে টেপ জড়িয়ে সেখানে ছেলেবেলা থেকে ক্রিকেট খেলতেন শাহজাদ। শাহজাদ বলেন, 'ওই সময় দুটো কাজ ছিল আমাদের কাছে, হয় ক্রিকেট খেলো, না হলে ঘুমাও। অনেক সময় তো আমি ঘুমের মধ্যেও ক্রিকেট খেলতাম।'
উদ্বাস্তু শিবিরে দু'টি মাত্র টি-শার্ট ছিল শাহজাদের। এক জনকে দিয়ে যে দুটোর পিঠে লিখিয়েছিলেন মইন খান ও রিকি পন্টিংয়ের নাম। ক্রিকেটার হলেন কেন? প্রশ্ন করলে হাসতে হাসতে শাহজাদকে বলতে শোনা যায়, 'বাবা-মা বলত, মন দিয়ে পড়াশোনা করো। না করলে মারও জুটত। দেখা গেল মার খেতে খেতেই একদিন ক্রিকেটার হয়ে গেলাম!'
হয়তো আর কিছুদিন পর ক্রিকেটের এলিট টেনে প্রবেশ করবে আফগানিস্তান। সেকথা জানিয়ে দিয়েই মোহাম্মদ শাহজাদের দৃপ্ত উচ্চারণ 'যাত্রা কেবল শুরু!'
/এমআর/








