এ সময়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এবারের বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) নির্বাচন। আর এই নিয়ে এখন ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন—কার হাতে যাবে বাংলাদেশের ফুটবলের গুরুভার? শনিবার (৩০ এপ্রিল) অনুষ্ঠিতব্য বাফুফে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান সভাপতি কাজী মো. সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত পরিষদ এবং নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খানের নেতৃত্বাধীন ‘বাঁচাও ফুটবল পরিষদ’। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন ফিফা ও এএফসির প্রতিনিধি।
নানা আলোচনা-সমালোচনা ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরেই সরগরম হয়ে উঠেছে ফুটবল অঙ্গন। তবে, ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে নির্বাচনি প্রচারণা। শনিবার রাতেই জানা যাবে, কার হাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবলের গুরুভার। একসময়ের দেশ কাঁপানো ফুটবল তারকা কাজী সালাহউদ্দীন তৃতীয়বারের মতো ফুটবলের কাণ্ডারি হচ্ছেন, নাকি হাল ধরছেন ফুটবল পাড়ার অপেক্ষাকৃত অপরিচিত মুখ কামরুল আশরাফ খান এমপি।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ১ সভাপতি, ৪ সহ-সভাপতি ও ১৫টি সদস্যপদের জন্য এবার প্রার্থী ৪৬ জন। মোট ১৩৪ জন ভোটার রাজধানীর হোটেল র্যাডিসনে শনিবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট দেবেন। সিনিয়র সহ-সভাপতির পদে ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে স্বপদেই বহাল থাকছেন সালাম মুর্শেদী।
আরও পড়তে পারেন: বিএনপি-জামায়াতের ভাষায় কথা বলেন জন কেরি: সেলিম
এরই মধ্যে দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে ২৫ দফা নির্বাচনি ইশতেহার দিয়েছেন সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন ‘সম্মিলিত পরিষদ’। ‘বাঁচাও ফুটবল’ পরিষদের নির্বাচনি ইশতেহারে আছে ১৪ দফা প্রতিশ্রুতি।
জয়ী হলে বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুনভাবে পরিচালনা করবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কাজী সালাহউদ্দীন। শনিবারের নির্বাচন প্রসঙ্গে কাজী সালাহউদ্দীন বলেন, ‘নির্বাচনে যদি জয়ী হতে পারি। তাহলে নিজের ভুল-ত্রুটি শুধরে বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুনভাবে পরিচালনা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার দীর্ঘ ফুটবল ক্যারিয়ারে অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট কাল (শনিবার)। বিভিন্নমুখী চাপের মাঝে এরকম পারিপার্শ্বিকতায় নির্বাচন করিনি। তবে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। কখনও পিছপা হই না।’
ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, নির্বাচনে অনেকটাই এগিয়ে আছেন কাজী সালাহউদ্দীন। তার প্যানেলে রয়েছেন দেশের ফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ ও ফুটবল সংগঠকরা। এছাড়া, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ফুটবল সংগঠকরাও রয়েছেন এই প্যানেলে।
ফুটবল অভিজ্ঞতার বিচারে আরেক সভাপতি পদপ্রার্থী কামরুল আশরাফ খানের চেয়ে ঢের এগিয়ে সালাহউদ্দীন। ঘরোয়া ফুটবলের এই কিংবদন্তি ক্লাব ক্যারিয়ারের সোনালি সময় কাটিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেডে; খেলেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রেও। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই ফরোয়ার্ডের নাম জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও।
সাফল্য-ব্যর্থতা মিলিয়ে সংগঠক হিসেবেও ঘরে-বাইরে পরিচিত মুখ সালাহউদ্দীন। এর আগে দুই দফায় বাফুফে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে ছিলেন সহ-সভাপতিও। দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের টানা দুইবারের সভাপতি (বর্তমানেও দায়িত্বে আছেন)। ফুটবলের বিশ্বসংস্থা—ফিফার মার্কেটিং কমিটির সদস্যও ৬১ বছর বয়সী এই সাবেক ফুটবলার।
