দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশ দলের হতশ্রী পারফরম্যান্স চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো এই ফরম্যাটে কতটা নাজুক অবস্থায় বাংলাদেশ। মাঝে মধ্যে কঠিন প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে বাহবা কুড়ালেও আদতে এই ফরম্যাটে বাংলাদেশ এখনও ‘শিশুই’। চেনা মাঠ, চেনা কন্ডিশনে একদিনে দুইবার অলআউট হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। বাংলাদেশ দলের এই ব্যর্থতার জন্য ব্যাটারদের হতশ্রী পারফরম্যান্সকেই কেবল দায়ী করা হলেও টেস্ট ক্রিকেটের পুরো সিস্টেমকেই দায় দিচ্ছেন সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। তার মতে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ক্রিকেটারদের চিন্তা ভাবনা, কোচিং প্যানেল কোচদের নিয়োগ- সবকিছুতেই গলদ রয়েছে। এসবের উন্নতি হলেই কেবল টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করা সম্ভব।
২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ দল এখন পর্যন্ত ১৪৮টি টেস্ট খেলেছে, জিতেছে ২১টি ম্যাচ। যার মধ্যে আবার বেশিরভাগ জয়ই দুর্বল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এমনকি নতুন টেস্ট সদস্য আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দেখাতে হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অন্য দুই ফরম্যাটের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেটেই বাংলাদেশ দল সবচেয়ে বেশি অধারাবাহিক। একটি ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স আসলেও আরেকটি ম্যাচে খেই হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশ। এমন কিছু যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের মান, টেস্ট সংস্কৃতির ঘাটতি, ব্যাটিং কোচের মান নিয়ে প্রশ্ন, মাঠের বাইরে একের পর ঘটনা, এসব স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলেছে। তবে মূল ব্যাপার, ব্যাটারদের মধ্যে 'অ্যাপ্লিকেশনের' ঘাটতি ছিল স্পষ্ট।
ড্রেসিংরুমের অস্বস্তিকর পরিবেশকে সাম্প্রতিক ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন আশরাফুল। গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে নিয়ে নিয়মিত খবর হচ্ছিল। সাকিব ইস্যু ছিল প্রায় প্রতিদিনই। চট্টগ্রাম টেস্টের আগে অধিনায়ক শান্তকে নিয়ে গুঞ্জন। এইসব কিছু ড্রেসিংরুমের পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। আশরাফুল কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সাম্প্রতিক সময়ে সাকিবের না থাকা এবং হাথুরুসিংহে-শান্ত ইস্যুতে বেশি আলোচনা কোনও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন কিনা?
আশরাফুল বলেছেন, ‘সাকিবের না থাকা এতটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। ও গত এক-দুই বছরে খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল না। তবে নিয়মিত খবর হচ্ছে, এগুলোই সমস্যা। প্রতি ম্যাচের আগেই হয় সাকিবকে নিয়ে নিউজ, নয়তো শান্তর অধিনায়কত্ব নিয়ে নিউজ। নয়তো হাথরুসিংহকে নিয়ে নিউজ। এগুলো ড্রেসিংরুমের জন্য স্বস্তিকর নয়। একটা ম্যাচের আগে আপনি খেলার চিন্তা না করে, আপনি মাঠের বাইরের ইস্যুগুলো নিয়ে যখন আলোচনা করবেন, তখন এটা অনেক বড় সমস্যা। আমি মনে করি মাঠের পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার পেছনে এটি বড় ভূমিকা রেখেছে। ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ভালো না হলে ইতিবাচক ফল আসা কঠিন।'
শান্তদের এমন ব্যর্থতার পেছনে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোগত সমস্যাকেও সামনে আনলেন আশরাফুল। তার মতে, ‘এই যে দেখেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট চলছে। কেউ দেখার নাই! আমাদের নির্বাচকদের সংখ্যাও কম। তিনজন মাত্র নির্বাচক। একজন জাতীয় দলের সঙ্গে। দুইজন যায় দুই ভেন্যুতে। বাকি দুই ভেন্যু খালিই থাকে। একটা ম্যাচে দেখলাম ৯ জন বোলার বোলিং করেছে। এটা কেন হবে? ৫ জন বিশেষজ্ঞ বোলার আপনি নিয়েছেন, ওদের দিয়েই বোলিং করাবেন, ওরা মার খেলেও শিখতে পারবে। আমাদের সময়ে এই জিনিস আমরা করেছি। কিন্তু আমরা তো ভুল করেছি। এখনও যদি একই ভুল করি। এই দোষ তো কোচদের, ম্যানেজমেন্টের।’
বাংলাদেশ দলের বোলার কিংবা ফিল্ডাররা কিছুটা ধারাবাহিক হলেও ব্যাটারাদের অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করছেন ডেভিড হ্যাম্প। তিনি নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কিছুদিন কাজ করলেও খুব বেশি পরিচিত মুখ নন। কোচ হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবে আশরাফুল এখানে স্থানীয় কোচদের দায় দেখছেন।
