ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটের হার শুধু একটি পরাজয় নয়, অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের ব্যাটিং কাঠামোর বড় কিছু দুর্বলতাও যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ডারউইনে বোলাররা নিজেদের কাজটা কমবেশি ঠিকই করেছেন, কিন্তু ব্যাটাররা প্রয়োজনীয় রানটাই তুলতে পারেননি। ফলে টেস্টের এক নম্বর দলকে শেষ পর্যন্ত দেখতে হয়েছে নিজেদের মাটিতে এক ঐতিহাসিক হার।
অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেটের এই পরাজয় তাদের ব্যাটিং কম্বিনেশন নিয়ে হঠাৎ করেই উত্তর থেকে প্রশ্নের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। সমস্যাটা বোলিংয়ে ছিল না। মূল সমস্যা ছিল ব্যাটারদের চাপ সামলাতে ব্যর্থতা এবং ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সকে বড় সংগ্রহে রূপ দিতে না পারা।
প্রথম ইনিংসেই বিপদের সংকেত দেখা গিয়েছিল। পেস ও স্পিন দুই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষেই সমানভাবে সমস্যায় পড়ে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। টপ অর্ডারে স্টিভ স্মিথের ৭১ রান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনও অবদান ছিল না। ফলে টেস্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জুটি গড়তে পারেনি বাকি ব্যাটিং লাইনআপ।
এর ফলে শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চাপ তৈরি হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশকে ম্যাচে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ করে দেয় তারা। এবার বিস্তারিত আকারে সমস্যাগুলো দেখে নেওয়া যাক-
ওপেনিং নিয়ে বড় সমস্যা
উসমান খাজার জায়গায় ওপেনার হিসেবে জেক ওয়েদারাল্ডের প্রথম টেস্ট এর চেয়ে খারাপভাবে হতে পারে না। প্রথম ইনিংসে ২৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে আউট হন তিনি।
অবশ্য একটি টেস্ট দিয়ে কোনও খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা উচিত নয়। তবে এখন অস্ট্রেলিয়ার ওপেনিং নিয়ে সত্যিকারের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। খাজার বিদায় যে বড় একটি শূন্যতা তৈরি করবে, তা আগেই অনুমেয় ছিল। কিন্তু সেই জায়গা পূরণ করতে পারবেন, এমন প্রমাণ এখনো দিতে পারেননি ওয়েদারাল্ড।
ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে তাকে আরও একটি সুযোগ দেওয়া হবে, নাকি অন্য কারও দিকে তাকাবে অস্ট্রেলিয়া—এখন সেটিই দেখার বিষয়। বাংলাদেশের প্রাণবন্ত বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ট্রাভিস হেডও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারায় অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরও একটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এখনও ছন্দের খোঁজে লাবুশেন
মার্নাস লাবুশেনের বিষয়টি অবশ্য আলাদা। কারণ তিনি নতুন কেউ নন। ডারউইনে ডানহাতি এই ব্যাটার দুই ইনিংসে করেন যথাক্রমে ১ ও ৩১ রান। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া আবারও তাদের অন্যতম সেরা টেস্ট ব্যাটারের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ধারাবাহিক অবদান পায়নি।
উদ্বেগটা শুধু একটি খারাপ টেস্ট নিয়ে নয়। লাবুশেনের জায়গা নিয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ তার রান করার ধারাবাহিকতা ক্রমেই কমেছে। টেস্টে তার সর্বশেষ সেঞ্চুরি এসেছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
একই সময়ে নতুন ওপেনার ও প্রতিষ্ঠিত টপ অর্ডার ব্যাটার দুজনকেই যদি ফর্ম খুঁজতে হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এক-দুজনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
প্রথম ইনিংসে স্টিভ স্মিথের ৭১ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪। এই দুটিই ছিল দুর্দান্ত ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স। কিন্তু এই ইনিংস দুটিই অস্ট্রেলিয়ার বড় সমস্যাটাকে আরও স্পষ্ট করেছে। দলে বড় জুটির সংখ্যা ছিল খুবই কম।
গ্রিনের সেঞ্চুরিটি এসেছে অস্ট্রেলিয়া যখন প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের চেয়ে ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। বাংলাদেশকে কঠিন লক্ষ্য দেওয়ার পরিবর্তে তখন তার লড়াই ছিল শুধু অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হার থেকে বাঁচানো!
মিডল অর্ডারের ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন
অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার নিয়েও এখনও একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। ক্যামেরন গ্রিন, বাউ ওয়েবস্টার ও অ্যালেক্স ক্যারির তিনজনই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারের ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ডারউইনে গ্রিনের সেঞ্চুরি তার অবস্থান আরও শক্ত করবে। অন্যদিকে অলরাউন্ড দক্ষতার কারণে ওয়েবস্টারকেও একাদশের বাইরে রাখা কঠিন।
ফলে নির্বাচকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি সত্যিই সঠিক কম্বিনেশন পেয়েছেন, নাকি পরিষ্কার ব্যাটিং কাঠামো ছাড়াই একসঙ্গে অনেক খেলোয়াড়কে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করছেন?
অস্ট্রেলিয়ার মূল সমস্যা বোলিং নয়
জশ হ্যাজলউডের ৬/৮৯ এবং তার ক্যারিয়ারের ৩০০তম টেস্ট উইকেট নিঃসন্দেহে অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় ইতিবাচক দিক। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ এখনও শক্তিশালী।
কিন্তু ডারউইন দেখিয়ে দিয়েছে, বোলিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সীমাবদ্ধতাও আছে। হ্যাজলউড ও অন্য বোলাররা উইকেট নিয়েছেন, কিন্তু তাদের রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত রানই দিতে পারেনি ব্যাটিং বিভাগ।
শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রান-ই অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই দ্বিতীয় টেস্টের আগে দল গঠন নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে অস্ট্রেলিয়া।