দুই মেয়াদে সালাহউদ্দীনের সেরা সাফল্য ফুটবলকে নিয়মিত মাঠে রাখা। কোটি টাকার সুপার কাপ, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ড কাপের আয়োজন, লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে আনা, সিলেট একাডেমি প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত ফুটবলার তৈরির আসর পাইওনিয়ার লিগ সচল রাখা, ঢাকার বাইরে একাধিক ম্যাচ আয়োজন। এগুলো তার তৃতীয় মেয়াদে সভাপতির পদে থাকার পাল্লা ভারী করছে।
আরও পড়তে পারেন: উল্টো পথে গাড়ি: প্রভাবশালীদের কাছে অসহায় পুলিশ
এ প্যানেলের সহ-সভাপতি পদে লড়ছেন কাজী নাবিল আহমেদ, বাদল রায়, আলহাজ শামসুল হক চৌধুরী, মহিউদ্দীন আহমেদ মহি। তাদের মাঝে ব্রাদার্স ইউনিয়নের ফুটবল কর্ণধার মহিউদ্দীন আহমেদ মহি ছাড়া সবাই ছিলেন বিগত কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। যশোর-৩ এর সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ ও সাবেক জাতীয় ফুটবলার বাদল রায় দুজনেই সহ-সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বিগত চারটি বছর। চট্টগ্রামের পটিয়ার সংসদ সদস্য আলহাজ শামসুল হক চৌধুরী ছিলেন কার্য-নির্বাহী কমিটির সদস্য; এবার তিনি লড়ছেন সহ-সভাপতি পদে।
সদস্য পদে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশ ফুটবলের চলমান সাক্ষী; একাধিকবার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, সাবেক জাতীয় ফুটবলার সত্যজিৎ দাশ রূপু, মো. ইলিয়াছ হোসেন, আরিফ হোসেন মুন ও অমিত খান শুভ্র।
তৃণমূল পর্যায় থেকে আছেন বরিশালের আলমগীর খান আলো, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৌফিকুল ইসলাম তোফা, সিলেটের মাহিউদ্দীন আহমেদ সেলিম, বাগেরহাটের জাকির আহমেদ চৌধুরী, প্রবীণ ফুটবল সংগঠক আব্দুর রহিম ও বাফুফের মহিলা ফুটবল কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ।
অন্যদিকে কাজী সালাহউদ্দীন প্যানেলের তীব্র সমালোচনা করে কামরুল আশরাফ খানের বাঁচার ফুটবল প্যানেলের আবেদন, সালাহউদ্দীন ৮ বছর বাফুফে পরিচালনা করেছেন, এবার তাদের সুযোগ দেওয়া হোক। মূলত শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের সভাপতি মঞ্জুর কাদেরের নির্দেশনায় পরিচালিত এ প্যানেলটিতে রয়েছেন একাধিক সাবেক জাতীয় ফুটবলার। তবে তারা সম্প্রতি ফুটবলের বাইরে ছিলেন। ফুটবলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন না তারা।
এমনকি ওই প্যানেলে নেই জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের কোনও ফুটবল সংগঠক। যদিও সভাপতি পদপ্রার্থী কামরুল আশরাফ খান বলছেন, তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের উন্নতি করাই তার আসল লক্ষ্য। কামরুল আশরাফ খান স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে বা ঢাকাকেন্দ্রিক ক্লাবের সঙ্গে কখনও সম্পৃক্ত ছিলেন না।
আরও পড়তে পারেন: জয়ী হলে ফুটবলকে নতুনভাবে পরিচালনা করবো: সালাহউদ্দীন
চার সহ-সভাপতি পদপ্রার্থীর মধ্যে খুরশিদ আলম বাবুল ও আশরাফউদ্দীন আহমেদ চুন্নু সাবেক জাতীয় ফুটবলার। চুন্নু হালে শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান হওয়াতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। ২০১২ সালে নির্বাচনে সিনিয়র সভাপতি পদে ৬টি ভোট পেয়েছিলেন তিনি।
তবে খুরশিদ বাবুলকে এরকম কোনও ভূমিকায় বিগত বছরগুলোতে দেখা যায়নি। নজিব আহমেদ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একজন নির্বাচিত পরিচালক। নির্বাচনে জিতলে তাকে বিসিবি অথবা বাফুফের যে কোনও একটি বেছে নিতে হবে। মুমিনুল হক সাঈদ আরামবাগ এলাকার কাউন্সিলর। তিনি আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের সভাপতি ও ফুটবল সংগঠক।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফুটবলের পথ নির্দেশক কে হবেন, অভিজ্ঞ সালাহউদ্দীন নাকি ফুটবলে অপেক্ষকৃত নবীন কামরুল আশরাফ খান, শনিবার তা নির্ধারণ করবেন ১৩৪ জন বাফুফে কাউন্সিলর।
/এমএনএইচ/