ঘরোয়া ক্রিকেটে স্থানীয় কোচদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কিছু শিখতে পারছেন না বলেই মনে করেন সাবেক এই অধিনায়ক, ‘দুর্ভাগ্যবশত আগের বোর্ড জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটারদের মূল্যায়ন করেনি, এই বোর্ডও করছে না! বাংলাদেশের ব্যাটাররা ভালো করবে তখনই, যখন যারা টেস্ট খেলেছে তাদের জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলসহ নানা জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অনেকেই অনেককে সেরা কোচ হিসেবে দেখছে, কিন্তু যাদের নিয়ে এই আলোচনা তারা তো কেউই টেস্ট ক্রিকেট খেলেনি। ফলে তারা ব্যাটারদের কীভাবে কী শেখাবে। তারা নিজেরাই জানে টেস্ট ক্রিকেটে কোন পরিস্থিতিতে কী মোকাবিলা করতে হবে। আগে আমরা একজন সাধারণ কোচের সঙ্গে কাজ করতাম। কিন্তু এখনও যদি ওই স্ট্যান্ডার্ডেই থাকেন, তাহলে তো কিছু হবে না। উন্নতি হওয়ার জন্য সবখানে ভালো মানের কোচ লাগবে, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে জাতীয় দল পর্যন্ত সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার, যারা কোচিং করতে আগ্রহী তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমি মনে করি জাবেদ ওমর, খালেদ মাসুদ পাইলট, রাজিন সালেহ, হাবিবুল বাশার সুমনদের মতো যারা আছে টেস্ট খেলেছে , ওনারা যদি কোচিংয়ে আসে, তাহলে উন্নতি হবেই।’
আশরাফুল উদহারণও দিলেন। মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনকে টেস্ট অভিষেক করানো হলো। প্রথম রাউন্ডে অঙ্কন সেঞ্চুরিও পেলেন। কিন্তু মাঠে নেমে অথৈ সাগরে পড়লেন। স্থানীয় কোচ যারা আছেন তাদের ভূমিকার কারণেই ক্রিকেটারদের উন্নতি হচ্ছে না বলেই মনে করেন তিনি।
পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়াকেও এক হাত নিলেন সাবেক এই অধিনায়ক, ‘এই যে অঙ্কন সেঞ্চুরি কীভাবে পেলো? আটজন বোলারের বিপক্ষে খেলে সেঞ্চুরি পেলে ওই সেঞ্চুরির মূল্য কতখানি সেটি কিন্তু দেখতে হবে। আমাদের নির্বাচন প্রসেস ঠিক করতে হবে। আপনি অঙ্কনকে এনেছেন এক ম্যাচের জন্য। ওর গড় কি ৫০ না ৬০! প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মাত্র ৩০ রানের একজনকে আপনি অভিষেক করিয়ে দিচ্ছেন? আমাদের সিস্টেমেই এত এত গলদ। ২৪ বছর একই রকম চলছে, কোনও বদল নেই। আমাদের সবখানেই সিস্টেমের বদল আনা জরুরি।’
সেই সিস্টেম নিয়েও আশরাফুল বলেছেন, ‘আপনাকে সবখানেই বদল আনতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া যেভাবে করা হয়, সেটি আরও স্বচ্ছ হতে হবে। আপনি হুট করেই একজন নামিয়ে দেবেন, আবার হুট করেই একজনকে বাদ দিয়ে দেবেন সেটি হবে না। সবখানে ভালো কোচ নিয়োগ দিতে হবে। সাবেক ক্রিকেটারদের গুরুত্ব দিতে হবে। ক্রিকেট বোর্ডের পুরো সিস্টেটাকে রিসেট করলেই কেবল ভালো করা সম্ভব। এখানে মিডিয়ারও ভূমিকা আছে। সবার তরফ থেকেই ইতিবাচক জিনিসগুলো আসলেই কেবল প্রত্যাশামতো পারফরম্যান্স সম্ভব।’
ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করতে বিভিন্ন বোর্ডই তদন্ত কমিট গঠন করে। নানা সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তদন্ত কমিটি করলেও সেই রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। ভারতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যর্থতার রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তদন্ত রিপোর্ট করেও সেই অর্থে কোনও লাভ নেই। আশরাফুলও মনে করেন তদন্ত রিপোর্ট করার চেয়ে সাবেক টেস্ট ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং তাদের অভিজ্ঞতাগুলো সব স্তরে কাজে লাগানোর ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, ‘ব্যাখ্যা জেনে কী করবেন? সবাই জানে কেন এমন হচ্ছে। প্রায় সব ম্যাচেই শুরুতেই আমাদের ৫/৬ উইকেট চলে যাচ্ছে। অবশ্যই কেন এমন হচ্ছে, এটা নিয়ে কাজ করা জরুরি। আমার মনে হয় নতুন ক্রিকেট বোর্ডে যারা আছেন, ওনারা যারা টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন ওদের নিয়ে বসলে খারাপ হয় না। এর বাইরে যারা বোর্ডে নেই এমন ক্রিকেটার যেমন পাইলট ভাই (খালেদ মাসুদ), সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ), জাবেদ ভাই (ওমর), রাজিন সালেহ যারা স্ট্রাগল করে টেস্ট খেলেছেন, রান করেছেন ওনাদের চিন্তাটা নেওয়া যেতে পারে। আমি নিশ্চিত এখান থেকে ভালো আউটপুট আসবে।’









