জাহানারা আলমের করা যৌন হয়রানির অভিযোগের সাবেক ক্রিকেটার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুকে শাস্তি দিয়েছিল বিসিবি। মঞ্জুকে ক্রিকেটের সকল কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে, এই শাস্তিতে সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগী জাহানারা। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আজ (শনিবার) করেছেন বিষয়টি নিয়ে পোস্ট। ওই পোস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে তিনটি অনুরোধ জানিয়ে বিচারও দাবি করেছেন এই নারী ক্রিকেটার।
পোস্টে জাহানারা আলম লেখেন, “ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ভাইয়া আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আমি আজ আপনার কাছে তিনটি অনুরোধ নিয়ে এসেছি, দয়া করে আমার অনুরোধগুলো বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছি। আপনি অবশ্য অবগত আছেন, আমার একটি ইস্যু সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট ইস্যুতে রিসেন্টলি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে। এবং তদন্ত রিপোর্টে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু গিল্টি ফাউন্ড হয়। শাস্তি স্বরূপ তাকে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে ব্যান করা হয়। আর এই পুরো তদন্ত প্রসেসে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা দেয়। এমনকি, তারা বাংলাদেশের একটি ল ফার্ম মাহবুব অ্যান্ড কোম্পানিকে হায়ার করে এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় আমাকে সাপোর্ট করে। আমি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আমাকে সাপোর্ট করার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য।”
তিনি আরও লেখেন, “আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তারা একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, মঞ্জুকে শাস্তি দিয়েছেন। কিন্তু, আমি খুশি হতে পারছি না। কারণ, আমার সঙ্গে যা যা হয়েছে, আমি যা যা ফেস করেছি, সেই তুলনায় এই শাস্তি খুব সামান্য মনে হয়েছে আমার কাছে। আমি আরও অনেক বড় শাস্তি আশা করেছিলাম। কারণ, শুধুমাত্র আমি যদি ক্রিকেট অঙ্গনের কথাই চিন্তা করি, তাহলে আমার মতো হাজারো জাহানারা পৃথিবীর অসংখ্য টিমে বিদ্যমান আছে। আমি জাহানারা মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পায়নি। ওই জাহানারাও এই মঞ্জুর হাত থেকে ছাড় পাবে বলে আমি মনে করি না।
“২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৌহিদ মাহমুদ এবং মঞ্জু—এই দু’জনের কুপ্রস্তাবে আমি রাজি হই নাই দেখে এই দুজনসহ তাদের একটি সহযোগী গ্রুপ চারটি বছর আমাকে চরম লেভেলের মেন্টাল টর্চার, মেন্টাল অ্যাবিউজ, সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে। এমনকি, আমাকে চরম লেভেলের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তৌহিদ মাহমুদ মারা গিয়েছেন। মঞ্জুর সামান্য শাস্তি হয়েছে। কিন্তু, ওই সহযোগী গ্রুপের তো কোনও বিচার হয় নাই, শাস্তিও হয় নাই।”
এই ক্রিকেটার লেখেন, “২০২৩ সালের টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ খেলে যখন আমরা আসি দেশে সাউথ আফ্রিকা থেকে তখন একটি ফিক্সিং ইস্যু থাকে। মঞ্জুর আরও বেশ কিছু মাস ওমেন্স উইংয়ের সঙ্গে কন্টাক্ট থাকে। কোনও অজ্ঞাত কারণে তাকে ওমেন্স উইং থেকে বাংলা টাইগার্সে শিফট করে দেওয়া হয় সাডেনলি, কোনও কারণ ছাড়া। আমি জানি না কী কারণ ছিল। সে ওমেন্স উইং থেকে চলে যাওয়ার পরেও তার এই সহযোগী গ্রুপ আমি যখন পরবর্তীতে আবার টিমে কামব্যাক করি, ছয়টা মাস আমাকে কন্টিনিউ এই টর্চার করে।
“আমার প্রথম অনুরোধ আপনার কাছে—মঞ্জু এবং তৌহিদের এই সহযোগী গ্রুপের বিচার চাই আমি, কঠিন থেকে কঠিন বিচার চাই। দয়া করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এদের বিচারের ব্যবস্থা করুন প্লিজ। আমার মতো যেন আর কোনও জাহানারা সাফারার না হয় ভবিষ্যতে।”
