করোনাভাইরাস মহামারির এই ভয়ঙ্কর সময়ে মাঠে কোনও খেলা নেই। সাবেক ফুটবলাররা ঘরে বসে অতীত স্মৃতিতে ডুবে যাচ্ছেন। তুলে আনছেন পেছনের সাফল্যগাঁথা। আজ থাকছে ২০০৩ সালের সাফ ফুটবলের শিরোপা জয়ের কাহিনী। ১৭ বছর আগের সেই স্মৃতি রোমন্থন করলেন জর্জ কোটান, রজনী কান্ত বর্মণ ও আমিনুল হক-
দক্ষিণ এশিয়ার ‘বিশ্বকাপ’ বলে অভিহিত সাফ ফুটবলে তখনও বাংলাদেশ শিরোপা জিততে পারেনি। ১৯৯৯ সালে গোয়াতে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠলেও স্বাগতিকদের কাছে হারতে হয়েছিল। তাই ২০০৩ সালে নিজেদের মাঠে ছিল বড় পরীক্ষা। চাপও ছিল রজনী-আরমান-টিটুদের ওপর। যে করেই হোক নিজেদের মাঠে জিততে হবে শিরোপা।
জর্জ কোটান তখন দায়িত্বে। শিরোপা স্বপ্নের বীজ বুনে দেওয়া এই কোচের অধীনে ঠিকই ইতিহাস গড়ে ফেললো লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। টান টান উত্তেজনার ফাইনালে গ্যালারি ভর্তি দর্শকদের সামনে টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ২০ জানুয়ারি দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখেন আলফাজ-সুজন-হাসান আল মামুনরা। সেই শেষ, এরপর সাতটি প্রতিযোগিতা পেরিয়ে গেলেও ট্রফি আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি!
হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটান ছিলেন ২০০৩-এর সাফল্যের নেপথ্যে। বাংলাদেশকে একটি দল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি, যাকে যেখানে দরকার সেখানেই তিনি খেলিয়েছেন। অথচ সাফজয়ী অনেক খেলোয়াড়কে দলে নেওয়াটাই তার জন্য ছিল কঠিন।
বুদাপেস্ট থেকে কোটান নিজেই বাংলা ট্রিবিউনকে শুনিয়েছেন সেই কাহিনী, ‘তখন দল নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার মন কষাকষি কম হয়নি। আমিনুল-আলফাজ-আরমানদের কেন দলে রাখব, এ নিয়ে আমাকে লড়াই করতে হয়েছে। মতিউর মুন্না তো নিষিদ্ধ ছিল। সেটাও প্রত্যাহার করালাম। ঝুঁকি নিয়েই আমি নিজের দল সাজিয়েছিলাম। সবাই ছিল দক্ষ খেলোয়াড়। সাফের আগে আমরা বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলেছিলাম, যা ঢাকার প্রতিযোগিতায় কাজে লেগেছিল। আসলে সবার চেষ্টাতে এই ফল আসে।’
সাফের সেই প্রতিযোগিতায় অধিনায়ক ছিলেন রজনী কান্ত বর্মণ। এমনিতে তার অনুশীলনে দেরি করে আসার কারণে কথা শুনতে হতো। তার ওপর সাফের আগেই বিয়ে করে সমালোচনার পথ আরও খুলে দেন।
কিন্তু রজনী ছিলেন একজন ‘যোদ্ধা’। প্রস্তুতির ক্যাম্প শুরুর কিছুদিন পর যোগ দিয়েও ভালো খেলার পণ ছিল তার মনে। রজনীর বর্ণনায়, ‘সাফের প্রস্তুতির মাঝে আমি বিয়ে করলাম। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলো। দেরিতে ক্যাম্পে যোগ দিয়েছি। এ নিয়েও কম কথা হয়নি। তখন সমালোচকদের বলেছিলাম, বিয়ের জায়গায় বিয়ে, খেলার জায়গায় খেলা। ভালো খেলার তাগিদটা তাই যেন বেশিই পেয়েছিলাম। এছাড়া ফিটনেস ও পারফরম্যান্স দিয়েই দলে জায়গা করে নিয়েছিলাম। সাফে নিজের সেরাটা দিয়ে খেলেছি।’
তবে কার্ড সমস্যার কারণে রজনীর ফাইনাল খেলা হয়নি। তারপরও টুর্নামেন্টসেরা হয়েছিলেন সাবেক এই ডিফেন্ডারই।
সাফের শুরুতে আলফাজের গোলে নেপালকে হারিয়ে সূচনা বাংলাদেশের। তারপর আরিফ খান জয়ের গোলে মালদ্বীপকে হারানো। ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়া। আর মতিউর মুন্নার সেই বিখ্যাত ‘গোল্ডেন গোলে’ চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে ফাইনালের মঞ্চে উঠে যাওয়া। এরপর... ইতিহাস!
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শিরোপা জয়ের মঞ্চে প্রতিপক্ষ ছিল মালদ্বীপ। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় খেলা ১-১ গোলে শেষ হয়। এরপর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে বাংলাদেশ ‘পাঁচে পাঁচ’। শেষ শটটি ডিফেন্ডার সুজন জালে জড়িয়েই ভোঁ দৌড়! মাঝে গোলকিপার আমিনুল হক প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় শট রুখে দেওয়ায় ৫-৩ গোলের জয়ে গোটা গ্যালারি আনন্দে মাতোয়ারা।
রজনী সেই সাফ জয়ের পেছনে কোটানের অবদানের কথাও বললেন, “কোটান ভালো কোচ ছিলেন। বন্ধুসুলভ ছিল তার আচরণ। সবার সঙ্গে মিশে যেতেন। আমাদের সঙ্গে শপিংয়ে পর্যন্ত গেছেন। তিনি ছিল আমাদের বড় অনুপ্রেরণা। উজ্জীবিত করতে পারতেন। কোটান বলতেন, ‘চাপ নিও না। নির্ভার হয়ে খেলো।’ এরপর তো ইতিহাসই হলো।”
কোটানের সেই সময়কার অবদান ভুলতে পারেননি আমিনুলও। ইনজুরি থেকে যেখানে তার এক বছর খেলার বাইরে থাকার কথা, সেখানে কোটান কয়েক মাসের চেষ্টায় তাকে খেলার উপযোগী করে তোলেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তখন তাকে নিয়ে কোটানের সেই আপ্রাণ চেষ্টা চোখে পড়েছিল অনেকেরই।
আমিনুল ফিরে গেলেন সেই দিনগুলোতে, ‘ইনজুরির কারণে আমার তো খেলার কথাই ছিল না। কোটান আমাকে ফিট রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। যেখানে ডাক্তাররা বলেছিল, আমি নাকি এক বছর ফুটবলই খেলতে পারব না, সেখানে কোটানের অধীনে অনুশীলন করে নিজেকে ফিট করেছি। বলতে পারেন কোটানের অধীনে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিলাম। পুরো প্রতিযোগিতায় ভালো খেলার চেষ্টা করেছি। ফাইনালে তো টান টান উত্তেজনা। ওদের দ্বিতীয় শট রুখে দেই।’
২০০৩ সালের পর ১৭ বছর কেটে গেছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ট্রফি আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি। এখন তো সাফের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হচ্ছে! তারপরও ফুটবলের সেই সোনালি দিন ফিরে আসবে, সেই অপেক্ষাতেই সমর্থকরা।