ওই ফেসবুক পোস্টে জাহানারা আরও লেখেন, “আমার সবথেকে খারাপ লেগেছে ওমেন্স উইংয়ের অভিভাবক তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ভাই কোনও কিছু যাচাই-বাছাই না করে মন্তব্য করে বসলেন। আমি নাকি বাইরের লোক এবং আমি যা বলেছি সব ভিত্তিহীন। রাজ্জাক ভাইয়ের জানা উচিত ছিল, আমি টিম থেকে বাদও পড়ি নাই এবং আমি রিটার্ডও করি নাই। আমি এখনও স্টিল বাংলাদেশ টিমের প্লেয়ার। আমি মেন্টাল হেলথ ইস্যুতে ছুটিতে আছি। নিজের প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে নিজের প্রিয় বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে অনেক দূরে। আমার সবথেকে আরও বেশি কষ্ট লেগেছে তখন যখন কি না মঞ্জু গিল্টি ফাউন্ড হয়েছে তাকে একটা শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তারপরেও রিসেন্টলি এই আব্দুর রাজ্জাক ভাই—তখন তিনি ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন, তখনও তিনি একজন অভিভাবক নারী উইংয়ের—তিনি আবারও মন্তব্য করেন, তার ভাইমঞ্জুর নাকি অনেক বড় শাস্তি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। মঞ্জু নাকি এত বড় শাস্তি ডিজার্ভ করে না। তিনিও মন্তব্য করেন, নারী ক্রিকেটাররা নাকি সমঝোতা করে ক্রিকেট খেলে বলে তিনি মনে করেন।
“আমার প্রশ্ন রাজ্জাক ভাই, আপনি একটা মায়ের সন্তান। আপনার ওয়াইফ একজন নারী। আপনার অবশ্যই বোনরা আছে, তারাও নারী। আপনার মেয়ে আছে কি না আমি জানি না। আজকে যদি আপনার বোন, আপনার ওয়াইফ বা আপনার মেয়েরা ক্রিকেট খেলতো এবং তাদের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটত তাহলে কি আপনি নোংরা মন্তব্য করতেন? আমার খুবই খারাপ লেগেছে, আমার মানতে কষ্ট হয় যে আপনি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেছেন, আপনি একজন এক্স ক্রিকেটার ছিলেন এবং আপনি একজন নারীর সন্তান।”
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় অনুরোধ জানিয়ে এই ক্রিকেটার লেখেন, “আমি কথা বলেছি দেখে সাহস পেয়ে আমার যে বোনরা মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের অভিযোগগুলি তুলে ধরেছে—শুধুমাত্র ক্রিকেটের না, আমার ক্রিকেটের বোনরা, আমার শুটারের বোনরা, আমার অন্যান্য ইভেন্টের যে যে বোনরা তাদের অভিযোগগুলি মিডিয়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছে—সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সকলের বিচারের ব্যবস্থা করুন প্লিজ। আজ যদি আপনি এর বিচার না করেন তাহলে আমার এই বোনরা তাদের স্ব স্ব ডিপার্টমেন্টে কোনোদিনও ব্যাক করতে পারবে না। তার সবথেকে বড় প্রমাণ দুই-তিন বছর আগে আন্ডার এইটিনের একজন ক্রিকেটার আমার এক বোন, সে সেক্সুয়াল হ্যারাজ হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কমপ্লেইন করে। সিইও সুজন স্যার তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার নির্ধারণ করেন এবং ওমেন্স উইংয়ের একজন কর্মকর্তা গিল্টি ফাউন্ড হয়। কিন্তু, আমার ওই বোন আজ পর্যন্ত ক্রিকেটে কামব্যাক করতে পারে নাই। ডোমেস্টিকেও কোনও ম্যাচ খেলতে পারেনি, কোথাও কোনও প্র্যাকটিস করতেও পারেনি। তার সবথেকে বড় অপরাধ সে কেন কমপ্লেইন করেছে, সে কেন সমঝোতা করে নাই। আজকে যদি আমাদের সবথেকে বড় অপরাধ এটাই হয়, আমরা সমঝোতা করি নাই, আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ চাই, একটা সেফ পরিবেশ চাই। নির্ভয়ে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আমরা খেলতে পারি, এটাই কি আমাদের অপরাধ?”
সাবেক ক্রিকেটার সুজনের কাছ থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি জানিয়ে তিনি লেখেন, “ওই বিগত চারটা বছর যখনই আমি ওনাকে ফোন করেছি—স্যার আমি আর পারতেছি না, প্লিজ আমাকে সাহায্য করেন। উনি ওনার সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছেন। আমি ১০-১১ মাস যখন টর্চার লেভেল আর সহ্য করতে পারি নাই, ২০২১-এর জুলাইয়ে আমি হাতে লেখা একটা অবজারভেশন নোট দেয় সিইও বরাবর। স্পিক আউট করায় শাস্তি স্বরূপ আমাকে ঠিক তারপরের টুর্নামেন্টেই আমাকে বাদ দেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আমি কন্টিনিউ বাংলাদেশ টিমের হয়ে খেলেছি এবং ওই প্রথমবার আমাকে বাদ দেওয়া হয়, কেন? আমি অবজারভেশন নোট দিয়েছি। আমি তো কমপ্লেইনেও উল্লেখ করি নাই। আমি ভয় পেয়ে যাই, আমি আর কথাই বলি নাই। আমার মতো জাহানারারা হাজারো আছে সমাজে, যারা চুপ করে থাকে।”
বিচারের ব্যবস্থা না করা হলে আমার এই বোনরা কোনোদিনই ব্যাক করতে পারবে না জানিয়ে ওই পোস্টে তিনি লেখেন, “আমার তৃতীয় অনুরোধ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। রিসেন্টলি আপনি যে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি মহানুভবতা দেখিয়েছেন তা আমাকে সাহস যুগিয়েছি আপনার কাছে অনুরোধ নিয়ে আসার। প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ—ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য একটা স্ট্রং সেফেস্ট সেফগার্ডিং পলিসির ব্যবস্থা করে দিন যত দ্রুত সম্ভব। তাহলে আর এই নোংরা মানুষগুলো তাদের মুখ থেকে কুপ্রস্তাব দেওয়া তো দূরে থাক, চোখ তুলে মেয়েদের প্রতি তাকানোরও সাহস পাবে না।”









